মন্তব্য কলাম

প্রকাশিত :  ১০:২১, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৬, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০

হেফাজত ব্যাকফুটে কেন? সামনেও তো এগোনো যায়

হেফাজত ব্যাকফুটে কেন? সামনেও তো এগোনো যায়

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে মুজিববর্ষ পালন উপলক্ষে ঢাকার ধোলাইরপাড়ে সরকারী উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর বিরাধিতায় কওমী শিক্ষা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশে তোলপাড় তোলার একটা চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু এখনকার মতো তারা এ থেকে বিরত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সরকার কৌশলী হাতে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, বলা চলে। এজন্যে দৃশ্যত কঠোর কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারী দলের যুব ও ছাত্র সংগঠন এবং সেই সাথে সমমনাদের মাঠে নামানো হয়েছিলো। দু’ সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই হেফাজত চলে গেছে ব্যাকফুটে।  

হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা-আমীর আল্লামা শফির সময়ে শাপলা চত্বর-পরবর্তী একটি পর্যায়ে শেখ হাসিনার সরকারের সাথে হেফাজতের এক ধরণের সমঝোতামূলক একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। আল্লামা শফির নেতৃত্বাধীন হেফাজতের দাবী অনুযায়ি কওমী শিক্ষা-পদ্ধতির 

স্বীকৃতি দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ সরকার, পাঠ্যক্রমে কিছু পরিবর্তন  আনা হয়েছিলো, আল্লামা শফির কর্মকেন্দ্র চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসাকে দেয়া হয়েছিলো মাদ্রাসা সংলগ্ন রেলওয়ের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমিও।  

আল্লামা শফির হেফাজত এক সময় প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপধিতেও ভূষিত করেছিলো। হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্বে যারা এখন অধিষ্ঠিত, সেই সমঝোতার পক্ষে তারা ছিলেন না। কিন্তু আল্লামা  শফির কারণে তখন তাদের পক্ষে এই বিশেষ সম্পর্কের বিশেষ বিরোধিতা করা সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন উঠছিলো, আল্লামা শফি-পরবর্তী যুগে হেফাজতের নতুন নেতৃত্বে এখন আবার ‘শাপলা-চত্বর’ ঘটানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে কি-না। ‘‘‘মূর্তি’ ভেঙে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবো‘, ‘টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে নেবো’- উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া এসব ঘোষণার পরবর্তীতে দু’ সপ্তাহের মাথায় হেফাজতের নেতৃবৃন্দ এখন বলছেন, ‘‘আমরা বঙ্গবন্ধুর বিরোধী নই, জাতীয় এই নেতাকে আমরা ভালোবাসি, আমরা নেহায়েত মূর্তির বিরোধী”। আলামতে মনে হচ্ছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হেফাজতের কাছে সম্ভবত এই বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে যে, প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ক্র্যাকডাউনে যেতে সরকার দ্বিধা করবে না।  

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের মহাসমাবেশ ছিলো সে সময়কার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিশাল একটি চ্যালেঞ্জ। তখন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি পূর্ণশক্তি নিয়ে রাজনীতির মাঠে বিদ্যমান ছিলো, ছিলো বিএনপির জোটসঙ্গী সুসংগঠিত সাংগঠনিক শক্তিতে বলীয়ান জামায়াতে ইসলামীও। এই দু’টি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনই সে সময় নেপথ্যে ছিলো হেফাজতের প্রধান দুই পৃষ্ঠপোষকরূপে। হেফাজতের সাথে জামায়াতের দ্বন্দ্ব রয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে তারা সে সময় বিএনপির সাথে একযোগে হেফাজতের প্রতি সমর্থন যুগিয়েছিলো বলেই বলাবলি হয়। বহুমুখি কৌশল প্রয়োগ ও কঠোর প্রশাসনিক একশনের সমন্বয়ে সরকার সে সময়কার ওই সঙ্কট দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিলো। 

এবারে হেফাজতের গা ঝাড়া দেবার সময় দৃশ্যত হীনবল বিএনপি-জামায়াতের অবস্থানও যদিও ব্যাকফুটে, কিন্তু  অভিযোগ আছে, পেছনে থেকে তারা এবারও হেফাজতকে সমর্থন দিয়ে চলেছে। মূল লক্ষ্য নিশ্চয় সরকারকে বড়সড় ‘ধাক্কা’ দেয়া।  আল্লামা শফির মৃত্যু, তাঁর পুত্রসহ তাঁর অনুসারীদের হেফাজত থেকে সাফল্যের সাথে বিতাড়নের পর হেফাজতকে ২০১৩ সালের অবস্থানে আবার পৌঁছে দেয়ার একটা চেষ্টা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোর থাকতে পারে। ঈদানীং বাংলাদেশে রাজনীতির ময়দান নিস্তরঙ্গ থাকার সুবাদে ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া যায় এমন যে কোন ইস্যু রাজপথ উত্তপ্ত করার একটা বড় নিয়ামক। হয়তো এ রকম ভাবনা থেকে ২০২০-এ আবার হেফাজতের সামনে আসার অথবা হেফাজতকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলেছিলো।

বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য প্রতিষ্ঠাকে ইসলাম বিরোধী বলে হেফাজত নেতারা এর বিরোধিতা করছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের একটি ভাষ্কর্য চট্টগ্রামে জিয়া মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের সামনে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এর উদ্বোধন করা হয়েছিলো ১৯৯৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। হেফাজত এর বিরুদ্ধে কিছু বলে না কেন বা কোন কর্মসূচি দেয় না কেন? তখন তো দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য নির্মাণের কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির মুসলিমপাড়া চৌরাস্তার মোড়ে জেনারেল জিয়ার আরেকটি ভাষ্কর্য রয়েছে। সেটি নির্মাণ করান ২০০১-০৫ সময়ে বিএনপির এমপি আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া। হেফাজত এর বিরুদ্ধেও কিছু বলে না বা করে না।

২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পূর্ণাঙ্গ ভাষ্কর্য দেশের বেশ কয়েকেটি স্থানে নির্মিত হয়েছে। গোপালগঞ্জ সরকারী বঙ্গবন্ধু কলেজের একাডেমিক ভবনের সামনে এরকম একটি ভাষ্কর্য প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১০ সালের ১৭ মার্চ। ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ বরিশাল প্রেস ক্লাব চত্বরে বঙ্গবন্ধুর ১০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন ভাষ্কর্য উদ্বোধন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেরণায় রাঙামাটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য নির্মাণ করেছে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন করেন। 

বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য রয়েছে এমন আরও এলাকাগুলোর মধ্যে আছে: নারায়ণগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও গাজিপুর সাফারি পার্ক। রংপুর ও নরসিংদীতে বঙ্গবন্ধুর আরও দুটি ভাষ্কর্য নির্মাণের কাজ এখন চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের আবক্ষ ভাষ্কর্য রয়েছে ঢাকায় বাংলা একাডেমি চত্বরে। ২০০২ সালে বিএনপি যখন সরকারে অধিষ্ঠিত, তখন এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ‘ইসলাম বিরোধী‘ অভিহিত করে হেফাজত এর বিরুদ্ধেও তো কিছু বলে না। কেন?

এবারে দেশে যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন চলছে, তখন তাঁর একটি ভাষ্কর্য স্থাপন করা নিয়ে হঠাৎ হেফাজতের ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাবের পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বললে তা খন্ডাতে হেফাজতের বলার কি আছে? এক দশক আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে কখনও সে বিষয়ে কিছু না বলে এবারেই কেন হেফাজত এ নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছিলো? 

বাংলাদেশে ইসলাম বিরোধী কতো কান্ড ঘটে চলেছে। নানা দফতরে-কাচারীতে বেপরোয়া ঘুষ এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। ছটাকী দুর্নীতি থেকে আশি তোলার দুর্নীতি- কোনটিরই সীমা-পরিসীমা নেই। নারী নির্যাতন গা সওয়া হয়ে গেলো। শিশুশ্রম সমাজ-কাঠামোর স্তম্ভে পরিণত। ক্ষমতা করায়ত্ত দুর্বৃত্ত চক্রের। শুধুমাত্র পেটের খিদে মেটাতে ইজ্জত বিক্রি হচ্ছে লাল-নীল বাতির বীভৎস শহর-গঞ্জের সীমানার ভেতরেই। ক্রমবর্ধমান সামাজিক অসহিষণুতা ঘুণপোকার মতো ফাঁপা করে দিচ্ছে সমাজ কাঠামো। চিকিৎসা-শিক্ষা-পরিবহনে বেহিসেবী ভোগান্তি মানুষের আত্মা বিলীন করে দিচ্ছে। পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে বলে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ।  

আমরা এখন এক গভীর খাদের কিনারায়।

মানুষের পাশে দাঁড়াবার, তার হাতে হাত রেখে ভরসা দেবার কোন শিক্ষা কি ইসলামে নেই? অনাচার-কদাকার বীভৎসতা রোধে মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলার শিক্ষা প্রচারে ইসলাম কি আমাদের উদ্বুদ্ধ করে না? ইসলাম কি সমাজ-পরিবারে সুন্দর - আনন্দের কথা বলে না? অনাচার ঠেকাতে সামাজিক আন্দোলন, সমাজ-সংস্কারের কথা কি ইসলাম বলে না?

ইসলাম কি কেবলই রাজনৈতিক? কেবলই হুঙ্কার? কেবলই প্রতিপক্ষকে টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেয়ার হাতিয়ার? কেবলই ক্ষমতার পূজারী? ইসলাম কি মানুষের নয়? মানুষের জন্যে নয়? ইসলাম কি মওসুমি? সার্বজনীন নয়?

হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। যদি তাই হয়, তাহলে ইসলামের সুন্দর-শুদ্ধ বাণীর প্রচার ও তার আলোকে মানুষের আত্মিক উন্নয়নের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার দায়িত্ব তাদের রয়েছে। মানুষের মনুষ্যত্বের শক্তি তারা জাগিয়ে তুলতে পারেন। এই জাগরণকে কাজে লাগিয়ে সমাজের সার্বিক মঙ্গলের অভিযাত্রায় নিজেদের শক্তি ও কাঠামো তারা কাজে লাগাতে পারেন। এই শক্তি ও সংগঠন তাদের রয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা-তারা ব্যাকফুটেই থাকবেন, নাকি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে সমাজ-জাগরণে ভূমিকা রেখে সামনে এগিয়ে যাবেন। 


*মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তারঃ সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, বিশেষ কন্ট্রিবিউটর, সাপ্তাহিক জনমত এবং জনমত ডটকম*

লন্ডন ২ ডিসেম্বর ২০২০


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর