প্রকাশিত :  ০৮:০৮, ৩০ জুলাই ২০২০

লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

‘ভয় কর সেদিনকে যেদিন পিতা সন্তানের পক্ষে বিনিময় দেবে না, সন্তান দেবে না পিতার পক্ষে'

লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার

২০২০। জানুয়ারি থেকে জুলাই- এই সাত মাসে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীতে করোনাভাইরাসের প্রকোপে কতো পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এই পরিবর্তনের ধারাটি এখনো থেমে যায়নি, তার প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই বসবাস আমাদের এখনো। 

পরিবর্তনগুলোর তালিকায় আমরা যদি চোখ বুলোই, দেখতে পাবো: লকডাউনে গোটা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষ ঘরবন্দী, মানুষে মানুষে সামাজিক দূরত্ব, জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখতে দেশে দেশে সরকারী উদ্যোগে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্টিমুলাস প্যাকেজসমূহ ঘোষণা, ঘর ভাড়া আদায় স্থগিত, মর্টগেইজ আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ, হোমলেসদের বিনা খরচে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা, বিমান চলাচল বন্ধ, সীমান্ত বন্ধ। ২৯ জুলাই, ২০২০ পর্যন্ত আমরা দেখেছি গোটা বিশ্ব জুড়ে করোনায় নিষ্করুণ মৃত্যুর মিছিলে শামিল হয়েছেন ৬ লাখ ৬৪ হাজারেরও বেশি মানুষ ।

আমরা দেখেছি, করোনায় অসহায় মৃত্যুর সময়েও স্বজনের পাশে যাবার কোন সুযোগ নেই, চিকিৎসা চলাকালেও, কি হাসপাতাল, কি ঘরে, সুযোগ নেই স্বজনের পাশে দাঁড়াবার।    

আমরা দেখেছি, উপাসনালয় বন্ধ, স্থগিত প্রিয়জনদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ, স্থগিত হয়েছে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অনুষ্ঠানও। 

এক ভয়ঙ্কর টালমাটাল এই সময় এখনো তার কব্জা থেকে আমাদের মুক্তির অবকাশ দেয়নি। 

মসজিদের দুয়ার রুদ্ধ হয়েছিলো, বন্ধ হয়েছিলো সেখানে নামাযীর প্রবেশাধিকার। যদিও সে রুদ্ধ দুয়ার খুলেছে এখন, কিন্তু স্বাভাবিক আয়োজন এখনও নিষিদ্ধ সেখানে।

যে বুননে আমাদের জীবন জীবন হয়ে ওঠে, করোনার ভয়াল থাবায় এখনও তা বিপন্ন, ঘোর সংকটে নিমজ্জিত রয়ে গেছে।  

করোনার অদৃশ্য অভিযানে পৃথিবী জুড়ে পরিবর্তনের চলমান উপাখ্যানে সর্বশেষ সংযোজন বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ব্রত পবিত্র হজ্জের আয়োজন। সারা দুনিয়ার প্রায় ২৫ লাখ মুসলমান সম্প্রতি সময়ে এই হজ্জ পালনে অংশ গ্রহণ করে আসছিলেন। কিন্তু এ বছর শুধুমাত্র সৌদী আরবে বসবাস করছেন এ রকম মাত্র ১ হাজার মানুষ হজ্জ পালনের সুযোগ পেয়েছেন। এঁদের শতকরা ৩০ ভাগ সৌদী নাগরিক আর অবশিষ্ট ৭০ ভাগ সে দেশে বসবাসরত ১৬০টি দেশের নাগরিক।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সৌদী সরকার এ বছর বিদেশী কাউকেই হজ্জ পালনের অনুমতি দেয়নি। ২৯ জুলাই বুধবার পর্যন্ত সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ি, সৌদী আরবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ২০টির দেশের মধ্যে সৌদী আরবের অবস্থান এখন দশম। বুধবারের হিসেব অনুযায়ি করোনায় এ পর্যন্ত দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৮১৬ জন।  

এর আগেও যুদ্ধ এবং মহামারীর কারণে হজ্জ পালন বন্ধ হয়েছিলো। কিন্তু ১৯৩২ সালে রাষ্ট্র হিসেবে সৌদী আরব প্রতিষ্ঠার পর ৮৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম বিদেশীদের হজ্জ্ পালনে সৌদী আরব যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো না।

হজ্জ পারমিট এবার যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের হজ্জ পালনের খরচ দিচ্ছে সৌদী সরকার। তাঁদের প্রত্যেককে দেয়া হয়েছে হজ্জ কিট, যাতে রয়েছে, ইহরাম, জায়নামাজ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক এবং জামারাতে শয়তানের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে মারার জন্যে স্টেরালাইজ করা নুড়ি পাথর। এবার ক্বাবা শরীফ স্পর্শ করার বা চুম্বন করার কোন সুযোগ থাকছে না। 

এবার যাঁদের হজ্জ পারমিট দেয়া হয়েছে তাদের বয়স ২০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাদের গুরুতর কোন রোগব্যাধি নেই এবং কোভিড-১৯ টেস্টে তাদের প্রত্যেকের রেজাল্টই নেগেটিভ এসেছে। জ্বিলহজ্জ মাসের চতুর্থ দিনে তাঁরা যখন মক্কা এসে পৌঁছেন, তখন তাদের স্ক্রিনিং করা হয় এবং বুধবার ২৯ জুলাই হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার দিন পর্যন্ত তাঁদের হোটেল রুমে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিলো। ঠিকমতো তাঁরা আইসোলেশনে রয়েছেন কি-না সেটা মনিটরিংয়ের জন্যে তাঁদের প্রত্যককে ইলেক্ট্রনিক ব্রেসলেটও পরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। হজ্জ চলাকালে সব হাসপাতাল যে কোন পরিস্থিতির জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও থাকছে ইনটেনসিভ কেয়ার বেডসহ মোবাইল হাসপাতাল, এগুলো হাজীদের সাথে মিনা থেকে আরাফাত ও মুজদালিফায় যাবে এবং আবার মিনায় ফিরে আসবে তাদের সাথে। থার্মাল ক্যামেরাসহ সব রকমের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে, হজ্জ চলাকালে যদি কারও কোভিড-১৯য়ের উপসর্গ পাওয়া যায়, তাঁকে সরাসরি আইসোলেশনে নেয়া হবে, যাতে বাদবাকীরা হজ্জ পালন অব্যাহত রাখতে পারেন। 

নামাজ আদায়কালে এবং ক্বাবা শরীফ তওয়াফের সময় এই তীর্থযাত্রিদের পরষ্পরের সাথে ৫ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, মুখে মাস্ক পরা থাকতে হবে সকল সময়। হজ্জ শেষে তাঁদের নিজ নিজ ঘরে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে এক সপ্তাহ। 

পবিত্র মক্কা নগরী থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তরপূর্বে অবস্থিত মিনা উপত্যকায় ২৯ জুলাই বুধবার সমবেত হয়েছেন পারমিটধারী এক হাজার মানুষ। তাঁরা উচ্চারণ করছেন, লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। এদিন পবিত্র হজ্জের সূচনা হয়েছে। বুধবার থেকে বৃহষ্পতিবার ফজর পর্যন্ত তাঁরা নামায ও তসবী-তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে নিজেদের নিবেদন করবেন। বৃহষ্পতিবার তাঁরা যাবেন আরাফাত। সেখানে তাঁরা হজ্জের মূল অংশ খুতবায় অংশ নেবেন। এরপর যাবেন মুজদালিফায়, সেখানে রাত যাপনের পর শুক্রবার ফিরে আসবেন মিনায় জামারাতে পাথর ছোঁড়ায় অংশ নিতে। 

সম্প্রতিকালে প্রতি বছর গড়ে ২৫ লাখ মানুষ পবিত্র হজ্জব্রত পালন করতে যেতেন। তাদের সমবেত কণ্ঠে ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক‘ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতো পবিত্র ক্বাবা চত্বর আর তার চারপাশের সব প্রান্তর। এবার সেখানে সমবেত হতে পেরেছেন সাকুল্যে এক হাজার মানুষ। করোনার কারণে এই যে বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ তা কি আমাদের ভাবনার জগতে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের তরঙ্গ তুলতে অক্ষম? এ জীবনের উদ্দেশ্য এবং শেষ গন্তব্য নিয়ে ভাববার অবকাশ কি এখনো আমাদের হলো না? এই করোনাকালের মুখোমুখি হয়েও? 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুরা লোকমানে বলেছেন: হে মানুষ, তোমরা তোমাদের মালিককে ভয় করো এবং এমন একটি দিনকে ভয় করো, যেদিন কোন পিতা তার সন্তানের পক্ষ থেকে বিনিময় আদায় করবে না, না কোন সন্তান তার পিতার পক্ষ থেকে বিনিময় আদায় করবে; অবশ্যই আল্লাহতাআলার ওয়াদা সত্য, সুতরাং, (হে মানুষ) এ পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কোন রকম প্রতারিত করতে না পারে এবং প্রতারক (শয়তানও) যেন কখনো তোমাদের আল্লাহতাআলা সম্পর্কে কোন ধোঁকা দিতে না পারে। (আয়াত ৩৩:)

আজ যখন আমরা দেখি করোনায় আক্রান্ত মুমূর্ষ পিতার পক্ষে বিনিময় দেয়ার সাধ্য কোন সন্তানের নেই আর কোন পিতার ক্ষমতা নেই তার সন্তানের জন্যে বিনিময় দেয়ার তখনও কি আমাদের হুঁশ ফিরবে না? 

আজ কি সময় হয়নি ক্বাবার মালিকের নির্দেশ অন্তরে ধারণ করে প্রতিটি হৃদয়ে এই উচ্চারণের: লাব্বাইকা অল্লাহুম্মা লাব্বাইক। আমি হাযির, ও আল্লাহ! আমি হাযির। আপনার যখন আনুগত্য করা হয়, তখন আপনি তার মূল্যায়ন করেন। আপনার যখন নাফরমানী করা হয়, তখন আপনিই তা ক্ষমা করেন। আপনিই সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী সাক্ষী এবং আপনিই সবচাইতে নিকটবর্তী হেফাজতকারী। এই জীবনে এবং পরকালের জীবনে আপনি আমাদের হেফাজত করুন। 

লন্ডন, ২৯ জুলাই ২০২০


Leave Your Comments


ধর্ম এর আরও খবর