প্রকাশিত :  ০০:২৫, ১৪ জানুয়ারী ২০২১

ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় পথচলা

ধ্বংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় পথচলা

১০ই জানুয়ারী বাংঙ্গালী জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। সোনায় মোড়ানো যে দেশটি দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী ধ্বংসযজ্ঞে মহাশ্বশানে পরিণত হয়েছিল, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর সেই বাংলার পূর্বাকাশে উদিত হল ভোরের সূর্য। রক্তে রঞ্জিত লাল- সবুজ ঘাস আর বিধ্বস্ত ধ্বংসযজ্ঞের চাদরে মুড়িয়ে থাকা প্রকৃতিও জেগে উঠল সেদিন। সেদিনের সে সকাল নিয়ে এসেছিল এক নতুনের বার্তা। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গি পাড়ার নির্জন পল্ল­ীতে জন্ম নেয়া হাজার বছরের বাঙ্গালীর লালিত স্বপ্নের স্বাধীনতার অনবদ্য কবিতার সফল রচয়িতা, ২৩ বছরের পাকিস্তানী নির্যাতন আর নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার বজ্রকন্ঠ, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে বিধ্বস্ত ধংশযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করেছিলেন বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

ক্ষণজন্মা এই সিংহ পুরুষটি সারাজীবন বাংলার মানুষের স্বাধিনতা এবং অধিকার আদায়ের জন্য জীবনের ৪৬৭৫ দিন জেলে কাঠিয়েছেন। অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও তিনি গনতান্ত্রিক সংগ্রামে নির্ভীক ছিলেন এবং কখনই আপোষ করেননি। দেশটির ২৩ বছরের ইতিহাসে কখনই তিনি নিজেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় প্রতিস্থাপন করেননি। বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাজনীতিকে সাধারন মানুষ তথা গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং তরুনদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দীপনাময় ও আবেগময় বক্তৃতা সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে উদ্দীপ্ত করত। ১৯৭২-এর এই দিনটিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিল। যদিও ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়। কিন্তু বাংলার মানুষ স্বাধীনতার আস্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ, যার নেতৃত্বে এই দেশ, তিনি তখন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি। তিনি যতক্ষণ ফিরে না এসেছেন, ততক্ষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় ১০ জানুয়ারি, যেদিন জাতির জনক স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলায় ফিরে এসেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলন নস্যাৎ করতে গভীর রাতে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ওই রাতেই তারা নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হামলা চালায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি হানাদাররা।

গ্রেপ্তারের পর তাকে স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে আসতে বলা হয়। তা না হলে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া তিনি কোনো কিছু মানবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের নির্জন-অন্ধকার কারাগারে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর বিচার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবরে জাতির জনকের ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খান সেই আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানকে অপসারণ করে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়।

 কারাগারের যে সেলে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছিল, সেই সেলের পাশে কবরও খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি ও প্রহসনের বিচার বন্ধ করতে প্রবল বিশ্ব জনমতের চাপের মুখে স্বৈরাচার পাকিস্তানি সরকার পিছু হটে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ, বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে।

 জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তান সরকার  সদ্যভূমিষ্ঠ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ৮ জানুয়ারী মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এবং পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরদিন ৯ জানুয়ারি লন্ডনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু একটি বিবৃতি প্রদান করেন। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলার মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছে তখন আমি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থন ও  সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এ দেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য অনুরোধ জানাবে।’ পরিশেষে তিনি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’ বিবৃতির শেষে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যে আপনার বাংলাদেশে ফিরে যাবেন সেই দেশ তো এখন ধ্বংসস্তুপ?’ তখন জাতির জনক উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার বাংলার মানুষ যদি থাকে, বাংলার মাটি যদি থাকে, একদিন এই ধ্বংসস্তুপ থেকেই আমি আমার বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করব।’

স্বাধীন বাঙ্গালী জাতীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিল্লি­ থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর কমেট বিমানটি ঢাকার আকাশসীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। দুপুর ১টা ৫১ মিনিটে ঢাকা বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতৃবৃন্দ, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ছুটে যান প্রাণের নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। লাখো জনতার মিছিলে জাতির জনককে মাল্যভূষিত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ, অভূতপূর্ব মুহূর্ত, যা আমার মানসপটে এখনও জ্বলজ্বল করে। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী, আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়ব জুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি। বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। চারদিক থেকে তার ওপর পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকে। বাংলাদেশ সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। মঞ্চ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও  প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু সালাম ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। 


