প্রকাশিত :  ১৫:২০, ২০ জুলাই ২০২০

'বাঙলার স্থপতি' শীর্ষক ছয়টি খন্ড : ইতিহাসের আবশ্যকীয় পাঠ

'বাঙলার স্থপতি' শীর্ষক ছয়টি খন্ড : ইতিহাসের আবশ্যকীয় পাঠ

।। মাহামুদুল হক ।।

“আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব-বীরত্ব ও সাহসের দিক থেকে তিনিই আমার কাছে হিমালয়। আর এভাবেই আমার হিমালয় দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।” এভাবেই কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ট্রো ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্ম্পকে মূল্যয়ন করেন। বিচক্ষণ শাসক কাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুর সঠিক মূল্যয়নে ব্যর্থ হননি। কেননা, বঙ্গবন্ধুর জীবন চিরবিস্ময়কর ও অবিনাশী। অবিনাশী এজন্য যে ঘাতকের বুলেটে অসময়ে তাঁর পার্থিব-জীবনের অবসান ঘটলেও তিনি অমর হয়ে আজও বেঁচে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে ও রক্তকণিকায়। তাঁর আত্মত্যাগের কণ্টকময় কারাজীবন, দীর্ঘ সংগ্রামপূর্ণ জীবন উপাখ্যান, বিরল অমিততেজী আপসহীন সাধক এবং শাশ্বত বিজয়ের প্রতীকরূপে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়ক। তাঁর সংগ্রামী জীবনে দুরন্ত সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের কর্ম-পরিধি আকাশের মতো বিশাল, মহাসাগরের মতো বিস্তৃত ও হিমালয়ের মতোই উঁচু।

আজ নতুন প্রজন্ম যাদের বঙ্গবন্ধুর দর্শন লাভের সুযোগ হয়নি তাদের ইতিহাসের পাঠ থেকে তথ্যের মধ্যে ডুব দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে হবে, তাঁর হিমালয় সমান চিন্তা-কর্ম-অবদান জানতে হবে এবং মূল্যায়ন করতে হবে সঠিক ইাতহাস। কীভাবে সহজে পাওয়া যাবে সেই ইতিহাস। গ্রন্থই সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের এ মহানায়ককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর থেকে ২০ বছরের অধিক সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর অবদানকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে তথাকথিত লেখক-গবেষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীগণও হাত মেলায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য পরিবেশনে। ফলে ইতিহাস পাঠ-আলোচনা-গবেষণা-লেখনি-নির্মাণ-বিনির্মাণে অসত্য তথ্যের বুনন চলে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডা হাতিয়ার। বঙ্গবন্ধুু ও বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস নির্মাণ-বিনির্মাণে দেখা দেয় শূণ্যতা। চারিদিকে চলে মিথ্যার জয়জয়কার। ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব চলে সর্বত্র। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কৃতীমান এ মানবের অবদান মুছে দিতে চায় ওই স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। পরে সত্য ইতিহাস নির্মাণ-বিনির্মাণের প্রচেষ্টায় অনেকে সামিল হন। কানাডা প্রবাসী অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কতিপয় স্বার্থানেষী অপপ্রচারকারী ইতিহাসকে বিকৃত করে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ও অবদানকে অবমূল্যায়ন করার চক্রান্তে যখন লিপ্ত ঠিক সে সময়ে লেখক ধারাবাহিক গ্রন্থ রচনা করে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীর জনকের জন্ম-কর্ম-আবদান নিয়ে ইতিহাসের সত্য বিনির্মাণে অবিরতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লিখেছেন ‘বাঙলার স্থপতি’ টাইটেলে ছয়টি খন্ড। প্রবাসে বসে জাতির এ মহানয়কের ওপর আসলে তিনি মহাকাব্য রচনা করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর ওপর হাজারো বই প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু ইতিহাস-নির্ভর ধারাবাহিক প্রকাশনা এগুলোই প্রথম। 

কাকলী প্রকাশনী ঢাকা থেকে ২০১৮ সালে ‘বাঙালার স্থপতি’ টাইটেলে প্রকাশ করেছে চারটি খন্ড এবং ২০১৯ সালে পঞ্চম খন্ড প্রকাশ করেছে। নলেজ ইন্ডাস্ট্রি লি. ২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশ করেছে ‘বাঙালার স্থপতি’ ষষ্ঠ খন্ডটি। ছয়টি খন্ডের কভার মূল্য ধরা হয়েছে ৪,৩০০ টাকা। আসলে মোটা কলেবরে (ছয়টি খন্ডে মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৩৬৩) প্রকাশিত ছয়টি খন্ড নিয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা করা সত্যিই কঠিন। তবে চুম্বক অংশ আলোচনা করাতো যায়ই! 

বিগত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যে কয়জন ক্ষণজন্মা পুরুষ পৃথিবীর সর্বদেশে এবং সর্ব-সমাজে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, ঔৎসুক্য ও কৌতূহলের সঞ্চার করেছেন তাঁদের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বাগ্রগণ্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরম্ভকাল, রাজনৈতিক কর্মপরিধি এবং সর্বশেষ আত্মাহুতিদানের মর্মান্তিক রক্তরাঙা বিষাদময় কাহিনী- সমস্তটাই চিত্তাকর্ষক রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও তা অনবদ্য ইতিহাস। লেখক অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী সম্ভবত সেই কথাগুলোই স্মরণে রেখে এক কুশলী শিল্পীর মতো বঙ্গবন্ধুর জীবন কাহিনীকে এক বিশাল পটভূমির উপর চিত্রিত করেছেন। তিনি চরিত বর্ণনার দক্ষতায় মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুকে নব নব জীবনাধ্যায় বিশ্লেষণে রূপায়িত করেছেন, ঐতিহাসিকের ন্যায় উপস্থাপন করেছেন। অথচ তিনি তাঁর গ্রন্থে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমি একজন লেখক, ঐতিহাসিক নই।” অ্যালভীন দীলিপ বাগ্্চী একজন কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক। বঙলার স্থপতি সিরিজে ছয়টি খ- পড়ে আমার মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস নির্মাণে অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী ঐতিহাসিকের ভূমিকাই পালন করেছেন। 

‘বাঙালার স্থপতি’ টাইটেলে প্রকাশিত সকল খ-ের পাটাতন হিসেবে প্রথম খ-কে বিবেচনা করা চলে। কেননা এ খন্ডে বঙ্গবন্ধুর বংশীয় ইতিহাস ও জন্মবিবরণ, শিক্ষাজীবন, কৈশোর, বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বিপ্লবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা ও রক্তরাঙা ইতিহাস তথ্যের আঁচড়ে বিনির্মাণ করেছেন লেখক।  

তরুণ মুজিবের উপমহাদেশের রাজনীতিতে পদার্পণ, ১৯৪৫-১৯৪৬ সালের নির্বাচন, ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা, আইয়ূব খানের সামরিক শাসন এবং পূর্ব বাংলায় গণ-আন্দোলন প্রভৃতি ঐতিহাসিক ঘটনার ক্রমবিকাশে শেখ মুজিবুর রহমান-এর অংশগ্রহণ ও অবদান তথ্যের নিখুঁত পরিবেশনায় নতুনভাবে উন্মোচিত করেছেন লেখক তাঁর দ্বিতীয় খন্ডে। 

ঐতিহাসিক ছয় দফা, পূর্বাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ও অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ইতিহাস ভিন্ন আঙ্গিকে বিধৃত হয়েছে বাঙলার স্থপতি তৃতীয় খন্ডে। 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, মুজিব বাহিনী, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সরকার গঠন, বুদ্ধিজীবী হত্যা, পূর্ব রণাঙ্গনের যুদ্ধ, পাকিস্তানি জেনারেলের আত্মসমার্পণ, ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা, স্বাধীনতা, পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ এবং নতুন জাতির জন্ম পরিক্রমা রচনায় অনেক অজানা তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী তাঁর চতুর্থ খন্ডে। 

‘বাঙলার স্থাপতি’ টাইটেলে পঞ্চম খ-ে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার ও কারাগার জীবন নিয়ে অনুপুঙ্খ ইতিহাস রচিত হয়েছে। রয়েছে ডেভিড ফ্রস্ট কর্তৃক গৃহীত বঙ্গবন্ধুর হুবহু সাক্ষাৎকার। পরিবারের সদস্য, রক্ষীবাহিনী, চুয়াত্তর-এর দুর্ভিক্ষ এবং বাকশাল নিয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লেখক জবাব ও জবানবন্দী হাজির করেছেন তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে। অনেক অজানা রহস্য জানার জন্য এসব রসদ জোগাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। পঞ্চম খন্ডের ভুমিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাবেক উপাচার্য আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “বাঙলার স্থপতি গ্রন্থে লেখক বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও অবদান মূল্যায়ন করেছেন যুক্তি, প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতে।”

গ্রন্থাকার আলভীন দীলিপ বাগচী

ইতিহাসে আজ প্রমাণিত সত্য যে মাকড়সার জাল-এর মতো ষড়ষন্ত্রের জাল বুনন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অবদানকে মুছে ফেলার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় জাতির ইতিহাস নির্মাতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের অবদান ও কাজকে হত্যা করা যায় না। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে হত্যা করা যায়নি। অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী তাঁর বাঙলার স্থপতি ষষ্ঠ খ-ে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ষড়যন্ত্র এবং যড়যন্ত্রের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা অস্থিতিশীল করার হীন চক্রান্তে লিপ্ত ছিল তা সবিস্তারে ষষ্ঠ খন্ডে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশিয় ষড়যন্ত্রকারী দলের চক্রান্ত এবং পরাভূত পাক-সরকারের আমলা অফিসারবৃন্দ আওয়ামী লীগ সরকারে পুনর্বহাল হওয়ার পর কে, কোথায় ও কীভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তা’ও বের হয়ে এসেছে। ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয়সহ চক্রান্তের ধারাবাহিক বর্ণনা তথ্য-প্রমাণসহ ছায়াছবির দৃশ্যের মতো উপস্থাপিত হয়েছে।

জীবনই ইতিহাস, ইতিহাসেই জীবন। ‘বাঙালার স্থপতি’ গ্রন্থে দেখা মিলবে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস মানেই বাংলদেশের ইতিহাস। এমনি ইতিহাস রচনা করেছেন অ্যালভীন দীলিপ বাগ্চী। তথ্যের বিকৃতি না ঘটিয়ে মানবিক আবেগ জাগ্রত করে লেখক ইতিহাস রচনায় নতুন ধারা তৈরি করেছেন। লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদসহ সকল পাঠকের জন্য আকর গ্রন্থ ‘বাঙলার স্থপতি’। বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ষষ্ঠ খন্ডের ভূমিকায় বলেন, “বইটি পাঠকমহলের মনে ইতিহাসের খোরাক জোগাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।” তথ্যসমৃদ্ধ সাবলীল ভাষায় রচিত ‘বাঙলার স্থপতি’ টাইটেলে প্রকাশিত সবগুলো খন্ডই আসলে ইতিহাসের আবশ্যকীয় পাঠ।


মাহামুদুল হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর



Leave Your Comments


শিল্প-সংস্কৃতি এর আরও খবর