প্রকাশিত :  ২০:৪২, ২৮ জানুয়ারী ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ২১:৫৫, ২৮ জানুয়ারী ২০২১

করোনা ভ্যাকসিন: যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি

করোনা ভ্যাকসিন: যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি

জনমত ডেস্কঃ সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই। করোনার ভ্যাকসিন দিয়ে সারা বিশ্বের জনজীবন দ্রুত স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় এখন সময়ই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।

জানুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত বিশ্বের ছয় কোটি মানুষকে ভ্যাকসিনের একটি ডোজ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন দেশে টিকাদান শুরু হলেও বেশ কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এখনও জানা যায়নি যে ভ্যাকসিন কত দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে অথবা করোনার যেসব নতুন রূপ দেখা গেছে এসব ভ্যাকসিন দিয়ে আদৌ তাদের প্রতিহত করা যাবে কিনা। খবর বিবিসি বাংলা 

মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বে চালু হলেও চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব এখনও পাওয়া যায়নি।

১. ভ্যাকসিন কতদিন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ করবে?

ড. অ্যান্ড্রু ব্যাডলি বলছেন, উপাত্ত থেকে জানা যাচ্ছে যে কিছু লোক ভ্যাকসিন নিলেও করোনায় সংক্রমিত হবেন।

গত ক'মাস ধরেই অনেকের মনে একটাই ভাবনা: ভ্যাকসিন কিভাবে পাওয়া যাবে, আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কি বেড়েছে?

মহামারি শুরু হওয়ার এক বছর পর মধ্যম এবং দীর্ঘ মেয়াদে ইমিউনিটির ওপর প্রথম গবেষণার ফলাফল ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব গবেষণার একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ভ্যাকসিন তৈরিতে অনেকটা সময় লেগে যাওয়ার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে খুব একটা জানা যায় না।

তবে ক্যালিফোর্নিয়ার লা জোলা ইন্সটিটিউট অফ ইমিউনোলজির মতে, করোনার সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর অন্ত:ত প্রায় ছ'মাস সময় পর্যন্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মানবদেহে থেকে যায়।

ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণাতেও একই ফলাফল দেখা গেছে। তারা বলছে, কোভিড থেকে সেরে ওঠার বেশিরভাগ রোগী অন্তত পাঁচ মাস আবার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন। তবে প্রথম সংক্রমণের ঘটনা যেহেতু পাঁচ মাসের খুব বেশি আগে ঘটেনি, তাই কিছু বিজ্ঞানী মনে করছেন ইমিউনিটি থেকে যাবে বহুদিন, সম্ভবত কয়েক বছর।কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন কতদিন কার্দযকর থাকবে তা এখনও অজানা। কিন্তু একথা ঠিক যে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ব্যাপার ঘটবে না। কারণ প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ শক্তি ভিন্ন এবং আবার সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা এর ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে। একই ধরনের ব্যাপার ঘটবে ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে।

"ইমিউনিটি আসলে কতদিন থাকবে এটা বলা বেশ কঠিন," বলছেন ব্রিটেনের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট ড. জুলিয়ান ট্যাং, "কারণ আমরা মাত্রই টিকা দিতে শুরু করেছি। তার তার ফল একেক রোগীর ওপর একেক ভাবে পড়বে। কী ধরনের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হচ্ছে সেটার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে ইমিউনিটি সম্ভবত ছ'মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।"

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো ক্লিনিকের অধ্যাপক ড. অ্যান্ড্রু ব্যাডলি আরও বেশি আশাবাদী। তিনি বলছেন, "আমি নিশ্চিত যে ভ্যাকসিনের প্রভাব এবং ইমিউনিটি কয়েক বছর ধরে রয়ে যাবে।

"ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর রোগী কী অবস্থা হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কী হয় তা বিশদভাবে পর্যালোচনা করাও জরুরি।"


২. ভ্যাকসিন নেয়ার পরও কি করোনাভাইরাস হতে পারে?

করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ভর করবে রোগীর সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। হ্যাঁ, এটা হতে পারে, এবং তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ।

প্রথম কারণটি হচ্ছে, আপনি যে ধরনের ভ্যাকসিনই নেন না কেন, বেশিরভাগ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ নেয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর সেটি কাজ করতে শুরু করে।

"টিকা নেয়ার পরের দিন বা এক সপ্তাহ পর যদি ভাইরাস আপনার দেহে ঢোকে, তাহলেও আপনি সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে যাবেন, এবং অন্যদের সংক্রমিত করবেন," ড. ট্যাং বিবিসিকে ব্যাখ্যা করছিলেন। আবার, টিকার দুটি ডোজ নেয়ার কয়েক সপ্তাহ পরও কেউ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে।

