প্রকাশিত :  ১৭:২১, ১৫ অক্টোবর ২০২০
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:২৫, ১৫ অক্টোবর ২০২০

বাংলাদেশে কেন এত বর্বরতা?

বাংলাদেশে কেন এত বর্বরতা?

মো: সাজেদুর রহমান

মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পরপর দুটি চাঞ্চল্যকর নারী নির্যাতনের ঘটনায় দেশে ও বিদেশে আমরা উদ্বিগ্ন। সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রী ধর্ষণের ঘটনার আকস্মিকতা না কাটতেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মধ্যযুগীয় কায়দায় এক নারীর সম্ভ্রমহানীর ঘটনা আমাদের বড় ধাক্কা দিয়েছে। আমরা অনেকেই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছি। বেশিরভাগই সামাজিক মাধ্যমে কালো মুখচ্ছবি প্রকাশ করেছি। 

এই প্রতিবাদ যে এই প্রথম তা নয়। এর আগেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বর্বরতা নিয়ে আমরা মুখর হয়েছি। কালের বিবর্তনে অল্প সময়ে তা ভুলে অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়েছি। বর্বরতার এই ইতিহাস নতুন নয়, তবে সম্প্রতি তা বেড়ে গেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু কেন বর্বরতা বাড়ছে দেশে? মানুষ কেন নৃশংস হচ্ছে? 

বর্বরতা বাড়ার একটা কারণ হতে পারে, তথ্য প্রবাহ। এর মানে হচ্ছে, আগেও বর্বতরা ছিল কিন্তু তা এখনকার মত প্রকাশ হত না। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগের কারণেই হোক অথবা গণমাধ্যমের তৎপরতার কারণেই হোক এখন আমরা বর্বরতার ঘটনাগুলো আগেরচেয়ে বেশি জানতে পারছি। 

আরেকটি কারণ হতে পারে, মানুষ এখন অত্যাচারিত হলে তা প্রকাশ করতে শিখেছে। কোন নারী নির্যাতিত হলে আগে সেগুলো চেপে যেতে বলা হত, এখন নারীরা সেগুলো প্রকাশে এগিয়ে আসছেন। এসব সমাজের অগ্রগতির উদাহরণ। তবে সম্প্রতি বর্বরতা সত্যই বেড়েছে এমন মত প্রকাশ করছেন অনেকেই। 

সম্প্রতি সারা বিশ্বেই মানুষের অমানবিক আচরণ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, বৈশ্বিক এই মহামারিতে মানুষ যখন ‘নব্য নিয়ম‘ মেনে সামাজিক দুরত্বে থাকছে, তখন তাদের মধ্যে অসামাজিক আচরণ বাড়তে পারে। রোগ চিন্তা, অর্থনৈতিক টানাপোড়ন এবং অন্যান্য হতাশা মিলিয়ে মানুষ বেশি অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। উন্নত দেশে এই পরিস্থিতিতে মানষিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের সাথে সাথে মানুষর মানষিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নানান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

আমাদের দেশে হতাশার অনেক কারণ মহামারির আগে থেকেই ছিল। মানুষের মধ্যে বর্বর ও নৃশংস আচরণও কম ছিল না আগে। ছোট্ট বাচ্চার পায়ুপথে টায়ারে পাম্প দেওয়ার মেশিন দিয়ে হাওয়া দিয়ে হত্যা করার মতো ঘটনা কম নয়। বিচ্ছিন্ন এই বর্বরতার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক বর্বরতা আামদের খুবই পরিচিত। বর্বরতা, নৃশংসতার উৎপত্তি ও কারণ নিয়ে সামাজিক ও মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা রয়েছে। কী বলা হচ্ছে এসব গবেষণায়?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কোন ব্যাক্তির কুকর্ম করার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকে। প্রথমত, প্ররোচনা। মানুষ দুইভাবে প্ররোচিত হতে পাারে। এক, সে জুলুমের শিকার। জুলুম সহ্য করতে না পেরে সে বর্বর আচরণ করতে পারে। আমাদের দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক জুলুম অনেকটা বিশ্ব পরিচিতি পেয়েছে। দেশব্যাপী বর্বরতা বাড়ায় এই জুলুমের প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। নানা সময়ে জালাও পোড়াও, ভাংচুর এম বর্বরতার উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, প্রশ্রয়। সমাজ এবং রাষ্ট্র ক্রমাগত অপরাধীদের প্রশ্রয় দিয়ে গেলেও মানুষ নৃশংস আচরণে প্ররোচিত হতে পারে। সাংবাদিক সাগর-রুনী হত্যা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামে তরুণকে নৃশংসভাবে হত্যাসহ আরো প্রকাশ্য বর্বরতার প্রশ্রয় মানুষকে নৃশংস হতে প্ররোচিত করে।

একজন ব্যক্তি বর্বর আচরণ করার আগে কিছু গাণিতিক হিসাব নিকাশ করে। এই হিসাব নিকাশ পরিকল্পিত বা অবচেতন মনে হতে পারে। এই হিসাবের ফলাফলের উপর নির্ভর করে বর্বরতার মাত্রা। প্রথমত সে দেখে যে কুকর্মটি করতে গেলে তাকে কতটুকু বাধা পেতে হবে। কাজটি করলে তার জন্য কতটুকু লাভ হবে আর তার বিপরিতে কতটুকু ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকির চেয়ে লাভের পরিমাণ বেশি দেখলে মানুষ বর্বর কাজে প্রবৃত্ত হয়।

বাংলাদেশী হিসেবে আমরা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিবাদী। তবে সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম আমাদের প্রতিবাদের নিরাপদ ময়দান হয়ে উঠেছে। এই ময়দান প্রতিবাদিদের  জন্য যেমন নিরাপদ, অপরাধীদের জন্যও ঠিক তেমনি। অপরাধীরা প্রমাণ পেয়েছে যে এই প্রতিবাদ খুবই ক্ষণস্থায়ী। একটা ইস্যূ নিয়ে এসে অন্যটাকে ভুলিয়ে দেয়।তাই দেশে বখাটে গু-ারা অপরাধ করতে কম বাধা বোধ করে। 

একজন যৌক্তিক মানুষের জন্য এটা অস্বীকার করা কঠিন যে দেশে রাজনৈতিক দলের ভারসাম্য এখন অনেকটাই বিঘিœত। একটা দল মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যগুলো ক্রমশ বিলিন হয়ে যাচ্ছে। সেটা হতে পারে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাসীন দলের জুলুমের কারণে অথবা অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক ও নৈতিক অদক্ষতার কারণে। তবে যেই কারণেই হোক, দেশে এখন বেশিরভাগ মানুষই ক্ষমতাসীন দলের হিসেবে চিহ্নিত হতে চাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থে। এরা প্রমাণ পেয়েছে যে ক্ষমতাসীন দলে থাকলে অনৈতিক মদদ পাওয়া যায়। অনেক দোষ মাফ হয়ে যায়। কর্মীদের প্রতি ক্ষমতাসীন দলের অনৈতিক মদদ তাদের অপরাধের ঝুঁকি কমিয়ে দিচ্ছে। 

একইসাথে আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় কুকর্মের একটা বড় চাহিদা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এবং সাংবাদিকতা জিবনে বেশ কিছু নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে। কোন কর্মী অপরাধ করলে অনেক নেতাকে দেখেছি তাকে একান্তে ডেকে পিঠ চাপড়ে বলছেন, ‘এসব কাজ আর একটু সাবধানে করতে হয়‘। বখাটে কর্মিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তিতে ভালো পদে যেতে দেখেছি। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে এই চর্চা রয়েছে। এই চর্চা মানুষকে বার্তা দেয় যে অপরাধ করলে লাভবান হওয়া যায়। ক্ষমতা প্রকাশ করার জন্য তাই অনেক কর্মিই বর্বর ও নৃশংস কাজ করে থাকে। 

সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার এই সংগায়ন দেশে বর্বর আচরণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে বলে আমার মনে হয়। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের পেছনে ক্ষমতা প্রদর্শনের এই মোটিভ গবেষণায়ও উঠে এসেছে। অনেক গবেষণায় বলা হয়েছে, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ যতটা না যৌন আকাঙ্খা থেকে হয় তার চেয়ে বেশি হয় ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। 

এই বিষয় কেবল নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে নয় বরং আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও সত্য। একজনকে রাস্তার মধ্যে পেটাতে পারলেই আপনি নায়ক। সেটা নৈতিক বা অনৈতিক যেভাবেই হোক না কেন। ‘কড়া‘ শিক্ষকই আমাদের মধ্যে এখনও ভালো শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতা প্রদর্শনের এই চাহিদা কেবল তৃণমূল মানুষদের মধ্যে রয়েছে তা নয়। বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত, এবং সুশিক্ষিত ব্যক্তি যারা আমাদের সমাজ পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখন, তারাও এই ক্ষমতার পুঁজারি। 

অপরাধের পরপরই  অপরাধীকে ক্রস-ফায়ারে, প্রকাশ্য ফাঁসিতে, গণধোলাইএ মারার আকুতি বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এটা ক্ষমতা প্রদর্শণের অন্য আর এক তরিকা। বিচারহীনতার আরেক সংস্কৃতি। সম্প্রতি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনী লড়াইএর জন্য উকিলও পাওয়া যাচ্ছে না। এটা আমাদের চরমপন্থার নিদর্শন। যে কোন অপরাধীর আইনি লড়াইএর অধিকার রয়েছে, অন্তত: প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায়। বিনা বিচারে হত্যা এবং বিচার পাওয়া থেকে কাওকে বঞ্চিত করা বর্বরতাকে সামাজি স্বীকৃতি দেওয়ারই নামান্তর। এতে বর্বরতা বাড়বে বৈ কমবে না। আার তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি।

London 15 October 2020


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর