প্রকাশিত :  ২০:৫৪, ০৭ জানুয়ারী ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ২১:২০, ০৭ জানুয়ারী ২০২১

ব্রিটেন: ভয়ংকর শীতকাল

ব্রিটেন: ভয়ংকর শীতকাল

দৈনিক মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়ালো
৩১ জানুয়ারীর মধ্যেই মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে 
এপ্রিল পর্যন্ত থাকতে পারে লকডাউন 
কোভিড রোগীদের চাপ মোকাবেলায় হিমসিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো 
১৯ জানুয়ারীর মধ্যেই রোগী ধারণ ক্ষমতা ফুরিয়ে যাবে লন্ডনের হাসপাতালগুলোর

জনমত রিপোর্টঃ করোনাভাইরাসের মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে পর্যদস্তু গোটা যুক্তরাজ্য। এবারের উইন্টার হয়ে ওঠেছে ভয়ংকর। শীতের মওসুমের শুরুতেই নতুন স্ট্রেইন বা বৈশিষ্ট্যের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। শীতকাল শুরু হলো মাত্র, সামনের দিনগুলো যে কত ভয়ংকর হতে পারে, সেটা এখনই টের পাওয়া যাচ্ছে। দিন কয়েক আগেও দেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই করোনাকে পাত্তা দেয়নি, এখন তারা দেখছে এর ভয়াবহ ছোবলে কিভাবে নিজেদের পরিবার পরিজন আজ ধুকছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটিতে এখন চলছে শোকের মাতম। কমিউনিটির বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ। যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তারা লড়ছেন ভাইরাসের বিরুদ্ধে, আর যারা আক্রান্ত হননি, তারা যুজছেন আতংকের সাথে। সোমবার থেকে সারা দেশে লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। বুধবার এটি আইনে পরিণত হওয়ায়, বিধিনিষেধ ভাংলে জরিমানা গুনতে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এপিডেমিওলোজিষ্ট অর্থাৎ মহামারীবিদগণ বলেছেন, করোনাভাইরাস বিধিনিষেধগুলো আগামী শীতকালেও জারি করা হতে পারে।

সরকারী হিসাব অনুযায়ি বৃহস্পতিবার এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে প্রায় ৭৭ হাজার ৫ শ’য়েরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছেন। বুধবার ৬ জানুয়ারী পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ১০৪১ জন। বিশেষজ্ঞদের ধারনা, মৃত্যুর এই হার ৩১শে জানুয়ারির মধ্যেই ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ জানুয়ারী মাসের বাকী দিনগুলোতে গড়ে প্রতিদিন এক হাজারের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। শীতকালের মধ্যে ঢুকতে না ঢুকতেই পরিস্থিতির এমন ভয়ংকর অবনতিতে জনসাধারণই শুধু আতংকিত নয়, খোদ সরকার ও রাজনীতিকরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সরকারের দোদল্যমানতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অহেতুক কালক্ষেপনে পরিস্থিতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার, সকালে) ইউকেতে টেস্ট পজিটিভ হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা ২ মিলিয়ন ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮০১ জনে উন্নীত হয়েছে। পরীক্ষা করেননি, কিংবা করাতে চাচ্ছেন না এমন লক্ষ লক্ষ মানুষও লড়ছেন ভাইরাসের সাথে। এই মূহুর্তে হাসপাতালে আছেন ৩০ হাজার ৪৫১ জন, প্রতিদিন গড়ে ১,৭০৫ জন লোককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে।


রোগীদের এই চাপ সামাল দিতে বৃটেনের হাসপাতালগুলো এখন হিমসিম খাচ্ছে। ৭ জানুয়ারী দ্যা টাইমস অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বেড স্বল্পতার কারণে রোগীদেরকে কেয়ার ও নার্সিং হোমগুলোতে স্থানান্তর করতে চাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

বৃহস্পতিবার সকালে এনএইচএস এর লন্ডন প্রধান নির্বাহী ক্রিস হপসন বলেছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই লন্ডনের হাসপাতালগুলোর বেড ফুরিয়ে যাবে। এটি সত্যিই দ্রুত ঘটে চলছে। গত এক সপ্তাহে আমরা ৫০০০ নতুন কোডিভ রোগী পেয়েছি, যা ১০টি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের সমুদয় ধারণ ক্ষমতার সমতূল্য এবং এটি মাত্র ৭ দিনের হিসাব। অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছি আমরা।

বিবিসি রেডিও ফোর এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানকে তিনি বলেন, আমরা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি, যেখানে হাসপাতগুলোর শয্যা পূর্ণ, কমিউনিটি শয্যাগুলো পূর্ণ এবং হোম সার্ভিসগুলো রোগীতে পরিপূর্ণ।

তিনি বলেন, এনএইচএস ট্রাস্ট এর নেতৃবৃন্দ যতুটুক চেষ্ঠা করার করে যাচ্ছেন, তারা জানেন যে কেয়ার এন্ড নার্সিং হোম সেক্টরে কিছু ধারণ ক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোকে ব্যবহারের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে তারা এখন আলোচনার মাঝামাঝিতে রয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের যা কিছু করার আছে, তা আমরা করে যাচ্ছি।

হেলথ সার্ভিস জার্নালে প্রকাশিত অফিসিয়াল ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, করোনার রোগীদের চাপে আগামী দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে লন্ডনের সকল হাসপাতালের শয্যা বা বেড পূর্ণ হয়ে যাবে। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার যদি ধীর গতি হিসেবে ৪ শতাংশও ধরা হয়, তারপরও ১৯ জানুয়ারীর মধ্যে ২০০০ বেডের স্বল্পতা দেখা দেবে।

এনএইচএস ইংল্যান্ড এর লন্ডন মেডিক্যাল ডিরেক্টর ভিন দিবাকর এই ব্রিফ্রিং দিয়েছেন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ি ৫ জানুয়ারী জেনারেল এন্ড এক্যুইট বেড এর চাহিদার প্রবৃদ্ধি ছিলো ৩.৫ পার সেন্ট এবং আইসিইউ (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট) বেডের চাহিদা ছিলো ৪.৫ শতাংশ। 

“কোভিড পেশেন্টদের মাত্রাতিরিক্ত চাপে লন্ডনের হাসপাতালগুলো এখন সত্যিকার অর্থেই হিমসিম খাচ্ছে” বলেছেন ডা. দিবাকর। “এ কারণে আমাদেরকে শত শত ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং লন্ডন নাইটেঙ্গেল শিগগিরই ব্যবহার করার বিষয়টি সক্রিয় প্রক্রিয়াধিন রয়েছে।

পূর্ব লন্ডনে অবস্থিত রয়েল লন্ডন হাসপাতালের ডাক্তার প্রফেসর রুপার্ট পেয়ার্স বলেছেন, ডাক্তাররা এখন করোনা মহামারীর প্রথম ধাক্কার চেয়েও অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতি  মোকাবেলা করছেন। তিনিও বলেছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। “আমার গোটা কর্মজীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হবো - এমনটা কল্পনাও করিনি। যদি আমরা লকডাউনকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে না নেই, তাহলে  সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এবং আমি এই কথাটি অবশ্যই হালকাভাবে বলছি না। 


লকডাউন থাকতে পারে এপ্রিল পর্যন্ত

প্রধান মন্ত্রী বরিস জনসন কঠোর লকডাউন বিধিনিষেধ আগামী এপ্রিল পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বুধবার তিনি বলেন, বিধিনিষেধগুলো একটি একটি করে শিথিল করা হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারীতে রিভিউ করার পর সবকিছু হুট করেই শিথিল হয়ে যাবে - এমনটা না ভাবতে তিনি জনসাধারণকে অনুরোধ করেছেন।

বুধবার হাউজ অব কমন্সে লকডাউন বিধিনিষেধ ৫২৪ ভোটে অনুমোদন লাভ করে। এর বিপক্ষে ভোট পড়ে মাত্র ১৬টি, যাদের মধ্যে কনজারভেটিভ পার্টির কয়েকজন সিনিয়র এমপি রয়েছেন।

এমন এক সময় এই আইনটি পার্লামেন্টে অনুমোদন পেলো যেদিন ১ হাজারেরও বেশি লোকের মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হলো। গত ৭ দিনে প্রায় ৫ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। বুধবার একদিনে ৬২,৩২২ জনের কোভিড পজিটিভ হয়েছে, যা নিয়ে এক সপ্তাহে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাড়িয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৯১৪ জনে। পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় যা ৪৩ শতাংশ বেশি।

সোমবার রাতে তৃতীয় দফা লকডাউন জারি করেন প্রধান মন্ত্রী, যা বুধবার ৬ জানুয়ারী রাতে আইনে পরিণত হয়। এমপিরা এটি পাশ করার আগে এর ওপর বিতর্কে অংশ নেন। বিধিনিষেধগুলো ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে, তবে নিয়মিতই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে।

আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য কাউন্সিল নির্বাচন পিছিয়ের দেয়ার বিষয়টি এখনো ভাবছেন না।

হোম সেক্রেটারী বলেছেন, তিনি এটা স্বীকার করেন যে লকডাউনের কারণে লোকজনের চলাফেরার স্বাধীনতাকে খর্ব করছে, কিন্তু এটা প্রত্যেকেরই বোঝা উচিত যে মহামারী আমাদের কাছ থেকে অনেক ধরনের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে।

কনজারভেটিভ পার্টির সিনিয়র এমপিরা লকডাউনের সময় সীমা মধ্য-ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত এগিয়ে আনার দাবি জানান।

আগামী সপ্তাহ থেকে ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যাপারে নিয়মিত তথ্য জানানোর অঙ্গিকার করেছেন প্রধান মন্ত্রী। বুধবার রাতে এমপিরা ভ্যাকসিন ব্রিফিংয়ে যেন রিজিওনাল ব্রেকডাউন অর্থাৎ কোন অঞ্চলে কতটি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে, তার হিসাব দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। (M.R)


Leave Your Comments


যুক্তরাজ্য এর আরও খবর