প্রকাশিত :  ০০:০৪, ১৪ জানুয়ারী ২০২১

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঃ ৭ দশক ধরে ইতিহাসের পথ ধরে দৃপ্ত পথচলা

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঃ ৭ দশক ধরে ইতিহাসের পথ ধরে দৃপ্ত পথচলা

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে তার সুনাম অক্ষুন্ন রেখে দীর্ঘ ৭৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করা হলো গত ৪ঠা  জানুয়ারী। এই ৭৩ বছর পাড়ি দিতে গিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের উপর হয়েছে অনেক অত্যাচার নির্য্যাতন, খাটতে হয়েছে জেল হাজত, দিতে হয়েছে অনেক রক্ত। বাংলাদেশের একমাত্র এই সংগঠনটি তারপরেও দমে যায়নি, তারা এগিয়ে চলেছে। চলতে চলতে ৭৩টি বছর গৌরবের সাথে পাড়ি দিলো। ছাত্রলীগের এই ৭৩ বছরের পথ চলার ইতিহাস সংক্ষিপ্ত ভাবে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেক ছাত্রলীগ কর্মী আছেন যাদের এই সংগঠনের অতীত ইতিহাস জানা নেই, যার ফলে অনেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের খপ্পরে পড়ে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছেন। তাদের উদ্দেশ্যেই কিছু তথ্য তুলে ধরা উচিৎ বলে আমি মনে করি। 

আজ থেকে ৭৩ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের এ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্র লীগের প্রতিণ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এর নাম ছিলো পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিভিন্ন  সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিকার সংক্রান্ত আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, শিক্ষার অধিকার, বাঙালীর স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলন। প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক ছিলেন নাঈম উদ্দিন আহমেদ এবং পরবর্তীতে সভাপতি মনোনীত হন দবিরুল ইসলাম। ছাত্রলীগের প্রতিষ্টাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খালেক নেওয়াজ খান। 

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম মাতৃভাষা বাংলার জন্য সংগ্রাম করেছিলো। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ছাত্রলীগ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সর্বকনিষ্ট মন্ত্রী ছিলেন, যাতে ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর ভ্যানগার্ড ছিলো। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ভূমিকাও ছিলো অনন্য। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি দিয়েছিলেন , যা ছিলো বাঙালী জাতীর মুক্তির সনদ। এর প্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হয়। 

১৯৬৯ সালে ঐহিতাসিক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে বাংলার ছাত্র সমাজ সারাদেশে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বাংলার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুুজিবুর রহমানকে “বঙ্গন্ধু” উপাধি দেন, যা ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিকে ত্বরান্বিত করে। 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, তোফায়েল আহমেদ সহ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলা, উপজেলায়, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্য্যায়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা স্বাাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। 

বর্তমান সময়ে ছাত্রলীগের বিভিন্ন কার্য্যকলাপে তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন দল এমন কি স্বাধীনতা বিরোধীদের একটি চক্রান্তকারী দল এসে ঢুকে পড়েছে বর্তমান ছাত্রলীগের মধ্যে। আমার মতে, এর জন্য দায়ী ছাত্র লীগের বর্তমান নেতা এবং কর্মীরাই। তার কারণ হচ্ছে, স্বজনপ্রীতি, টাকার লোভ এবং নিজের বাহুবল বাড়ানোর জন্য এ ধরণের লোককে ছাত্রলীগে স্থান দেয়া হয়েছে। এদেরকে যদি দল থেকে ছাটাই করার ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে ছাত্রলীগের অতীত গৌরবের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুন্ন হবে তেমনি জনগণের কাছেও হেয় প্রতিপন্ন হতে হবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগকে এই দুর্নাম থেকে রক্ষা করা এবং সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রতি নতুন কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তিনি ছাত্রলীগকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য কিন্তু যদি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগের কমিটিতে যারা আছেন, তারা যদি স্বজনপ্রীতি, নিজের বাহুবল শক্ত করা এবং টাকার লোভের  উর্ধে না উঠতে না পারেন তাহলে ছাত্রলীগের দূর্নাম ঘুচানো সম্ভব হবেনা। সুতরাং ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের অতীতের সুনাম রক্ষা করার ব্যাপারে সকল নেতাকর্মীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দরকার। 

এবার আসা যাক ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠা উদযাপনের কথায়। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবার খুবই উৎসাহের সাথে পালিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। যদিও করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর থাবার কারণে কেউ জড়ো হয়ে একত্রে বসে আনন্দের সাথে এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করতে পারেননি। প্রত্যেকেই অনলাইনে ভার্চুয়্যাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানটি করেছেন। এর মধ্যে ওয়েলসও পিছিয়ে নেই। 


কার্ডিফের বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ মনসুর আহমদ মকিস এবং সাবেক ছাত্রনেতা খায়রুল আলম লিংকন এর উদ্যোগে  উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৭৩তম বার্ষিকী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে “ছাত্রলীগের গৌরবের একালÑ সেকাল: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শিরোনামে গত ৪ঠা জানুয়ারী জনপ্রিয় অনলাইন চ্যানেল ইউকে বিডি টিভিতে বাংলদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো  এক ভার্চুয়াল আন্তর্জাতিক সেমিনার, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অংশ গ্রহনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই ভার্চুয়াল মিলন মেলায় তারা একে অন্যের সাথে প্রথমে পরিচিত হন ও পরে প্রাণ খুলে অতীতের স্মৃতিচারন মূলক  কথাবার্তা হয় প্রায় ২৫/৩০ বছর পর।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা সহ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনÑ সংগ্রামে নিহত সকল শহীদানদের ও মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবার জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করে দোয়া ও যার যার ধমীয় মোতাবেক প্রার্থনা করা হয়। 

৬০ এর দশকের কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা ও কেন্দ্রীয়  আওয়ামী যুবলীগের প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম সদস্য যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউকে বিডি টিভি’র সম্ম্নিত উপদেষ্টা প্রবাসের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা সুলতান মাহমুদ শরীফ এর সভাপতিত্বে  এবং ওয়েলস ছাত্রলীগের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইউকে ওয়েলস আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সভাপতি, ইউকে বিডি টিভি’র চেয়ারম্যান বিশিষ্ট সাংবাদিক মকিস মনসুর এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ভার্চুয়্যাল অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা আহমদ হোসেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি মো: শাখাওয়াত হোসেন শফিক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ৯০ এর গণ আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এমপি, ডাকসুর সাবেক পরিবহন সম্পাদক কেন্দ্রীয় ছাত্র নেতা নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড: এম অহিদুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেটর একুশে পদকে ভূষিত যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ড. নুরুন্নবী, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম, যাক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নঈম উদ্দিন রিয়াজ, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল আহাদ চৌধুরী, ৭৫ পরবর্তী সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ডা: ফয়জুল ইসলাম সহ যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশের প্রাক্তন ছাত্রলীগের নেতা এবং কর্মীবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। 

এই ভার্চুয়্যাল মিলন মেলার আয়োজন করায় বক্তারা ইউকে বিডি অনলাইন টিভির চেয়ারম্যান ৯০ এর গণআন্দোলনের রাজপথের সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা মোহাম্মদ মকিস মনসুর, টিভি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাবেক ছাত্রনেতা খায়রুল আলম লিংকন, টিভি’র ভাইস  চেয়ারম্যান শেখ নুরুল ইসলাম ও টিভি’র উপস্থাপিকা হেলেন ইসলাম সহ ইউকে বিডি অনলাইন টিভির সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আগামী দিনেও এ ধরণের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। 

সব শেষে ঐহিত্যবাহী ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি সংগ্রামী শুভেচ্ছা। ছাত্রলীগের একজন প্রাক্তন কর্মী হিসেবে ছাত্রলীগের কর্মীদের সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সামনের দিকে আরও এগিয়ে যেতে কবি নজরুল ইসলামের কবিতার ভাষায় আহ্বান জানাবো   - 

চল চল চল 

চল চল চল

উর্ধ গগনে বাজে মাদল 

নি¤েœ উতলা ধরণী তল 

অরুন প্রাতের তরুন দল 

চলরে চলরে চল

উষার দুয়ারে হানি আঘাত 

আমরা আনিব রাঙ্গা প্রভাত

আমরা টুটাবো তিমির রাত 

বাধার বিন্ধ্যাচল

চলরে চলরে চল। 


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর