প্রকাশিত :  ০৮:০৮, ১১ নভেম্বর ২০১৮

জাস্টিস ফর জাকারিয়া ইসলাম শীর্ষক সেমিনারে ঘাতকের উপযুক্ত শাস্তি দাবী

জাস্টিস ফর জাকারিয়া ইসলাম শীর্ষক সেমিনারে ঘাতকের উপযুক্ত শাস্তি দাবী

জনমত রিপোর্ট ।। ৯ নভেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায়  পূর্ব লন্ডনে ‘জাস্টিস ফর জাকারিয়া ইসলাম’ শীর্ষক  সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় । এ মিউনিটি সমাবেশে বক্তারা জাকারিয়া ইসলামের হত্যাকারীর উপযুক্ত শাস্তি দাবী করেছেন। বক্তারা বলেছেন, হত্যাকারীকে আটক না রেখে মুক্ত করে দেয়ার অর্থ হবে জাকারিয়া ইসলামের পরিবার এবং কমিউনিটির মানুষকে আরো একটি হত্যার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া। মেন্টাল হেলথের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকা হত্যাকারী নিজেকে সুস্থ দাবী বলে করলেও বেরিয়ে এসে সে যে আরো একটি হত্যাকান্ড সংঘটিত করবেনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাই বৃটিশ বিচার মন্ত্রনালয়ের কাছে হত্যাকারীকে আটক রাখার জোর দাবী জানাচ্ছি। 

নিহত জাকারিয়া ইসলামের পরিবারের সদস্য শাইনুল খানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বেথনাল গ্রীন ও বো আসনের এমপি রুশনারা আলী, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র জন বিগস, ইস্ট লন্ডন মসজিদের নির্বাহী পরিচালক দেলওয়ার খান, মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেনের সেক্রেটারি জেনারেল হারুন খান, ওসমানী ট্রাস্টের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর শাফিউর রহমান, হাড্রেড ফ্যামেলীজ এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান হেনডি, ইস্ট লন্ডন মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ আহমদ, স্যোশাল জাস্টিস ক্যাম্পেইনার মুনতাদা আফতাব, নিহত জাকারিয়া ইসলামের কন্যা জায়নাব জাকারিয়া ও জাকারিয়া ইসলামের ভাই মোঃ আব্দুন নূর। সমাবেশে জাকারিয়া ইসলামকে নিয়ে লেখা স্বরচিত কবিতা পাঠ জোওয়ারিয়া আফতাব।

রুশনারা আলী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে জাকারিয়া ইসলামের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আমি পরিবারের পাশে রয়েছি। জাকারিয়া ইসলামের পরিবার যেনো ন্যায় বিচার পায় সেজন্য আমি তাদের এই ক্যাম্পেইনকে সমর্থন ও সহযোগিতা করে আসছি। তিনি বলেন, কোনো মনুষ অসুস্থ হলে তাকে আটক রেখে চিকিৎসা দিতে হয়, ছেড়ে দিয়ে নয়। জাকারিয়ার ইসলামের পরিবারকে অন্ধকারের মধ্যে রেখে হত্যাকারীর বিচার হলে চলবেনা, বিচারের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের জানার অধিকার আছে হত্যাকারীকে কী সাজা দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে মেন্টাল হেলথ আইন পরিবর্তনের জন্য তিনি সেক্রেটারি অব স্টেট ও জাস্টিস মন্ত্রনালয়কে আহবান জানান। তিনি হত্যাকারীকে ছেড়ে না দেয়ার আহবান জানিয়ে বলেন- সে নিজের পরিবার, জাকারিয়ার পরিবার এবং কমিউনিটির জন্য হুমকী হয়ে দাঁড়াবে।

মেয়র জন বিগস বলেন, নিহত জাকারিয়ার ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার দাবীতে আজ এতো মানুষ জড়ো হয়েছেন, এটি তার পরিবারের জন্য কমিউনিটির জন্য, গর্বের ব্যাপার। জাকারিয়া যে একজন ভালো মানুষ ছিলেন, কমিউনিটির সেবায় কাজ করে গেছেন, তারই উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, এই ক্যাম্পেইনকে আমি স্বতস্ফুর্তভাবে সমর্থন করি। কারণ জাকারিয়া ইসলামে পরিবার ও কমিউনিটিকে প্রটেক্ট করা এখন আমাদের দায়িত্ব। হত্যাকারীকে যদি ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে যেকোনো সময় তার হাতে এভাবে আরো ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, মেন্টাল হেলথ আইন পরিবর্তন হওয়া উচিত। এ জন্য ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাওয়া উচিত। নতুবা যেকেউ যেকাউকে ছুরিকাঘাত করে বলবে মানসিক অসুস্থ। এরপর বেরিয়ে আসবে।

দেলওয়ার খান বলেন, জাকারিয়া ইসলাম ছিলেন কমিউনিটি সেবায় নিবেদিতপ্রাণ এক ব্যক্তি। তিনি ইস্ট লন্ডন মসজিদের দীর্ঘকালীন ভলান্টিয়ার ছিলেন। পেশা জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন একজন ড্রাইভিং ইন্সট্রাকটর। এরপর ব্লাক ক্যাব চালক। কিন্তু কমিউনিটির মানুষকে সাহায্য করার জন্য তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে শতশত মানুষ উপকৃত হয়েছে। কমিউনিটর মানুষ তাঁকে আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে। এমসিবির সেক্রেটারী জেনারেল হারুন খান বলেন, নিহত জাকারিয়া ছিলেন একজন প্রাণবন্ত মানুষ। ছিলেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী। মানুষের সেবা করা ছিলো নেশা। তিনি আমাদের জন্য উন্নত চরিত্রের একটি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

শাফিউর রহমান বলেন, জাকারিয়া ইসলাম সবসময় নিজেকে মানুষের সেবায় উৎসর্গ করে দিতে ভালো বাসতেন। রোকেয়া সেন্টারে ফ্রি সার্ভিস দেবেন। তারা কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিলোনা। কুরআনের সাথে ছিলো তাঁর গভীর সম্পর্ক। কুরআনের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। তাঁর মধ্যে কোনো হিপোক্রেসি ছিলোনা। তিনি কমিউনিটির জন্য একজন অনুরকনীয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কমিউনিটিতে একটি বড় শুন্যতা সৃষ্টি হলো। যা পুরণ হওয়ার মতো নয়। তিনি যে নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হয়েছেন তার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তিনি বলেন, জাকারিয়া চলে গেছেন। এখন তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। হত্যাকারীকে যাকে ছেড়ে না দেয়া হয় এ জন্য আমাদেরকে ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখতে হবে। হাড্রেড ফ্যামেলীজ এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান হেনডি বলেন, এ ধরনের অনেক ঘটনার নজির রয়েছে। একজনকে হত্যা করে মেন্টাল হেলথে চিকিৎসাধীন থাকার কিছুদিন পর বেরিয়ে এসে অরো একজনকে হত্যা করছে ঘাতক। সুতরাং জাকারিয়া ইসলামের হত্যাকারীকে কিছুতেই ছেড়ে দেয়া উচিত হবেনা।

জাকারিয়া ইসলামের কন্যা জয়নাব জাকারিয়া বলেন, আমি কখনো কল্পনা করতে পারিনি আমার বাবা এভাবে নিষ্ঠুরতার শিকার হবেন এবং তার ন্যায় বিচারের দাবীতে জনসমাবেশে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে হবে। এটা আমার জন্য বড় কষ্টকর। তিনি মেন্টাল হেলথ আইন পরিবর্তনের দাবী জানিয়ে বলেন, আমার বাবার হত্যাকারী বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে এটা দেখতে আমাদের কষ্ট হবে। আমারা এখানে এসেছি বিচার মন্ত্রনালয়কে আমাদের কান্না শোনাতে। জাকারিয়া ইসলামের বড় ভাইন মোঃ আব্দুল নূর বক্তৃতা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন, তার মায়ের বয়স এখন ৮৫ বছর। জাকারিয়া ছুরিকাহত হওয়ার পর তাঁর মাকে সেই খবরটি জানানো ছিলো সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার। তার মা এখনও জানেন জাকারিয়া স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন, হত্যার শিকার হয়েছেন বলে জানেননা।

উল্লেখ্য, জাকারিয়া ইসলাম পূর্ব লন্ডনের গ্রেটোরেক্স স্ট্রিটে একটি রোকেয়া চিকিৎসা সেন্টার পরিচালনা করতেন। ঘটনার দিন, ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি যখন অফিসে একা বসে আছেন তখন হঠাৎ এক যুবক প্রবেশ করে তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই জাকারিয়া ইসলাম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ ঘটনায় পুলিশ আশফাক চৌধুরী নামে ভারতীয় বংশোদ্ভুত হত্যাকারী যুবককে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। হত্যাকারী যুবক পেশায় ডেন্টিস্ট। সে আদালতে নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ দাবী করে। ফলে আদালত তাঁকে মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন। হত্যার সবধরনের প্রমানাদী থাকা সত্ত্বেও তাকে ফৌজদারী অপরাধ আইনে বিচারের মুখোমুখী করা হয়নি। সম্প্রতি জাকারিয়া ইসলামের পরিবার জানতে পারে, শীঘ্রই তাকে মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে মুক্তি দেয়া হতে পারে।



Leave Your Comments


কমিউনিটি এর আরও খবর