কয়েক কোটি টাকা গচ্ছা

প্রকাশিত :  ০৭:১৮, ১৯ জানুয়ারী ২০২১

সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দামে মশার ওষুধ ক্রয়

সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চ দামে মশার ওষুধ ক্রয়

জনমত ডেস্ক : সর্বনিম্ন দরদাতাকে রেখে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে মশার ওষুধ সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিরুদ্ধে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে সম্পন্ন করা এসব কেনাকাটায় করপোরেশনকে কয়েক কোটি টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি নিয়ম অনুযায়ী সব টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ওষুধ সংগ্রহ করা হয়েছে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ১০ হাজার লিটার আর্ভিসাইডিং (টেমফোস-৫০ ইসি) ওষুধ সংগ্রহ করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে ডিএনসিসি। এতে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে এম আর এন্টারপ্রাইজ প্রতি লিটার ওষুধের দাম এক হাজার ৬৯৪ দশমিক ৯৯৫ টাকা করে সর্বমোট ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫০ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়।

এক হাজার ৭৭৭ দশমিক ০০১ টাকা করে সর্বমোট ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ১০ টাকা দর দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড। আর এক হাজার ৭৯০ দশমিক ৮০১ টাকা করে সর্বমোট ১ কোটি ৭৯ লাখ ৮ হাজার ১০ টাকা দর দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা (তৃতীয় অবস্থানে) হয় মেসার্স মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কার্যাদেশ পাওয়ার প্রথম তালিকায় থাকা এম আর এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ না দিয়ে তৃতীয় বা সর্বোচ্চ দরদাতা মার্শাল অ্যাগ্রোভেটকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে করপোরেশনের কয়েক লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।

মার্শাল প্রীতি ছাড়ছেন না কর্মকর্তা!

শুধু চলতি অর্থ বছরে নয়, তার আগের অর্থ বছরেও সর্বোচ্চ দর দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকা মেসার্স মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ৫ লাখ লিটার মশার ওষুধ ফর্মুলেশন করার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়ে। তাতে ডিএনসিসির প্রায় সোয়া কোটি টাকা বেশি খরচ হয়। ওই টেন্ডারে প্রতি লিটার ওষুধ ফর্মুলেশন করার জন্য নোকন লিমিটেড ১৬৪ টাকা করে মোট ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা দর দিয়ে প্রথম স্থান অবস্থান করে। প্রতিলিটার ১৭২ টাকা করে সর্বমোট ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা দর দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থান করে দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড। আর প্রতিলিটার ১৮৯ টাকা করে সর্বমোট ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দর দেয় মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এতে এক কোটি ১২ লাখ টাকা বেশি দর দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকা মার্শাল অ্যাগ্রোভেটকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

মার্শালের ফাঁদে পা দেয়নি ঢাকা দক্ষিণ!

ওষুধ ফর্মুলেশন করতে গত বছরের ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটার ওষুধের ফর্মুলেশন করতে দর দেয় ১৭২ টাকা। কিন্তু গত বছর প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল মেসার্স ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটারের জন্য দর দেয় ১৮৫ টাকা। আর তৃতীয় অবস্থানে ছিল জাহিন কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটারের দর দেয় ১৯৫ টাকা। কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অধিক দর দেওয়ায় প্রথম অবস্থায় কোনও প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিয়ে ফের টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি।

পুনঃটেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় মেসার্স ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দর দেয় ১৫৫ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মেসার্স দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস দর দিয়েছে ১৬৩ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মেসার্স নোকন লিমিটেড দর দেয় ১৮৩ টাকা। আর মেসার্স মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড চতুর্থ অবস্থন থেকে দর দেয় ১৮৯ টাকা। কিন্তু এই দফায়ও কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। দাম কমানোর জন্য আহ্বান করা হয় পুনঃটেন্ডার।

