প্রকাশিত :  ২৩:৫৫, ১৩ জানুয়ারী ২০২১

একজন কীর্তিমান আবেদ স্যারের কথা

ম. আমিনুল হক চুন্নু

একজন কীর্তিমান আবেদ স্যারের কথা

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মানুষের সত্তায় দ্বৈধ আছে’। তার যে সত্তা জীব সীমার মধ্যে সেখানে যেটুকু আবশ্যক সেই টুকুতেই তার সুখ। কিন্তু অন্তরে অন্তরে জীবমানব বিশ^মানবে প্রসারিত; সেই দিকে সে সুখ চায় না, সে সুখের বেশি চায়, সে তোমাকে চায়। তাই সকল জীবের চেয়ে মানুষই কেবল অমিতাচারী। তাকে পেতে হবে অমিত, তাকে দিতে হবে অমিত, কেননা তার মধ্যে অমিত মানব। সেই অমিত মানব সুখের কাঙ্গাল নয়, দুঃখভীরু নয়। সেই অমিত মানব আরামের দ্বার ভেঙ্গে কেবলই মানুষকে বের করে নিয়ে চলেছে কঠোর অধ্যবসায়ে। আমাদের ভিতরকার ছোটো মানুষটি তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করে থাকে; বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, উপায় নেই। বিশে^র মানুষটি ঘরের মানুষ কে পাঠিয়ে দেন বনো মানুষটাকে দাবীয়ে রাখতে, এমন কি, ঘরের খাওয়া যথেষ্ট না জুটলেও।” আমাদের এই ভূখন্ডের মানব উন্নয়নের এরকম অমিত মানবের দেখা মিলেছে খুবই কম। তাই হয়তো আমাদের সমাজ আজও রুগ্ন দশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এই ভূখন্ডের সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি ক্রমে দারিদ্র বিমোচন, আর্থিক ক্ষমতায়ন, মানবসক্ষতা ও মানব মর্যাদা প্রতিষ্টার সব উপাদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য অধিকার ও আর্থিক উন্নয়নের চিন্তা, সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় নিয়ে কিছু কিছু সমাজকর্মী তাদের বিরাট স্বপ্ন, মহান কল্পনা, অবিচল আদর্শ নিষ্টা ও কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজ করে গেছেন, যা জনমনে বড়ভাবেই ছাপ ফেলেছে। এই বিরল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন জগতের পথ প্রদর্শক, যিনি বটবৃক্ষের মতো একজন অভিভাবকও হয়ে উঠেছিলেন, তিনি হলেন, “বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিষ্ট্যান্স কমিটি (ব্র্যাক) ও বিশে^র সবচেয়ে বড় এনজিওর প্রতিষ্টাতা এবং ইমেরিটাস চেয়ার স্যার ফজলে হাসান আবেদ। নিজের প্রতিষ্টিত এনজিওর মাধ্যমে সারাবিশে^ তিনি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধবিধস্ত দেশের তৃনমূল মানুষের সেবা করতে গিয়ে ব্র্যাক প্রতিষ্টা করে ছিলেন তিনি। মাত্র এক লাখ কর্মী নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর ১২ টি দেশের ১২০ মিলিয়ন মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে চলেছে ব্র্যাক। বাংলাদেশের আজকের অগ্রযাত্রা ও সাফল্যে এখন স্যার আবেদের নাম নিতে হয় সব ক্ষেত্রে, সব সময়। তিনি যে চিরকাল থাকবেন না। সে উপলদ্ধি থেকে গুছিয়ে দিয়ে গেছেন প্রতিষ্ঠানটিকে ঠিক করে গেছেন উত্তরাধিকার। ব্র্যাকের সে তাই তিনিও বেঁচে থাকবেন এসব কাজের মধ্য দিয়ে।


স্যার ফজলে হাসান আবেদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল, হবিগঞ্জ জেলার বানিংয়াচং গ্রামে। বাবা সিদ্দিক হাসান- ছিলেন ভুস্বামী, মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন। পূর্ব পুরুষ ছিলেন ওই অঞ্চলের জমিদার। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। দেশভাগের ঠিক আগে বাবা অসুস্থ হলে গ্রামের বাড়ী থেকে চলে এসে ভর্তি হন চাচার কর্মস্থলে, কুমিল্লা জিলা স্কুলে। সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত সেখানেই লেখাপড়া করেন। পরে চাচা জেলা জজ হিসেবে পাবনায় বদলি হলে তিনিও তার সঙ্গে চলে যান এবং পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হন। পাবনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক দিয়ে তিনি ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ^বিদ্যালয়ে নৌ স্থাপত্যে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে সেটা বাদ দিয়ে লন্ডনের চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে ফজলে হাসান আবেদের মায়ের মৃত্যু হয়। ১৯৬২ সালে তিনি তার পেশাগত কোর্স সম্পন্ন করেন। পরে তিনি লন্ডনে চাকরিতে যোগদান করেন। কিছুদিন চাকরি করার পর চলে যান কানাডা। সেখানে ও একটি চাকরিতে যোগ দেন। পরে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে এসে শেল ওয়েল কোম্পানীর হেড অড ফাইন্যান্স পদে যোগ দেন। এ প্রতিষ্টানে কাজ করার সময়ই ১৯৭০ সালে বন্ধুদের সঙ্গে “হেল্প” নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে ঘূর্নিঝড় উপদ্রুত চট্রগ্রাম জেলার মনপুরা দ্বীপের অধিবাসিদের পাশে গিয়ে দাড়ান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধ শুরু হলে ফজলে হাসান আবেদ ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে আত্মনিয়োগ করেন যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযোদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়, তহবিল সংগ্রহ ও জনমত গঠনের কাজে এবং ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭১ সালে লন্ডনে সমমনা বন্ধুদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধে সহায়তার জন্য “অ্যাকশন বাংলাদেশ” ও হেল্প বাংলাদেশ নামে দুইটি সংগঠন গড়ে তোলেন। তারপর সহযোদ্ধাদের আরও কয়েকজনকে নিয়ে ব্রিটিশ এমপিদের সঙ্গে দেখা করা সহ বিশ^ জনমত গঠনের লক্ষ্যে লন্ডন থেকে প্যারিস, তারপর জাতিসংঘ পর্যন্ত বিরামহীন প্রচারনা অব্যাহত রাখলেন। তারা অস্থায়ী সরকারের তহবিলে অনুদান ব্যবহার দেওয়া ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য অনেকগুলো দূরবিন এবং অসন্ন শীত মৌসুমের মোকাবেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাপড়ের ব্যবস্থা করলেন। আর্থিক সংগ্রহের এক স্মৃতিচারন জনাব আবেদ বলেছিলেন, শুধু প্রবাসী বান্ডেলী সমাজ নয়, একজন বৃটিশ মহিলা এক পাউন্ডের একটি নোট পাঠিয়ে লিখেছেন, “আগামী দুই মাস আমি আর ডিম খাব না। আমি তোমাদেরকে দিলাম আমার ডিম কেনার পয়সাটা।” এভাবে অনেক অর্থ এসেছিল তাদের কাছে। যারা তাঁকে অর্থ সংগ্রহে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। তারা হলেন ব্যারিষ্টার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আইয়ুব আলী মাস্টার, নূরুল ইসলাম (প্রসাসী কথা গ্রন্থের লেখক), চানু মিয়া, মোঃ মখলিছ মিয়া (লেখকের বাবা), তসদ্দুক আহমেদ, রাজিয়া বেগম, মোঃ আব্দল কাদির (মুক্তার মিয়া), মোঃ মিরাজুল হক ও আব্দুর কাদির। অতএব ৯ মাসের রক্তাক্ত যুদ্ধের অবসান ঘটল ১৬ ডিসেম্বর ১৯১৭। ১৭ জানুয়ারি দেশে ফিরলেন স্যার আবেদ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পূনর্গঠনের ইচ্ছা নিয়ে কাজে যোগ দিলেন। জনকল্যানমূলক কাজ সমাধান করে সৃষ্টি করেছেন এক যুগান্তকারী ইতিহাস, সময়ের সীমা অতিক্রম করে দেশে বিদেশে জ্যোতি ছড়িয়ে নিরস্বার্থ অবদান। তাছাড়া তাঁর যে চিন্তাভাবনা ও কাজের উচ্চতা; সেটার সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেখি না।