"আমাদের হাতে যেসব উপাত্ত আছে তা থেকে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষ ভ্যাকসিন নেয়ার পরও সংক্রমিত হতে পারেন। তবে যারা ভ্যাকসিন একেবারেই নেননি তাদের তুলনায় এরা কম অসুস্থ হবেন, এবং তাদের দেহে ভাইরাসের মাত্রাও থাকবে অনেক কম," বলছিলেন ড. ব্যাডলি।

"আমার ধারণা একই ভাবে ভ্যাকসিন নেয়ার পর এক দেহ থেকে অন্য দেহে ভাইরাস ছড়ানোও বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।"

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে করোনা ভ্যাকসিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে কার্যকর-ভাবে সুরক্ষা দিতে পারবে তা নিয়ে খুব একটা মতভেদ নেই। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং জীবাণু বিস্তার ঠেকাতে ভ্যাকসিন কতখানি সক্ষম হবে তা এখনই জানা যাচ্ছে না।

"এটা খুবই এক ভিন্নধর্মী ভাইরাস এবং একে জনের দেহে এর প্রভাব একেক রকম," বলছেন স্পেনের মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হোসে মানুয়েল বাওটিস্টা।

"ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটবে। কারও কারো দেহে জোরালো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা দেবে যার ফলে তাদের দেহে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ঘটবে না। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা ঘটবে দুর্বলভাবে, এবং কিছু বংশবৃদ্ধি আর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটবে।"

৩. করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন থেকে ভ্যাকসিন কি সুরক্ষা দেবে?

দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার কয়েকটি নতুন রূপ ধরা পড়েছে। আর একারণে আশঙ্কা যে এটি অনেক বেশি প্রাণাঘাতী হবে। এটা নিয়ে একটা উদ্বেগ রয়েছে।

ভাইরাস অনবরত তার রূপ পরিবর্তন করে। কখনও কখনও সেই পরিবর্তন এমনই হয় যে তা ভ্যাকসিনকে রোধ করার ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে তাদের ঠেকাতে হলে ভ্যাকসিনেও পরিবর্তন আনতে হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ব্রিটেনে করোনার যে নতুন ধরন পাওয়া গিয়েছে সেগুলো ইতোমধ্যেই অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দুটি নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতাও অনেক বেশি বলে দেখা যাচ্ছে।

মডার্না গত সোমবার ঘোষণা করেছে যে তাদের তৈরি ভ্যাকসিন ব্রিটেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের করোনার জীবাণুকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত ভ্যাকসিন তৈরি করতে হবে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেবে।

ফাইজার/বায়োনটেকও দাবি করছে যে তাদের ভ্যাকসিন করোনার নতুন রূপকে ঠেকাতে পারে।

"একইভাবে বিবেচনায় নিতে হবে যে অনুমোদিত ভ্যাকসিনগুলো বেশ কার্যকর হলেও করোনার মূল জীবাণুর বিরুদ্ধে এটা ১০০% সুরক্ষা দিতে পারবে না, নতুন ধরনের করোনার বিরুদ্ধে তো নয়ই," বলছে ড. ব্যাডলি।

ড. ট্যাং বলছেন, "ভ্যাকসিনের সুরক্ষা মূলত নির্ভর করবে নতুন ধরনের করোনা আসলটির চেয়ে কতোটা ভিন্ন তার ওপর।"

মোদ্দা কথা, নতুন ধরনের করোনা তৈরি হচ্ছে কিনা তার ওপর বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগকে নজর রাখতে হবে, এবং দেখতে হবে এদের ওপর ভ্যাকসিন ব্যবহারে আসলে কাজ হচ্ছে কিনা।

৪. ভ্যাকসিনের ক'টি ডোজ, কতদিন ধরে দিতে হবে?

করোনার নতুন রূপ ধরা পড়ার পর অনেক দেশে বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফাইজার, মডার্না এবং অক্সফোর্ড/অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় দিতে হবে দুটি ডোজ।

গোড়ার দিকে যখন ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলছিল তখন বলা হয়েছিল, প্রথম ডোজের তিন থেকে চার সপ্তাহ পরে দ্বিতীয় ডোজটি নিতে হবে। কিন্তু ২০২০ সালের শেষের দিকে ব্রিটেন ঘোষণা করে যে বেশিরভাগ লোককে প্রথম ডোজের টিকা দেয়ার স্বার্থে তারা তিন মাস পরে দ্বিতীয় ডোজটি দেবে।

এই ঘোষণার পর টিকা দেয়ার সর্বোত্তম উপায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয় বিতর্ক। কিন্তু ফাইজার এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলেন যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেটা সবচেয়ে কার্যকর বলে দেখা গেছে তা হলো: আজ যদি প্রথম ডোজ দেয়া হয়ে তাহলে দ্বিতীয় ডোজটি দিতে হবে ঠিক ২১ দিনের মাথায়।

এনিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তাদের মতামত জানিয়েছে। তাদের পরামর্শ: ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ করতে হবে।

তবে তারা একথাও বলেছে যে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এটা সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহ বাড়ানো যেতে পারে।



Leave Your Comments


করোনাভাইরাস এর আরও খবর