প্রকাশিত :  ০৬:১৫, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

আজ ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচন: হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের আভাস

আজ ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচন: হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের আভাস

জনমত ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন আজ । ১২ ডিসেম্বরের এ নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। আর তাই প্রচার-প্রচারণায় শেষ মুহূর্তেও ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন এবং ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা বরিস জনসন। শেষ সময়ে দুইজন মূলত জোর দিয়েছেন সেসব আসনে যেসব স্থানে দুই বড় দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব বেশি থাকে না।

 ব্রেক্সিট প্রশ্নে প্রায় তিন বছর ধরে পার্লামেন্টে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে গত দু'বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় দেশজুড়ে ৬৫০টি আসনে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। ফল জানা যাবে শুক্রবার সকালে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি আর এমন নির্বাচনের মুখোমুখি আর হয়নি। কারণ এ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর দেশটির ভবিষ্যতের অনেক কিছু নির্ভর করছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে ফেরার আশা করছে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি। অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে জেরেমি করবিনের লেবার পার্টি। করবিন বলেছেন, এই নির্বাচন হচ্ছে দেশকে বদলে দেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ; যাতে করে কোনও সম্প্রদায়কে পিছিয়ে থাকতে না হয় এবং সত্যিকার পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

দেশবাসীর প্রতি করবিনের আহ্বান, তারা যেন বিদ্যমান ইস্টাবলিশমেন্টকে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে আশাবাদের পক্ষে রায় দেন। আর ক্রিসমাসের আগেই ব্রেক্সিটের নিষ্পত্তি করতে গণরায় চেয়েছেন জনসন।

জেরেমি করবিন বলেছেন, এবারের নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধ ধারণকারী প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিতে হবে নাগরিকদের। ব্রিটিশ ভোটারদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

নির্বাচনের আগের দিন বুধবার ইস্ট লন্ডনের হক্সটনে এক সমাবেশে করবিন বলেন, আগামীকাল আপনারা আশাবাদের পক্ষে রায় দিয়ে ইস্টাবলিশমেন্টকে একটি ঝাঁকুনি দিতে পারেন।

লেবার পার্টির ‘ভোট ফর হোপ’ স্লোগান সম্পর্কে তিনি বলেন, এই আশাবাদ নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য, আমাদের কমিউনিটিগুলোর জন্য। এই আশাবাদ আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্য, পুরো যুক্তরাজ্যের জন্য। আগামীকাল আশাবাদের পক্ষে ভোট দিন। সত্যিকারের পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিন।

করবিন বলেন, বিদ্যমান ইস্টাবলিশমেন্ট চায় না লেবার পার্টিকে বিজয়ী হোক।

নির্বাচনি প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবাকে (এনএইচএস) বহুজাতিক মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন করবিন। তার অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমনন্ত্রী বরিস জনসন এক ‘বিষাক্ত’ ‍চুক্তির মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা বিক্রি করে দিচ্ছেন।

লেবার নেতা বলেন, ‘অনেকে বলেন পরিবর্তন সম্ভব নয়, সত্যিই কি তাই? এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা যেখানে লোকজনকে অপেক্ষা করতে হবে না ও বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্র পাওয়া যাবে, এটি খুব বেশি চাওয়া? বিনামূল্যে ব্যক্তিগত সেবাযত্নসহ একটি লালন-পালন ব্যবস্থা কি খুব বেশি চাওয়া হয়ে যায়? ১৬ বছরের তরুণ থেকে শুরু করে সবার জন্য বাঁচার মতো মজুরি কি খুব বেশি চাওয়া? কষ্ট করে ঘুমানো বন্ধে সামর্থ্যের মধ্যে ঘর কেনা ও সঞ্চয়ের মধ্যে ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করা কি বেশি কিছু? শিশুদের জন্য ৩০ ঘণ্টা যত্ন, উন্নত শিক্ষা থেকে সমাধিতে মোমবাতি কি খুব বেশি চাওয়া?’

নিজের কাছে জনসন সরকারের ব্রেক্সিট পরবর্তী চুক্তিতে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যবহার সংক্রান্ত ৪৫১ পৃষ্ঠার গোপন নথি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন করবিন। তবে লেবার নেতার এমন বক্তব্যকে অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যায়িত করেন বরিস জনসন।

বুধবার রাতে ইস্ট লন্ডনের অলিম্পিক পার্কে দেওয়া ভাষণে বরিস জনসন বলেন, এই নির্বাচন সরকারের অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠার একটি সুযোগ। শেষ পর্যন্ত কনজারভেটিভ পার্টি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তাহলে করবিন স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। আর এই স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি ব্রেক্সিট ও স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে ফের গণভোট চায়। আজ দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি সুযোগ এসেছে। অনিশ্চয়তা নিয়ে যেন আমাদের ঘুমোতে যেতে না হয়।

বরিস জনসন বলেন, ভাবুন তো এটা কতটা চমৎকার হতে পারে যে, কনজারভেটিভদের বিজয় তথা ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন; আর তার উদযাপন হিসেবে এবারের ক্রিসমাসে তুর্কি ডিনার। বিপরীতে এটা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে যে, করবিনরা জিতলে ডাউনিং স্ট্রিট (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) আরও দুইটি গণভোটের জন্য অগ্রসর হবে।

নির্বাচনি প্রচারণায় রেল, ডাক ও পানি সেবাকে রাষ্ট্রীয়করণের প্রস্তাব দিয়েছেন করবিন। এছাড়া ব্যাংকারদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের কথাও বলেছেন তিনি।

২০১৭ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে ৬৫০টি আসনের মধ্যে ৬৪৮টি আসনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেছে লেবার পার্টি পেয়েছে ২৬১টি আসন। আর কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে ৩১৭টি আসন। কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ছোট দলের সমর্থনে সরকার গঠন করেন কনজারভেটিভ পার্টির থেরেসা মে। তবে বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবেন তা নির্ধারণ করবেন যুক্তরাজ্যের ভোটাররাই।

কেন এ নির্বাচন?

যুক্তরাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ২০১৬-এর গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে রায় দেয়। তার আগের কয়েক দশক ধরে যুক্তরাজ্য এবং ইইউ-এর অর্থনীতি ও বাণিজ্য অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিল। তাই গণভোটের পরই কথা উঠে যে, ইইউ ত্যাগের ফলে যাতে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনও ক্ষতি না হয়। দুই অংশের জনগণ চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা ভোগ করতেন; সেগুলোতে যেন কোন ছেদ যেন না পড়ে। তাই ব্রেক্সিট কিভাবে হবে তা আগে থেকেই একটা চুক্তির ভিত্তিতে স্থির করে নিতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তার আগে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এমন চুক্তি করে এসেছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে। কিন্তু সেটা তারা পার্লামেন্টে পাস করাতে ব্যর্থ হন। কারণ কনজারভেটিভ পার্টির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তাদের কোয়ালিশন অংশীদার ওই চুক্তিকে সমর্থন করেনি। মূলত এ নিয়ে তীব্র মতবিরোধের জেরেই দুই বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।


Leave Your Comments


নির্বাচন এর আরও খবর