প্রকাশিত :  ১৪:৩১, ২৬ নভেম্বর ২০২০
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৩৮, ২৬ নভেম্বর ২০২০

ঐতিহ্যের তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি

লন্ডনে হেরিটেজ প্রজেক্ট ঢাকায় টেকনলজি ফর প্রিজারভিং হেরিটেজ

ঐতিহ্যের তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি

গত তিন দশক ধরে বৃটেনে বসবাস করছি, সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কারনে ছোট বড় অনেক ইভেন্ট কভার করেছি, সেই সুবাদে কিছু কিছু ইভেন্ট আমার এখনও মনে ভীষনভাবে স্থান করে নিয়েছে। এ রকম একটি ইভেন্ট হলো - ১৯৮৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জামদানির উপর ওভেন এয়ার নামের আন্তর্জাতিক ইভেন্ট। এই ইভেন্টের  বিষয়ে আমি নীচে আরো বিস্তারিত লিখছি এ কারনে যে বাংলাদেশে বর্তমানে তাঁত ও জামদানি নিয়ে প্রযুক্তিকে সংযুক্ত করে কাজ শুরু হয়েছে, নতুন উদ্যেক্তারা যারা এই আন্দোলনে নেমেছেন  অতীতের যোগসূত্র তাদের উৎসাহ দিতে পারে বিধায় ইতিহাসকে টেনে আনার প্রয়াস। বিলুপ্ত মসলিন, জামদানি এবং আমাদের সিলেটের মনিপুরি তাঁত বস্ত্র বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা রয়েছে। বলে রাখি, আমার জন্ম শহরের ছড়ারপারে হলেও বড় হয়েছি শেখঘাট এলাকায়। আমার জন্মস্থান ও পরবর্তীতে বেড়ে ওঠার মহল্লার আশে পাশের এলাকাগুলো হলো লালারদিঘীর পার, লামাবাজার। এসব এলাকায় মনিপুরি প্রতিবেশীদের বসবাস। পুরো সিলেট নগরীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন মনিপুরি জনগোষ্ঠী। এর মধ্যে মাছিমপুর, শিবগঞ্জ, মনিপুরি রাজবাড়ীসহ অনেক এলাকায় রয়েছে মনিপুরীদের পাড়া।  কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর সিলেট ভ্রমনের সময় মাছিমপুর গিয়েছিলেন। সংস্কৃতির অংগনে মনিপুরি নৃত্য এখন বাংলাদেশের শিল্পকলার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সমাদৃত। মনিপুরি খাবার যেমন তিলুয়া, খই, ভেটের খই, চিড়া মুড়ির গুড়ের লাড্ডু আজও বৃহত্তর সিলেটের ঘরে ঘরে নিত্যদিনের আপ্যায়নে পরিবেশিত হয়। দেশে বিদেশে সিলেটীদের ঘরে ঘরেও এসকল মুখরোচক খাবার সমাদৃত। সিলেটের বন্দর বাজারসহ  হাট বাজারে মনিপুরি খই, গুড় মুড়ির লাড্ডু এখনও পাওয়া যাওয়ার কথা । ছোটবেলায় ছড়ার পারে থাকতে দেখেছি বিকেলের দিকে মাছিমপুর থেকে মনিপুরিরা গামছা, খই, মুড়ি ইত্যাদি নিয়ে বন্দরবাজারের দিকে ছুটছেন। একটু বড় হলে লামাবাজারে দেখেছি অনেকের বাসায় তাঁত যন্ত্র। এসব দেখে দেখে আমার বড় হওয়া। আমাদের শিক্ষক ছিলেন মনিপুরি আর অনেক সহপাঠী বন্ধু বান্ধব ছিল মনিপুরি। কালের আবর্তে সেই বন্ধুরা হারিয়ে গেছে।  আমার ঠাঁই হয়েছে লন্ডনে। কয়েক বছর আগে লন্ডন থেকে সিলেট গিয়ে দেখলাম লামাবাজারে মনিপুরি বস্ত্রের একটি পল্লীও গড়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের সৌখিন মানুষের কাছে মনিপুরি পন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রবাসীরা  উপহার সামগ্রী হিসাবে মনিপুরি জামদানি, তাঁতের শাড়ী, শাল, নকশীকাঁথা,অলংকার ইত্যাদি উপহার দেয়ার জন্যে কিনে নিয়ে যান।  এ ভাবে প্রবাসী বাঙালীদের কাছে দেশীয় পন্যের কদর বেড়েছে।  আমার এই লেখার শুরুতেই আমি বলেছিলাম, মসলিন ও জামদানি নিয়ে বৃটেনের ফ্যাশন জগতে আগ্রহ ছিল বেশ আগে থেকেই। সেই আগ্রহ থেকেই ১৯৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল আর্ট গ্যালারিতে  ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের উদ্যেগে জামদানির উপর এক  প্রদর্শনির আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ থেকে তাঁত ও তাঁতের পণ্য নিয়ে আসা হয় প্রদর্শনীর জন্যে। ভিএন্ডএ এর এডুকেশন অফিসার প্রয়াত শিরীন আকবর ছিলেন এই প্রদর্শনির উদ্যেক্তা। লন্ডনের সোহো এলাকার (জনাব আমীন আলীর) রেডফোর্ট রেস্টুরেন্ট তখন ভোজন রসিক সেলিব্রিটিদের পদভারে মুখরিত। সেখানেই আয়োজন করা হলো সংবাদ সম্মোলন। আমি তখন লন্ডনের সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকায় কাজ করতাম।  ওভেন এয়ার আয়োজিত জামদানীর উপর রিপোর্টিং করতে গিয়ে আমি অভিভুত হয়েছিলাম এ কারনে যে, লুপ্তপ্রায় এই মসলিন/জামদানি এখনো বৃটিশ ফ্যাশন জগতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। জামদানি প্রদর্শনি বৃটেনের বাংলা মিডিয়া ছাড়াও মুলস্রোতের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল। ওভেন এয়ার বাংলাদেশের গৌরবময় মসলিন ও জামদানির নির্মাতা তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য বৃটেনের ফ্যাশন জগতের সামনে সম্মানের সাথে তুলে ধরতে পেরেছিল। 

এই ইভেন্টের পর বাংলাদেশের হাইকমিশনের কমার্শিয়েল সেকশন যদি সংশ্লিষ্ট বিজনেস হাউসগুলোকে ইনভলভ করতে পারতো তাহলে লন্ডন ফ্যাশন ও ডিজাইন জগতে জামদানি একটি স্থান করে নিতে পারতো। লন্ডনের ওয়েস্টফিল্ড শপিং সেন্টারে খাদি পণ্যর দোকান আছে। আমাদের জামদানির শপও হতে পারতো। যাই হোক ওভেন এয়ার ইভেন্ট গত হওয়ার অনেক বছর কেটে যাওয়ার পর, হঠাৎ একদিন দেখলাম লন্ডনের স্টেপনি কমিউনিটি ট্রাস্টের উদ্যোগে হেরিটেজ প্রজেক্ট মসলিনের উপর একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। জামদানি ব্যবহার করে মসলিনের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করে ড্রেস রিক্রিয়েট করার উদ্যোগ তারা নেয়। এই উদ্যোগের সাথেতারা লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন এন্ড ডিজাইন ও লন্ডনের ফ্যাশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে জড়িত করেছিলেন। লন্ডনের ডিজাইনাররা ঢাকার জামদানি দিয়ে তিন শত বছর আগের অভিজাত মসলিন ড্রেস রিক্রিয়েট করেন। বৃটেনের মুলস্রোতের ফ্যাশন ও ডিজাইন প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের কারিগরদের যোগসুত্র স্থাপনের এক শুভ উদ্যোগ নিয়েছিল এই হেরিটেজ প্রকল্পটি। এই প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শেষ হয়ে গেছে। তাদের পক্ষ থেকে তথ্যবহুল একটি ইংরেজী প্রকাশনা বের করা হয়েছে, এই সচিত্র প্রকাশনাটি ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসাবে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।  লন্ডনের হেরিটেজ প্রকল্পটির জামদানি পর্বটি শেষ হয়ে গেলেও মনে আশার সঞ্চার হলো যখন দেখলাম, টানা তৃতীয়বারের মত ঢাকার এসএমই ফাউন্ডেশন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ডিজাইনার্স বাংলাদেশ এএফডিবির যৌথ উদ্যেগে হেরিটেজ হ্যান্ডলুম ফ্যাস্টিভ্যাল ২০২০ আয়োজন করা হয়েছে অনলাইনে। জানানো হয়েছে, এতে ৪০টি স্টল যোগ দেবে। আরেকটি সংবাদে দেখলাম মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে এম আব্দুল মোমেনের সাথে সিলেট ওমেন চেম্বারস এসোসিয়েশনসহ আরো কয়েকটি ওমেন চেম্বার সাক্ষ্ াকরে বিদেশে মনিপুরি তাঁত পন্য, শীতল পাটিসহ অন্যান্য পন্য রপ্তানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।  এই সময়ে আরো দেখলাম,আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের ইনস্ট্রাগ্রামে টেকনোলজি ফর প্রিজার্ভিং হ্যারিটেজ শীর্ষক সেমিনারের বিজ্ঞাপন। এই ভার্চুয়াল সেমিনারে অংশগ্রহনকারীরা ব্যাক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন আমাদের মান্যবর হাই কমিশনার সাইয়েদা মুনা তাসনিম, এএফডিবির প্রেসিডেন্ট এমএস মানতাসা আহমেদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজাইনার বিবি রাসেল সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। অনলাইনে প্রোগ্রাম দেখার পর একজন অনিসন্ধ্সিু সংবাদকর্মী হিসাবে উপরোক্ত তিনজনের সাথেই ইমেইল ও ওয়াটসএপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছি।   গত ৩৫ বছর ধরে মিডিয়ার সাথে জড়িত থাকার কারনে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলতে পারি - দেশে বিদেশে বিবি রাসেলের ভাবমুর্তি ও যোগাযোগকে বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারলে দেশ ও জাতিই লাভবান হবে। ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট আন্দোলনের মাধ্যমে বিবি রাসেল শুধু পাশ্চাত্য জগতে নয়, ভারত, রাশিয়া, ইউরোপ আমেরিকায় খ্যাতি লাভ করেছেন। এ কথা জানা যে, বিবি রাসেল ভোগ ম্যাগাজিন সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার গার্ল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, তিনি পাশ্চাত্য জগতের রঙ্গীন বিলাসি জীবন ছেড়ে বাংলার শীতলক্ষ্যার পারে চলে এসেছিলেন কারন তিনি তার নিজের দেশের জন্যে কাজ করতে চান। এখন বাংলার লুপ্ত প্রায় তাত শিল্পকে নতুন প্রান দিতে বিবি রাসেলের ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। গ্রামে গঞ্জে তাঁত শিল্পের উন্নয়নের জন্যে তাঁতীদের নিয়ে নিবেদিতপ্রান হয়ে কাজ করছেন বিবি রাসেল। তিনি অনুপ্রানিত করছেন গ্রাম বাংলার তাঁতীদের। বিবি রাসেলের এই উদ্যোগের কারনে দেশে বিদেশে শিক্ষিত তরুন সমাজের মাঝেও তার একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। বিবি রাসেল তরুণদের উদ্দীপ্ত করার জন্যে বক্তব্য রাখছেন। ইউটিউবে তার এসব বক্তব্য অনেক উদীয়মান ডিজাইনারদেরও উ্ৎসাহিত করছে। বিবি রাসেল তাঁত শিল্প পুনরুজ্জীবনে শুধু বাংলাদেশেই নয় ভারত ও অন্যান্য দেশে ও ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পে নারীদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্যে আমন্ত্রন পেয়ে থাকেন। কয়েক মাস আগে ভারতে গিয়ে এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করে এসেছেন। জানা গেছে, বিবি রাসেল সম্প্রতি ভারতে নারী পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধারকৃত দু:স্থ নারীদের তাত বস্ত্র বুননে প্রশিক্ষনের জন্যে আমন্ত্রন পেয়ে সেখানে গিয়ে প্রশিক্ষন দিয়ে এসেছেন। বছর তিনেক আগে লন্ডনে আমি তার একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম, বৃহত্তর সিলেটের মনিপুরি বস্ত্র শিল্পকে বিশ্ববাজারে নিয়ে আসার ব্যাপারে বিবি রাসেল তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি খুবই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ঢাকাতে এফডিবির প্রেসিডেন্ট এমএস মানতাশা আহমদ লন্ডনে মান্যবর হাইকমিশনার সাইয়েদা মুনতাসনিমের মত ব্যক্তিরা যখন তাঁত শিল্পের পুনরুজ্জীবনে সহযোগিতা  করে চলেছেন, তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। নিশ্চয়ই তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন। এ ব্যাপারে আমি মনে করি দেশের পন্য বিদেশে বিপনন করতে হলে দুতাবাসগুলোর কমার্শিয়েল সেকশনকে আধুনিক করে ঢেলে সাজাতে হবে। সরকারি অফিসার দিয়ে বিপণন কাজ সফল হওয়ার নজির খুব একটা দেখা যায় না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে উদ্যোক্তারা যারা এই ফিল্ডে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তারা পণ্য উ্পাদন ও বিপননের যে চেইন সৃষ্টি  করেছেন তাদেরকে ইনভলভ করতে হবে। বিবি রাসেলের ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট, এম এস মুনতাসা আহমেদের দেশি ভালবাসি,  জাস্ট হেল্প ইউকে ও.  বিবি ফাউন্ডেশন লন্ডন নামের সংগঠনের সহযোগিতায় উর্মি ও দিবাকরের সিলেটের ঐতিহ্যের তাঁত নামের সংগঠন  যে উদ্যোগ নিয়েছে এই সব উদ্যেগ তরুন প্রজন্মকে হ্যান্ডলুম এবং হ্যারিটেজের ফ্যাশন জগতকে উদ্ভাসিত করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী বাংলাদেশীরাও বাংলাদেশী বস্ত্র ব্যবহারের  এই আন্দোলনে শরীক হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। 

*নজরুল ইসলাম বাসন: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট*

লন্ডন, ২৫ নভেম্বর ২০২০



Leave Your Comments


শিল্প-সংস্কৃতি এর আরও খবর