প্রকাশিত :  ০৬:২৯, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২১

প্রথম দেখা নতুন দিন

প্রথম দেখা নতুন দিন

মাহবুব আলম চৌধুরী

বিছানায় শুয়ে আছি, পড়ছিলাম “আলেক্সান্ডার দ্যুমা”র বিখ্যাত বই “কাউন্ট অব মন্টেক্রিস্টো”। শিহরিত হচ্ছিলাম। ভাবলাম দ্যুমার আর যে বইগুলো আছে পড়ে ফেলব সব। কিন্তু বইয়ের লিস্ট পাব কই? চিন্তা নেই, ইন্টারনেট আছে না! হুট করে ঢুকে গেলাম নেটে, দ্যুমার সম্পর্কিত যা তথ্য আছে মোটামুটি জেনে গেলাম, আর তার সাথে সাথে উনার বাকি বইগুলার তালিকাও করে ফেললাম। তাঁর “দা ব্ল্যাক টিউলিপ” বইটা ডাউনলোডে ফেলল্লাম। অপেক্ষার পালা... আমি নস্টালজিক হয়ে গেলাম ।

হারিয়ে গেলাম শৈশবে...

তখন বয়স কতই বা আর হবে, ৬ অথবা ৭। আব্বা আমাদের গল্প শুনাতেন, বলতেন রাজনীতির কথা। বঙ্গবন্ধু, ভুট্টো, আইয়ুব খান, লেনিন।। বলতেন যুদ্ধের কথা।

আমরা তিন ভাই-বোন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আমি আব্বাকে কথার মধ্যে শুধু বাধা দিতাম, প্রশ্ন করতাম।

“আব্বা, যুদ্ধ না হলেই ত ভালো ছিল। আমরা উর্দুতে কথা বলতাম!!”

আমার ছোট বোনটাও, আমাকে সাপোর্ট দিত। 

“তাইত, আমরা “হামসে, তুমসে” বলতাম!!”

আব্বা আমাদের বুঝাতেন। তারপর আবার গল্পে ফিরে যেতেন। আমি আবার প্রশ্ন করতাম। আব্বা, আবার উত্তর দিতেন। আমি আবার প্রশ্ন করতাম, এক পর্যায়ে আব্বা শুধু “হু হা” করে উত্তর দিতেন এবং শেষের দিকে আমার প্রশ্নের যন্ত্রণায় চরম বিরক্ত হয়ে একটা “রাম ধমক” দিতেন। আমি চুপসে মেরে যেতাম।।

আস্তে আস্তে স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। পড়তাম, খেলতাম।। বাসাতে সন্ধ্যার দিকে আম্মা আমাদের পড়াতেন। আমার আম্মা এত বেশী পড়ালেখা জানা মানুষ না। পাঠশালা পর্যন্ত বোধহয় পড়েছিলেন। আমার আব্বা ছিলেন চতুর্থ শ্রেনীর একজন সরকারী কর্মচারী। তাঁর পক্ষে আমাদের তিন ভাই-বোনকে আলাদা প্রাইভেট টিউটর রেখে পড়ানো ছিল দুস্কর।

আম্মা আমাদের গল্পের ছলে পড়াতেন। আমরা শুনতাম আর আমি প্রশ্ন করতাম। আমার অর্ধশিক্ষিত মায়ের পক্ষে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দেয়াও কষ্টের ছিল। তাই, তিনিও “বেস, আর প্রশ্ন নয়, এবার যা পড়ালাম তা লিখ। জান তো দশবার পড়ার চেয়ে আর একবার লেখা অধিক উত্তম” বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন। আমরা লিখতাম।।

চোখে রঙ্গীন চশমা নিয়ে, হাইস্কুল জীবনে প্রবেশ করলাম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি সবসময় সব পরীক্ষাতে হতাম প্রথম। তাই, মা-বাবা, শিক্ষকদের প্রত্যাশাটা আমার প্রতি ছিল একটু বেশী। ইংরেজী স্যার ক্লাসে পড়াতেন ইংরেজী গ্রামার। অ্যাপ্লিকেশান পড়াতেন। “Oblige” কে বলতেন “অব্লিগ”, “Would” কে বলতেন “উল্ড”। মনে খটকা লাগত। বাসাতে আব্বার ছাত্রজীবনের কেনা “ইংরেজী টু বাংলা” ডিকশনারী দেখতাম। স্কুলে স্যার আবার ভুল উচ্চারনে পড়াতেন। আমি ভুল ধরতাম। “স্যার, এটার উচ্চারণ তো ওইরকম না এইরকম হবে!”। স্যার এসে কান মলে দিতেন, আর বলতেন “বেশী বূজস, আমি যেমনে কইছি তেমনিই পড়, নাইলে পরীক্ষায় আন্ডা খাইবি”। “পরীক্ষায় আন্ডা” খাওয়ার ভয়ে আমি আর কিছু বলতাম না।

বাংলা ক্লাসে স্যার পড়াতেন, ‘আকাশ জয়ের কাহিনী”। রাইট ব্রাদার্স কিভাবে আকাশ জয় করল, সেই কাহিনী। পড়াতেন “ডেডালাস আর ইকারাসের” কাহিনী। আমি প্রশ্ন করতাম, “রাইট ব্রাদার্সের বাড়ি কোথায় স্যার?” “ডেডালাস আর ইকারাসের দেশ কোথায় স্যার?” স্যার, “বইয়ে আছে, খুইজা বাইর কর, সব কি আমারে দেখাইয়া দিতে অইব নাকি?” বলে তেড়ে আসতেন। আমি বইয়ে খুজতাম।। 

বিজ্ঞান স্যার পড়াতেন। আমি মুগ্ধ শ্রুতা হয়ে শুনতাম। স্যার কম্পিউটারের কথা বলতেন। বলতেন, “আরে বিদেশে তোদের বয়সের বাচ্চারা, কম্পিউটার-ইন্টারনেট চালায়। তাদের কাছে এইগুলা পানিভাত।“ ভাবতাম, “আহ, যদি আমরা এইরকম করে কম্পিউটার চালাতে পারতাম!!” কিন্তু তখন তা ছিল আমাদের জন্য আকাশ-কুসুম কল্পনা। মোবাইলই তখন কারো কাছে তেমন ভাবে পৌছায়নি, আর কম্পিউটার!!

আমাদের স্কুলে একটা পাঠাগার ছিল, এখনও আছে। যদিও এখন আর আগের মত বই নেই। স্যার ক্লাসে এসে পড়াতেন বই পড়ার গুরুত্ব। বলতেন “মদ, রুটি ফুড়িয়ে যাবে। প্রিয়ার কালো চোখ ধবল হয়ে যাবে, তবু বইখানা থাকবে অনন্ত যৌবনা।“ বাহ কি কথা !! 

মনে নেই কে, হয়ত মুক্তাদির স্যার অথবা কিবরিয়া স্যার আমাকে একদিন আমাদের পাঠাগারে নিয়ে যান, হাতে তুলে দেন মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাইন্স ফিকশান “টুকুনজিল” আর বললেন, “অবসর সময় অযথা স্কুলে ঘোরাঘুরি না করে, এখানে এসে বই পড়বে”।

আমি বই পড়তাম। পরিচয় হল “হুমায়ুন আহমেদ”, “বুদ্ধদেব গুহ”, “ডেনিয়েল ডিফু”, “ম্যাক্সিম গোর্কী”র সাথে। বেড়ে চলল আমার বই পড়া। বছর ঘুরতেই খেয়াল হল, এখানে আর নতুন কোন বই নেই! 

লাইব্রেরীয়ান ম্যাডামকে বলতাম বইয়ের কথা। তিনি বলতেন, “কয় দিন পর এইখানে কম্পিউটার আসবে, আর বই দিয়ে কি করবা?” উনার এই কথা শুনে দুঃখ পেলাম, আবার মনের কোনে আনন্দ উঁকি দিত এই ভেবে যে, “বাহ, কম্পিউটার আসবে!! আমরা কম্পিউটার চালাব!!!”

অপেক্ষা করতাম, কখন কম্পিউটার আসবে। দিন যায়, সপ্তাহ যায়। কম্পিউটার আসে না।।

কিন্তু না, প্রায় একমাস পরে আমার সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, আমাদের স্কুলে এল বহু আকাংখিত কম্পিউটার! দূর থেকে দেখতাম টিভির মত বাক্সটাকে। স্যারেরা প্রথম কম্পিউটার চালাতেন। আর আমাদের, মানে ছাত্রদের এটা থেকে একশ হাত দূরে থাকার নির্দেশ ছিল, যদিও এটা আনাই হয়েছিল আমাদের মানে ছাত্রদেরকে বিনামূল্যে শিখানোর জন্য।

এরপ্রায় কয়েকমাস পর, যখন কম্পিউটারের প্রথম ক্রেজটা সবাই কাটিয়ে উঠল, তখন আমরা সুযোগ পেলাম, তাও আবার মাসিক চুক্তি ভিত্তিতে। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে মাউস ধরতাম মনে থাকত ভয়, না জানি কখন নষ্ট হয়ে যায়। ম্যাডাম বলতেন “সাবধানেএএএএএ", আমি আৎকে উঠতাম।

আমার প্রথম কম্পিউটারে হাতেখড়ি ছিল, আমাদের পাঠাগারের সেই কম্পিউটারটিতেই। ম্যাডামকে প্রশ্ন করতাম, এটা, ওটা আরো কত কি।। কম্পিউটার দেখতাম আর আশ্চর্যিত হতাম। মনে হাজারো প্রশ্ন আসত, কিন্তু কোন সঠিক উত্তর পেতাম না।।

এদিকে আস্তে আস্তে আমি বড় হচ্ছি। বেয়ে চলছি একের পর এক ক্লাস। চলে আসল আমাদের এস.এস.সি পরীক্ষা। পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট দিল। হতাশ হলাম। আশানুরুপ ফলাফল হল না।

কলেজে ভর্তি হলাম। প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার পথে দেখতাম, একটা কম্পিউটারের দোকান। যেখানে লেখা “এখানে ইন্টারনেট ব্রাউজ করা যায়”। একদিন, দুইদিন, তিনদিন...

আমি গেলাম।৩০ টাকা ঘন্টা করে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতাম। ঘন্টা যে কোন দিক দিয়ে যেত টেরই পেতাম না। আস্তে আস্তে অনেক কিছু শিখলাম। আমি নিজেই আমার নিজের ইমেইল এ্যাড্রেস খুললাম!

একদিন পরিচিত হলাম গুগোল নামক একটা ওয়েবসাইটের সাথে। আশ্চর্যিত হয়ে দেখলাম, ওটাতে আমি যাই কিছুই লিখি না কেন, ওই রিলেটেড কিছু না কিছু দেখাচ্ছে। আস্তে আস্তে জানলাম, এটা হল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় “সার্চ ইঞ্জিন”। গুগোল আমার জীবনটাকে আমূল পালটে দিল। আমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি পেলাম গুগোলের কাছ থেকে। জানলাম “উইকিপিডিয়ার” কথা। “ফেসবুকে” একাউন্ট খুললাম। 

কিছুদিন পর আব্বাকে অনেক বলে কয়ে একটা মোবাইল কিনলাম। সম্ভবত নোকিয়ার কোন একটা মডেল হবে। ইন্টারনেট সাপোর্টেড ছিল। আমার হাতে স্বর্গ চলে এল যেন। কত কি যে শিখলাম। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার প্রথম ইন্টারনেটের আর্নিং ওই মোবাইল দিয়েই!

দিন যেতে লাগল। আমি এখন অনার্স পড়ি। প্রযুক্তির (প্রায়) সমস্ত সুবিধাই আমার কাছে আছে। ডেস্কটপ, লেপটপ, স্মার্টফোন, স্ট্যাবল ইন্টারনেট কানেকশান সব আছে। কোন কিছু জানতে হলে আর কাউকে জিজ্ঞেস করি না। চাকরীর জন্য কারো ধার ধারি না। কারণ, আমার হাতে আছে ইন্টারনেট। পৃথিবী এখন আমার হাতের মুঠোয়। 

আমাদের বাসাতে এখন কারো কিছু জানার দরকার হলেই আমি।

আব্বা বলেন, “মাছুম, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হচ্ছে। দেখত ইন্টারনেটে ডায়েবেটিকস হয়ে গেল না কি?”

আপা বলে, “মাছুম দেখত, ইউ.এস.এর কোন কোন ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপে পোস্ট গ্রাজুয়েশান করার সুযোগ দেয়?”

ছোট বোন নিজে নিজে তার পরীক্ষার সাজেশন্স বের করে। কোন প্রিয় গান শুনার ইচ্ছে হলে নিজে নিজেই তা নেট থেকে বের করে নেয়।

বন্ধুরা বলে, “বন্ধু শেখাও, ইন্টারনেটে কিভাবে আর্ন করতে হয়?”

এই সমস্যা, সেই সমস্যা কত যে সমস্যার সমাধান দেই, শুধুমাত্র ইন্টারনেট দিয়ে।

আমি ছোট খাট একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়াই। বাচ্চাদের ইউটিউবের ভিডিও দেখাই। মজায় মজায় বর্ণমালা শেখাই। মাইটোসিস, মিয়োসিস কোষ বিভাজন করার প্রক্রিয়া দেখাই ইউটিউবে। ছোট ক্লাসের বাচ্চাদের কার্ডের ম্যজিক দেখাই এবং শিখিয়েও দেই। কারণ, আমার তো আর হারানোর ভয় নেই। আমি শিখি ইন্টারনেট থেকেই তো ????

আমার পিচ্চি ছাত্র-ছাত্রীরা জানে কিভাবে গুগোল সার্চ করে কিছু বের করতে হয়, কিভাবে বাংলা উইকিতে ঢুঁ মারতে হয়।

আমি আমার বন্ধু-বান্ধব,  অথবা পরিচিতজনদের সবসময়ই বলে থাকি, সবসময় ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে, কারন ইন্টারনেট হচ্ছে একটা মুক্ত জ্ঞানের ভূবন। এখান থেকে যত পার জ্ঞান আহরন কর, নিজের কাজে লাগাও, কেউ তোমাকে বাঁধা দিবে না।

আর জ্ঞান বিতরণ কর, যা তুমি শিখলে তা অন্যকে শেখাও। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, “Sharing is caring.”

আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন আমার দেশের প্রতিটি ছেলেমেয়ে নিজের প্রয়োজনে ইন্টারনেটের সাহায্য নিবে। তারা উইকিতে লিখবে, লিখবে ব্লগে, করবে মুক্ত জ্ঞানের চর্চা। তখন থাকবে না কোন ন্যুডিটি, চাইল্ড পর্ণোগ্রাফীর নগ্ন থাবা। সমস্ত ছেলেমেয়েরা থাকবে মুক্ত জ্ঞানের অন্বেষনে......

যাক, লেখাটা অনেক লম্বা হয়ে গেল মনে হয়। আর এদিকে আমার “দা ব্ল্যাক টিউলিপ” বইটা সেই কবে ডাউনলোড হয়ে গেছে। বইটা পড়ে নেই, কেমন।


লেখক: মাহবুব আলম চৌধুরী
আউট সোসর্সিং ইনডিভিজুয়াল
ইনাতগঞ্জ, হবিগঞ্জ




Leave Your Comments


শিল্প-সংস্কৃতি এর আরও খবর