তৃতীয় দফার টেন্ডারে দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড সর্বনিম্ন ১৩৩ টাকা দর দেয়। ১৪৮ টাকা দর দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে এসিআই লিমিটেড। তৃতীয় স্থানে অবস্থান করে ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি দর দেয় ১৪৯ টাকা। ১৫৫ টাকা দর দিয়ে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করে নোকন লিমিটেড। আর পঞ্চম ও সর্বোচ্চ দরদাতা হয় মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটার ওষুধ ফর্মুলেশনের জন্য দর দেয় ১৮৯ টাকা। কিন্তু এ পর্যায়েও কোনও প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ চতুর্থ দফায় টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি।

এই দফায় মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ১৮৯ টাকা, ফরওয়াড ইন্টারন্যাশনাল ১৪৭ টাকা, নোকন লিমিটেড ১৬৪ টাকা দর দেয়। আর এতে এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেড ১২৯ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। এ দফায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সর্বনিম্ন দর দেওয়া এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়। এ অবস্থায় একই কাজ দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১২৯ টাকা করে করালেও উত্তর সিটি খরচ হচ্ছে ১৮৯ টাকা। এই কাজের জন্য দক্ষিণ সিটি পুনটেন্ডার আহ্বান করে দাম কমিয়ে নিলেও উত্তর সিটি করপোরেশন তা না করে বরং সর্বনিম্ন দরদাতাকে রেখে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেয়।

যা বলছে ডিএনসিসি

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা  বলেন, ইজিপিতে কোনও অনিয়ম করার সুযোগ নেই। টেন্ডারে যেসব শর্ত দেওয়া হয় যদি কোনও বিডকারী সেটা পূরণ না করে তাহলে সে ননরেসপনসিভ হয়ে যায়। কোনও ননরেসপনসিভ প্রতিষ্ঠান যদি বিনা পয়সায়ও ওষুধ সরবরাহ করে তার থেকে ওষুধ নেওয়া যাবে না। আইন সেভাবেই করা। আমরা চাইলেও তাকে কাজ দিতে পারবো না। এখানে যারা বাদ পড়েছে তারা ননরেসপনসিভ হয়ে পড়ায় বাদ পড়েছে।

কী করণে সর্বনিম্ন দর দিয়েও টেন্ডার পেলো না—এটা ওই প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলে, সেটা তিনি (বাদপড়া কোম্পানি) জানেন। আর ওষুধের কার্যকারিতা দুই বছর থাকবে কিনা সেই নিশ্চয়তা সনদ চাওয়া হলেও তিনি সেই সনদ দেননি।

বাদপড়া ঠিকাদারদের অভিযোগ

তবে করপোরেশনের এই দাবিকে সঠিক বলে মনে করছে না সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান এম আর এন্টারপ্রাইজ। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ পেস্টিসাইড অ্যাসোসিয়েশনের ট্রেজারার ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে টেন্ডারের জন্য যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে আমরা সবগুলোই পূরণ করে দরপত্র জমা দিয়েছি। তবে শুনেছি ওষুধের নিশ্চয়তা সনদ দেওয়া হয়নি, একারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সনদ তো ওষুধ সরবরাহের আগে দেওয়া হবে না। এটা ওষুধের সঙ্গে দেওয়া হবে। শর্তে বলা আছে, ওষুধ সরবরাহের দিন থেকে পরবর্তী দুই বছর। তাহলে টেন্ডারের সঙ্গে এই কাগজ কীভাবে দেওয়া হবে?

তিনি আরও বলেন, ইজিপিতে অভিযোগ দেওয়ার একটা কলাম রয়েছে। যেখানে অভিযোগ বা কমেন্ট করলে তা মীমাংসা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই কলাম হাইড করে দেওয়া হয়েছে। এতেই বুঝা যাচ্ছে টেন্ডার কতো অস্বচ্ছ হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেন্ডারে অংশ নেওয়া অপর একটি প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, শুধু এই টেন্ডার নয়, তার আগের টেন্ডারেও সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দেড় কোটি টাকা বেশি দাম দিয়ে ওষুধ কেনা হয়েছে। তখনও এই প্রতিষ্ঠান (মেসার্স মার্শাল অ্যাগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড) সর্বোচ্চ দরদাতা ছিল। এবারও জালিয়াতি করে সর্বোচ্চ দামে সেই প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। সঠিক তদন্ত করলে অবশ্যই এই দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে।


Leave Your Comments


বাংলাদেশ এর আরও খবর