মন্তব্য কলাম

প্রকাশিত :  ১৪:৪১, ২৬ নভেম্বর ২০২০
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৪৬, ২৬ নভেম্বর ২০২০

ট্র্যাম্প ব্র্যান্ড আবার ফিরে আসবে হোয়াইট হাউসে

ট্র্যাম্প ব্র্যান্ড আবার ফিরে আসবে হোয়াইট হাউসে

ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাবলেন, সাংবাদিকটা সত্যিকার অর্থেই বেয়াদব। মঙ্গলবার ২৪ নভেম্বর তিনি হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ঐতিহ্যবাহি বার্ষিক থ্যাঙ্কসগিভিং টার্কি পারডন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ি তিনি একটি টার্কিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারডন (ক্ষমা মঞ্জুর) করলেন। গোল বাধালো এক সাংবাদিক। অনুষ্ঠান শেষ করে বিদায় নেয়ার সময় সে ব্যাটা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে বসলো: মি: প্রেসিডেন্ট, ক্ষমতা ছেড়ে যাবার আগে আপনি কি আপনার নিজের জন্যেও একটা ক্ষমা মঞ্জুর করে যাবেন? 

ট্রাম্প এই বেয়াদবির জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কিচ্ছু বলেননি। তাঁর বলার কিছু যে নেই, তা নয়। কিন্তু এখন একটু বেকায়দা যাচ্ছে। তাই আপাতত মুখ না খোলার পন্থাই তিনি অনুসরণ করছেন। নির্বাচনের পরবর্তী তিন সপ্তাহে জনসমক্ষে তিনি এ পর্যন্ত বেরিয়েছেন মাত্র চারবার। ‘আচ্ছা, এই সাংবাদিকটা কি জানে না, রিপোর্টারদের সাথে কথা বলার জন্যে আমি সব সময় মুখিয়ে থাকি‘, ভাবলেন ট্রাম্প। ভাবলেন, সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকাই তো আমার সখ। আজীবন সেই সখ পূরণ করেও এসেছি। এখন কেন রা‘ কাড়ছি না, সেটা আমি জানি-নিজের মনেই গজগজ করলেন ট্রাম্প? 

রোজ গার্ডেন ছেড়ে ভেতর-বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন তিনি। সাথে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া। 

সব কিছু অদ্ভুত লাগে এখন ট্রাম্পের কাছে। এই থ্যাঙ্কসগিভিং অনুষ্ঠানটা এবার ক্যাবল টিভি চ্যানেলগুলো সরাসরি প্রচার করলো না। আমাকে নিয়ে মাতামাতিও যেন কমে গেছে রাতারাতি। আমি সারা জীবন নিজেকে বিজয়ী দেখে এসেছি। এখন বাইডেনের কাছে হেরে গিয়েছি বলে যেটা প্রচার হচ্ছে, সেই বাস্তবতা কি এতো তিক্ত? ট্রাম্প ভাবতে চেষ্টা করলেন। 

ট্রাম্প ভাবলেন, এইতো আজ মঙ্গলবারই তো আমি ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্সিয়াল চেয়ারে বসা আমার একটা ছবি দিয়ে টুইট করলাম, যেখানে লিখেছিলাম: কোন কিছুই আমি মেনে নিচ্ছি না। লোকজন কি এই সাদা কথাটাও বুঝতে পারছে না?

ওভাল অফিসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ট্রাম্প। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার শক্তিকেন্দ্র হচ্ছে হোয়াইট হাউস। এর কেন্দ্রস্থল হলো ওয়েস্ট উইং, তারও কেন্দ্রবিন্দু ওভাল অফিস, যেটি ওই শক্তিকেন্দ্রের সবচাইতে বেশি শক্তিধর মানুষটির ঘাঁটি। এটি আমেরিকান এক্সিকিউটিভ পাওয়ারের প্রাণকেন্দ্র।  

হাঁটতে হাঁটতে ট্রাম্প লক্ষ্য করলেন, মন-মেজাজ তাঁর এখন সত্যিই বড়ই খারাপ। কাজ-কর্ম সব শিকেয় তুলে রেখেছেন। কিচ্ছু ভাল্লাগে না।

ট্রাম্প লক্ষ্য করেছেন, নির্বাচন-পরবর্তী দিনগুলোতে তাঁর আশেপাশে সব সময় ঘুরঘুর করতে থাকা মানুষজনের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো করে কমে গেছে। আগে যারা কারণে-অকারণে ওভাল অফিসে একবার ঢুঁ মারার অপেক্ষায় ওঠবোস করতেন, এখন তাঁরা ওদিকটা মাড়ানোর চিন্তাই করেন না। আগে চাইতেন, কোন সুযোগে যদি একবার প্রেসিডেন্টের নজরে পড়া যায়, তাহলে ভাগ্য ফিরলেও ফিরতে পারে। ট্রাম্প টের পাচ্ছেন, এখন সেটা চিন্তা করতেও তারা শিউরে ওঠেন। ট্রাম্প এটাও বুঝতে পারেন, এদ্দিনে সবার জানা হয়ে গেছে, ভোটে বাইডেন তাঁকে কুপোকাত করে ফেলার পর ট্রাম্পের মর্জি-মেজাজ এখন আগ্নেয়গিরির আকার ধারণ করে আছে। কখন কার ওপর আগ্নেয়গিরিরি অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়ে যায়, সে নিয়ে সবাই এখন থরহরি কম্পমান থাকেন। 

ট্রাম্পের আচম্বিতেই মনে হলো, আরে, কি আশ্চর্য, ওই জুলিয়ানি ব্যাটা যে এতো বড় মহা গর্দভ, সেটা তো আগে বোঝা গেলো না। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত এটর্নী রুডি জুলিয়ানি সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে এক কান্ডের জন্ম দিয়েছেন। টাক মাথার তিন পাশে ঝালরের মতো যে কিছু পরিমাণ চুল এখনও গজিয়ে আছে, সেগুলোতে তিনি কলপ লাগিয়ে স্মার্ট সাজতে চান এখনো। তো সেই কলপ দিয়ে মাথাটাকে কালিমালিপ্ত করে তিনি ‘প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিশাল কারচুপি হয়েছে‘ বলে সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক বোলচাল ঝেড়ে যাচ্ছিলেন।  

দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠতেই ট্রাম্প নিজেই একটু ফিক করে না হেসে পারলেন না। সম্ভবত এতো মিথ্যা কথার উপর্যুপরি ঝলকানিতে চুলের কলপ উষ্টত হয়ে উঠতে শুরু করে এবং তা গলে নামতে থাকে জুলিয়ানির জুলফি হয়ে ঘেমে চুপচুপে হয়ে যাওয়া গাল বেয়ে থুতনি পর্যন্ত। জুলিয়ানি খুব বিরক্ত বোধ করছিলেন কলপের এমন অধ:পতনে। বারবার তিনি টিস্যু দিয়ে এই পতন ঠেকিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু চেষ্টা সফল হয়নি। তাঁর মস্তিষ্ক-প্রসূত অবিরাম মিথ্যা বোলচালের মতো তাঁর মস্তক-প্রসূত কলপের ভূমিষ্ঠ হওয়ার অবিরাম সাধনা পুরো সংবাদ সম্মেলনের সময়টা জুড়েই অব্যাহত ছিলো। 

ট্রাম্প মনে মনে বললেন, এ ব্যাটা জুলিয়ানি, যে তার চুলের কলপটাই ধরে রাখতে পারে না, সে কোর্ট-কাচারী করে আমার প্রেসিডেন্সি ধরে রাখবে কি করে? যত্তসব। একটা মামলাতেও তো এখনো জিততে পারলো না।

ট্রাম্পের মনে পড়লো, জো বাইডেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ট্রাম্প যা করছেন, তাতে করে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে দায়িত্বহীন প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে স্থান করে নিতে চলেছেন। 

ট্রাম্প ভাবলেন, তাতে আমার বয়েই গেলো। বাইডেন কি বললেন আর না বললেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না, বরং, আমি কি করি আর কি বলি, তার ওপর বাইডেনের অনেক কিছু যায় আসে। আচ্ছা, ২০১৬-তে আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর হিলারীসহ ডেমোক্র্যাটরা আমার পেছনে কিভাবে লেগে ছিলো, মনে নাই? আমি কি ভুলে গেছি? আমাকে জেতানোর জন্যে রাশিয়া আদাজল খেয়ে লেগেছিলো, এ নিয়ে তদন্তের নামে কতো কিছু করলো তারা। শেষ পর্যন্ত কি হলো? আমার পক্ষে তারা রাশিয়ান হাত-সাফাইয়ের কোন প্রমাণই তো পেলো না। তো আমি কি এখন তাদের এমনি এমনিই ছেড়ে দেবো?  

ট্রাম্পের মনে পড়লো, এক দল বলছে, আমার বোঝা দরকার, আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। ভবিষ্যতের ভাবনা করা দরকার। এসব পাগলামি এখন বাদ দিতে হবে। না হলে আমি নিজেই আমার ব্র্যান্ডের ক্ষতির কারণ হবো। আরে, আগের কথা বাদ দিলাম। মাত্র চার বছরে আমি শুধুমাত্র রাজনীতির অঙ্গণেই আমার যে ব্র্যান্ড আমি ক্রিয়েট করতে পেরেছি, তার আর কোন নজির অছে। জীবনে কোন দিন রাজনীতি করি নাই, রাজনীতির ধারে-কাছেও ছিলাম না। কিন্তু কি? প্রথম দফাতেই তো আমি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলাম। আর আমার চার বছরের প্রেসিডেন্সিতে আমার সাপোর্ট বেইজে কেউ কি কোন ফাটল ধরাতে পারলো? না। এই যে এবারের নির্বাচনে আমি দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের ভোট পেয়ে গেলাম, এটা কি রেকর্ড না? ৭০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ভোট আমি পেয়েছ্।ি এটা তো আমার আল্টিমেইট পাওয়ার আর অথরিটির প্রমাণ। দেশের অর্ধেক মানুষ যে আমার বকওয়াজি বুঝতেই পারছে না-এটা কি আমার ব্র্যান্ডের সাফল্য না? যত্তোসব গাধার দল। এরা এতো বড় গাধা যে, এদের কারণেই রাজনীতির মাঠে আমি একেবারে নতুন এক মানুষ তো ফাটাফাটি এক ব্র্যান্ডের সৃষ্টি পেরেছি। যে ব্র্যান্ড আমি রাজনীতির ময়দানে নিয়ে এসেছি, সেই ব্র্যান্ডের ক্ষতি হবে আবার কি, এই ব্র্যান্ড দিয়ে আমার মেয়ে ইভাংকা, আমার নাতিপুতি সবাই চালিয়ে দিতে পারবে। এবারে বাইডেনের কাছে আমাকে যদি ক্ষমতা ছেড়েও যেতে হয়, ট্রাম্প ব্র্যান্ড কিন্তু আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসবে, এটা নিশ্চিত। আমেরিকায় ট্রাম্প ডাইন্যাস্টি চালু হয়ে গেলো। কেনেডি ক্ল্যানও এর কাছে কিছুই না। 

হোয়াইট হাউসের অন্দর মহলে ঢুকে গেলেন ট্রাম্প। 

মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তারঃ স্পেশাল কন্ট্রিবিউটর, সাপ্তাহিক জনমত এবং জনমত ডটকম, সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব ও সিলেট প্রেস ক্লাব।

লন্ডন ২৫ নভেম্বর ২০২০


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর