প্রকাশিত :  ০০:১২, ১৪ জানুয়ারী ২০২১

শত বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শত বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

|| মোঃ চন্দন মিয়া ||

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই একাডেমিক যাত্রা শুরু করে। পূর্ব বঙ্গে প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পূর্ব বঙ্গের রেনেসাঁ বললে আমার মনে হয় অত্যুক্তি হবে না, কারণ ১৮৫৭সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে নীরদ চন্দ্র চৌধুরী তাঁর “বাঙালি জীবনে রমণী” গ্রন্থে বাঙালির  জীবনে রেনেসাঁ বলে উল্লেখ করেছেন। ঔপনিবেশিক আমলে জনশ্রুতি ছিল ইংরেজরা দেশ পরিচালনায় ইংরেজ জানা লোকের  প্রয়োজন বিধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, একই গ্রন্থে  তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে নির্জলা মিথ্যা কথা ইতিহাসে বিরল।’ পঞ্চাশের দশকে তাঁর “The autobiography of an unknown indian”  বইটি লেখার কারণে ইংরেজ মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছেন, আবার অত্যধিক ইংরেজ প্রীতির কারণে ভারতীয় মহলে তাঁর সমালোচনাও রয়েছে । শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ ইংরেজদের স্বতঃপ্রণোদিত উদারতা, না কী ঔপনিবেশিক শাসন ঠিকেয়ে রাখার জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা ইতিহাসের বিচার্য বিষয় । ১৯০৫ সালে সমগ্র বেঙ্গল থেকে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম নিয়ে  এক প্রভিন্স করে  বঙ্গ ভঙ্গ হলে কলিকাতার হিন্দু এলিট শ্রেণী ও কংগ্রেসের অনেক নেতৃবৃন্দ তা’র বিরোধিতা করেন। তাদের আন্দোলনের মুখে বৃটিশ সরকার বঙ্গ ভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় । যার ফলে পূর্ব বঙ্গে অসন্তোষ ধানা বাধতে থাকে। সান্ত¡না পুরস্কার হিসাবে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করে। ১৯১২ সালে গভর্নর জেনারেল Charles Hardings ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু এলিট শ্রেণী তথা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Vice chancellor Sir আশুতোষ মুখার্জি সহ অনেকেই তাঁর  বিরোধীতা করেন। শুধু হিন্দু এলিটরা নয়, অনেক মূসলিম এলিটরাও বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তথা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাজেট কমে যাবে। তাছাড়া পূর্ব বঙ্গে উচ্চ শিক্ষার হার ছিল নিম্ন তাই সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোনো যুক্তি নেই বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেন। কথা সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক  কুলদা রায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা ও রবীন্দ্রনাথ’ নামক প্রবন্ধে বলেন- ““Diffrent people had diverse reasons for opposing the eastablishment of Dhaka University”.


বঙ্গ ভঙ্গ বিরোধী হিন্দু এলিট শ্রেণীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন একজন। পরবর্তীতে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন তাঁরা  বঙ্গভঙ্গেরও বিরোধী ছিলেন। তাই ধারনা করা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পষ্ট কোনো অভিমত জানা যায় নি। বাংলা সাহিত্যের একজন আই কন ও সর্ব মহলে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি  হিসাবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পষ্ট মন্তব্য পূর্ব বঙ্গের মানুষ প্রত্যাশা করেছিল।  মেজর জেনারেল এম এ মতিন তাঁর “আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ও কিছু তথ্য” গ্রন্থে উল্লে­খ করেন ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ গড়ের মাঠে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। উক্ত সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেন। নাতান কমিশন নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য যে কমিশন করা হয় উক্ত কমিশনের কাছে  প্রতিবাদ লিপি প্রেরন করা হয় উক্ত সভা থেকে। প্রফেসার রফিকুল ইসলাম তাঁর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বৎসর’ গ্রন্থে এই মতের বিরোধিতা করেন। তিনি মতামত ব্যক্ত করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব লেখায় স্থান,কাল ও তারিখ লেখা থাকে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐ সময় কুষ্টিয়ার শিলাইদাহে ছিলেন। তিনি ২৪শে মার্চ থেকে ১২ই এপ্রিল পর্যন্ত শিলাইদাহে ছিলেন।

কবি রবীন্দ্রনাথ ও মানবিক রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ রবীন্দ্রনাথও বটে। তৎকালীন হিন্দু এলিট শ্রেণীর বিরোধিতা এবং তাঁর শ্রেণীগত ও সামাজিক অবস্থান এসবের ঊর্ধ্বে থাকা তাঁর কঠিনই ছিল বলে আমার মনে হয়, তবে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। অনেক সময়  ব্যাক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বেও থেকেছেন, যেমন ১৯১৯ সালে জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ইংরেজদের দেয়া  নাইটহোড উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন।

নবাব সলিম উল্ল­াহর দেয়া ৬০০ একর জমির উপর উপর প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই দাড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত শত সংগ্রামের সূতীকাগার বলে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সূচনা হয়ছে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের। বিভিন্ন সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সূচীত হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। বহু ক্ষনজন্মা  পুরুষের পদচারণায় ধন্য, মিছিল আর মিটিংয়ে কম্পিত, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুখরিত, তরুণ তরুণীদের উল্ল­াসে পুলকিত সর্বদা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি। আমার যৌবনের সুন্দর সাতটি বৎসর অতিবাহিত করেছি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা আমার স্মৃতিতে চির জাগ্রত থাকবে চির কাল।


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর