প্রকাশিত :  ০৮:২৯, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৩৬, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

ব্রিটেনের নির্বাচন: ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ভূমিকা নজিরবিহীন

ব্রিটেনের নির্বাচন: ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ভূমিকা নজিরবিহীন

জনমত ডেস্ক: যুক্তরাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ধর্মবিশ্বাস ও জন্মভূমির রাজনৈতিক টানাপোড়েন ১২ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের সংগঠিত রাজনৈতিক ভূমিকা এবার নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাশ্মীর প্রসঙ্গও।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু, রাবাইদের প্রধান, চিফ রাবাই এপরাহিম মিরভিজ। বিতর্কের লক্ষ্য বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন এবং তাঁর দল লেবার পার্টি। দ্য টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি করবিনকে ‘প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অযোগ্য’ অভিহিত করে লেবার পার্টি নির্বাচিত হলে ইহুদিরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বেন বলে মন্তব্য করেন। নির্বাচনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে, একজন ধর্মীয় নেতার এমন মন্তব্যকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছে গণমাধ্যম ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। লেবার পার্টির যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ আছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ‘দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা’ নিতে না পারার জন্যই করবিনের প্রতি দোষারোপ করা হয়।

করবিনের প্রতি এমন অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে ২০১৭ সালে থেরেসা মের বিপরীতে নির্বাচনে করবিন যখন লেবার নেতা হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন, তখনো তাঁর বিরুদ্ধে ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী তিনটি পত্রিকা যৌথভাবে প্রথম পাতায় অভিন্ন সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। সাবেক চিফ রাবাই লর্ড জোনাথন স্যাক্সও তখন একই ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে করবিনকে ইহুদিবিদ্বেষ বন্ধে নিষ্ক্রিয় এবং অক্ষম হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এবারের বিতর্কে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য লক্ষণীয়ভাবে গতবারের সমালোচনার কথা উল্লেখ করেনি। বরং সবাই বর্তমান চিফ রাবাই মিরভিজের ভূমিকাকে নজিরবিহীন অভিহিত করে বাড়তি নাটকীয়তা যোগ করেছেন। চিফ রাবাইয়ের মতামত তাঁর অনুসারীদের যে প্রভাবিত করবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রাবাইয়ের চোখে করবিনের কথিত অযোগ্যতা অন্যদের কতটা প্রভাবিত করবে, সেটা অনুমান করা কঠিন। লেবারের প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিশেষ করে কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা চেষ্টা করছেন করবিনের বিরুদ্ধে সুযোগটির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের।

লেবার পার্টি ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাজ্যের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর প্রধান আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত। তবে জেরেমি করবিন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলটিতে ইহুদিবিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ব্রিটিশ রাজনীতিকদের মধ্যে বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লড়াই করার রেকর্ডটি জেরেমি করবিনের হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ভাবমূর্তির সংকটটি প্রকট। এর অন্যতম একটি কারণ, তিনি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন-নির্যাতন, সামরিকায়ন ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির বিরোধী। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানানোর কারণে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ তাঁকে হামাস ও হিজবুল্লাহর বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে থাকে। এমনকি উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ব্রিটিশ সরকার এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ছিল। এ কারণে তাঁকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা আইআরএর বন্ধু হিসেবেও অভিহিত করে এসব পত্রিকা। সর্বোপরি বামপন্থী আদর্শ এবং বৃহৎ পুঁজিবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা তাঁকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সম্প্রদায়ের সংগঠিত রাজনৈতিক ভূমিকা এবার নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে

যেদিন রাবাই মিরভিজের নিবন্ধ টাইমস–এ প্রকাশিত হয়, সেদিনই করবিন তাঁর দলের পক্ষ থেকে ধর্ম ও বর্ণ সমতার বিষয়ে একটি আলাদা ইশতেহার প্রকাশ করেন। কিন্তু রাবাই মিরভিজের অভিযোগের প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় তা যথেষ্ট হয়নি। সন্ধ্যায় বিবিসির পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বিষয়টি আবারও উত্থাপিত হয় এবং সানডে টাইমস–এর সাবেক সম্পাদক অ্যান্ড্রু নিল তাঁর কাছে উপর্যুপরি চারবার জানতে চান যে তিনি ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না। করবিন ক্ষমা চাননি। তবে বারবারই বর্ণবাদ ও ধর্মবিদ্বেষ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে তিনি জানান। স্মরণ করা প্রয়োজন, তাঁর দলের অন্তত পাঁচজন ইহুদি সাংসদ গত কয়েক মাসে একই অভিযোগ এনে দল ছেড়েছেন। ফলে তাঁর অঙ্গীকার বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারেনি।

জেরেমি করবিনের সমস্যা শুধু ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যেই সীমিত নয়। রাবাই মিরভিজের বিবৃতির পরপরই হিন্দু কাউন্সিল অব ইউকে নামের একটি সংগঠন লেবার পার্টি সংখ্যালঘুদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে বলে অভিযোগ তোলে এবং লেবার পার্টিকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানায়। হিন্দু কাউন্সিল অবশ্য কিছুদিন ধরেই লেবার পার্টিকে ‘হিন্দুবিরোধী’ ও ‘ভারতরোধী’ বলে অভিহিত করে আসছে, যা বিবিসি এবং সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর নজর কেড়েছে। এই গোষ্ঠীর লেবারবিরোধিতার মূল কারণ হলো কাশ্মীর। কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসন জারি ও কাশ্মীরিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে লেবার পার্টির সম্মেলনে প্রস্তাব পাস হওয়ার কারণেই এই গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ।

বিবিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে হিন্দু কাউন্সিল অব ইউকে লেবার পার্টির বিরুদ্ধে কনজারভেটিভ দলের প্রার্থীদের নির্বাচিত করার জন্য জোর প্রচার চালাচ্ছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, কনজারভেটিভ দলের পক্ষ থেকেও এই গোষ্ঠী কিছুটা উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। সাবেক সাংসদ ব্ল্যাকবার্ন কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছেন। পত্রিকাটি বলছে, এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য এবার ৪০টির মতো আসনে (যেখানে লেবার প্রার্থীরা গতবার সামান্য ব্যবধানে জিতেছেন বা হেরেছেন) লেবার পার্টিকে হারানো। সিএনএন জানিয়েছে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক। ওভারসিজ ফ্রেন্ডস অব বিজেপি নামের এ সংগঠনটি মূলত বিজেপির একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক এবং গুজরাট দাঙ্গার পর বিভিন্ন দেশে নরেন্দ্র মোদি যখন নিন্দিত হন, তখন থেকে এই গোষ্ঠীর তৎপরতা জোরদার হতে থাকে। মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেয় এই গোষ্ঠী। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছে লেবারবিরোধী বার্তা আসছে।

তুলনায় কম হলেও ওই একই দিনে একই ধরনের সমালোচনা ও চাপের মুখে পড়েন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তাঁর কনজারভেটিভ দল। জনসন এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ করে মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে সাংবাদিক হিসেবে জনসন বিভিন্ন সময়ে তাঁর লেখায় ইসলামবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ আছে। বোরকা পরা নারীদের তিনি লেটারবক্স এবং মুখোশধারী ব্যাংক ডাকাতদের সঙ্গে তুলনা করায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানানো হয়। টিভিতে প্রচারিত নির্বাচনী বিতর্কেও প্রশ্নটি ওঠে। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ও সমকামীদের ক্ষেত্রেও আপত্তিকর বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। মূলধারার ডানপন্থী সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ এবং সাময়িকী স্পেকটেটর–এ তাঁর এসব বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তাঁর দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বক্তব্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানকে সমর্থন করার অভিযোগ আছে।

কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন দলটির সাবেক চেয়ারপারসন এবং হাউস অব লর্ডসের সদস্য ব্যারনেস ভারসি। ক্যামেরন মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তবে এত সব চাপের মধ্যেও ইসলামবিদ্বেষের সমস্যাটিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির মধ্যে একধরনের অনীহা লক্ষ করা যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বরিস জনসন সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে যাঁরা মর্মাহত হয়েছেন, তাঁদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং দলটির মধ্যে এ বিষয়ে বছর শেষ হওয়ার আগেই তদন্ত অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেছেন।

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইসলামবিদ্বেষের প্রশ্নটি কনজারভেটিভ পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কেননা ৩০টির মতো আসনে ভোটের ফল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। পত্রিকাটি বলছে, এসব আসনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবাইকে ভোট দেওয়ার জন্য ধর্মীয় নেতারা উৎসাহিত করছেন। তাঁরা সরাসরি কোনো দলের পক্ষে বা বিরুদ্ধে না বললেও ধারণা করা হয়, এতে লেবার পার্টিই বেশি লাভবান হবে। আর গত বুধবার একজন শিখ প্রতিদ্বন্দ্বীর পাগড়ি নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হওয়া কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী ফিলিপ ডান। ইউরোপের সঙ্গে বিচ্ছেদ বা ব্রেক্সিট বিষয়ে গণভোটের পর থেকে যুক্তরাজ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্ণবাদী হয়রানি ও হামলার অভিযোগ বাড়ছিল। এবারের নির্বাচনে তাই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো সংগঠিতভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছে। তবে ব্যালটের হিসাবে তা কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা অনুমান করা কঠিন।



Leave Your Comments


নির্বাচন এর আরও খবর