মূলত ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা, ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা, তরুন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর  সরকারি নির্যাতন প্রভৃতি ঘটনা দ্রুত রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিকল্প কোনো রাজনৈতিক দল বা প্লাটফরম না থাকায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং বৈষম্য সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। ইতিহাসের প্রয়োজনে তখনই প্রগতিশীল মুসলিম লীগ কর্মীরা স্বতন্ত্রভাবে দল গঠন ও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ‘গণতান্ত্রিক কর্মীশিবির’ থেকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন দল গঠনের। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী লীগ। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫৪-এর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম  যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী এবং  শেখ মুজিবের আহ্বানে পূর্ব বাংলার মানুষ যুক্তফ্রন্ট কে বিজয়ী করে মুসলিম লীগের কবর রচনা করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।  

যুক্তফ্রন্টের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে শেরে বাংলা মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের ঐক্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্র, কৃষক-শ্রমিক পার্টির সংকীর্ণতা ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদের পা দেওয়া প্রভৃতি ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তফ্রন্ট কোয়ালিশনের অবসান ঘটে। ১৯৫৬-৫৭ দুই বছর পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের সরকার এবং কেন্দ্র্রেও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন এক বছর সরকার পরিচালনা করে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। ১৯৬২ থেকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্বে বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সমারোহ হন শেখ মুজিবুর রহমান। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন,  স্বাধিকার আন্দোলন, ৬-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালে সাধারন নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওামিলীগের নিরঙ্খুশ বিজয় এবং মুক্তিযুদ্ধের  ভেতর দিয়ে বাঙালির প্রথম জাতি-রাষ্ট্র স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বাঙালির অবিসংবাদী একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, তেমনি বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জননন্দিত সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অবদান বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। 

‘‘১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও তারা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। পাকিস্তানিদের এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রুখে দাঁড়ান। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রাম। বাঙালিদের উপর নেমে আসে অত্যাচার এবং নির্যাতন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬-দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পথ ধরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম এক যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয়।

বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফা ঘোষণার অপরাধে পাকিস্তান সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাঁকে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে কুর্মিটোলায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করে রাখে। শুরু হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কার্যক্রম। কিন্তু বাঙালিরা দমবার পাত্র নন। তাঁরা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে আনেন। সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের পতন হয়। আরেক সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছর পাকস্তানী শাসকদের নিপীড়ন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ  সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকস্তানী শাসকগোষ্ঠি গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা উল্টো বাঙালিদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন শুরু করে।

এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার ডাক দেন। সেদিনের জনসমুদ্রে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণই ছিল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা। 

এ ভাষণে বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর হত্যা-নিপীড়ন-নির্যাতনের চিত্র মূর্ত হয়ে উঠে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের আবশ্যকতা ও আকাক্সক্ষা ছিল এ ভাষণের মূল লক্ষ্য। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি বাঙালি জাতিকে নির্দেশ দেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্তপর্বে ৭ই মার্চের এই ভাষণ গোটা জাতিকে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে। 

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতীকে যুদ্ধের প্রস্তুুতি গ্রহন সহ সব ধরনের দিক নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন মুলত সেদিন থেকে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানী শাসকচক্র দ্বারা   বন্দী হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করা পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের)  সমস্ত  প্রশাসনিক কার্যক্রম তাঁর হুকুম মতই চলছিল।    

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের এই ভাষণের পর থেকেই পূর্ব বাংলার নিয়ন্ত্রণভার বাংলার মানুষের হাতে চলে যায়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে দেশ। কিছু সেনানিবাস ছাড়া দেশের অন্য কোথাও পাকিস্তানী শাসনের কোন নিদর্শন ছিল না। জাতির পিতার এই সম্মোহনী ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ২৫শে মার্চের কালরাতে অতর্কিতে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির উপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ঢাকাসহ দেশের শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে।

জাতির পিতা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কারাগারে তিনি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। সামরিক আদালতের বিচারে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।

জাতির পিতার একক নির্দেশে পরিচালিত ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত  বিজয় অর্জিত হয়। বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার এই ভাষণের দিক-নির্দেশনাই ছিল সে সময়ের বজ্রকঠিন  জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র।

৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর অনন্য বাগ্মিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাঙালি জাতির আবেগ, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে  একসূত্রে গ্রথিত করেন। বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার ৭ই মার্চের ভাষণে দিক-নির্দেশনাই ছিল সে সময়ের বজ্রকঠিন জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র যার আবেদন আজও অম্ল­ান। প্রতিনিয়ত এ ভাষণ তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে এবং অনাদিকাল ধরে অনুপ্রাণিত করে যেতে থাকবে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ। এ ভাষণ বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে। লেখক ও ইতিহাসবিদ ঔধপড়ন ঋ. ঋরবষফ-এর আড়াই হাজার বছরের গণজাগরণ ও উদ্দীপনামূলক বিশ্বসেরা ভাষণ নিয়ে লেখা `We shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে। বিশ্বের ১২টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ইউনেস্কোর বিশ্ব আন্তর্জাতিক রেজিস্টার স্মারকে অন্তর্ভূক্তি এই ধারাবাহিকতায় আরেকটি মাইলফলক।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  দুটি স্বপ্ন ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, এবং বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। আমাদেরকে তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তার প্রথম স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি স্বপ্ন যখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছিলেন, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বুলেটের আঘাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়। 

জাতির জনক হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা, বাংলার গন মানুষের অবিসংবাদিত নেত্রী, সমসাময়িক বিশ্ব নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা অর্জনকারী, আধুনিক উন্নত, সমৃদ্ধ ও ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল রুপকার, ভিশন২০২১ এবং ভিশন২০৪১ এর স্বপ্নদ্রষ্টা, তিন তিন বারের নির্বাচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ব বরেণ্য নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধিনতা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদাণকারী সংগঠন বাংলাদেশের আওয়ামীলীগের পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আজকে  তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রতিপক্ষের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক আজ ইতিবাচক অগ্রগতির দিকে ধাবমান।  

১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাদেরকে স্থান করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মানবতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা আজ সারা বিশ্বে বিরল। 

তাঁর দুঃসাহসী নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা ব্রিজের কাজ প্রায় সম্পন্নের পথে, কর্ণফুলী নদীর নিচে নির্মাণাধীন ৩.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ দক্ষিন এশিয়া প্রথম এবং বৃহত্তম টানেল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ এর কাজ দ্রুত বেগে এগিয়ে চলছে। মহামারি ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নতুন রূপে প্রতিস্থাপিত করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর আজও বাংলাদেশে উগ্রবাদী, দেশবিরোধীচক্র প্রতিনিয়ত তাদের অশুভ পাঁয়তারায় লিপ্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে উন্নয়নকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস  চালিয়ে যাচ্ছে। গত একযুগ ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মাস্টারপ্লান করে দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে দ্বার করাতে সামর্থ্য হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যার অদম্য প্রচেষ্টায় উন্নয়নে মহাসড়কে যুক্ত হওয়া অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা কোন অশুভ শক্তিই থামাতে পারেনি। মুজিব বর্ষে ৯ লাখ গৃহহীন পরিবারকে নতুন ঘর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। ৯৯৯ নম্বরে কল করে ২ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ সেবা পেয়েছেন, ৩৩৩ নম্বরে কল করে স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন ২০ লাখ মানুষ। 

বিশ্বের বরেণ্য অর্থনীতিবিদ সহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে  বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশ থেকে থেকে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের রফতানি, রিজার্ভ, রেমিটেন্স, বিদ্যুৎ উৎপাদন পাকিস্তান থেকে বেশি। আবার সামাজিক খাতে আমাদের গড় আয়ু ভারত-পাকিস্তান থেকে বেশি। মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, জন্মহার ভারত-পাকিস্তান থেকে কম। নারীর ক্ষমতায়নেও আমরা এগিয়ে। এসবই সম্ভবপর হয়েছে আজকের প্রধানমন্ত্রী, মানবতার মা জননেত্রী  শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে যা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর  স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সফল প্রয়াস।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ব বরেণ্য নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কোনও অপশক্তিই এর অগ্রযাত্রাকে দাবিয়ে রাখতে পারবেনা।


ডক্টর আনিছুর রহমান আনিছ, লেখক, সাংবাদিক, আইন গবেষক, বিশেষ প্রতিনিধিঃ সাপ্তাহিক বাংলা সংলাপ।  সদস্যঃ লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব।


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর