প্রকাশিত :  ০০:৪৩, ০৬ এপ্রিল ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ০০:৪৫, ০৬ এপ্রিল ২০২১

টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদ্ধতিকে 'গুডবাই' জানানোর উদ্যোগ

বিবিসি বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন

টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদ্ধতিকে 'গুডবাই' জানানোর উদ্যোগ
জনমত ডেস্কঃ পূর্ব লন্ডনে বাঙালী-প্রধান বারা টাওয়ার হ্যামলেটসে বর্তমান মেয়র পদ্ধতির প্রশাসন ব্যবস্থার অবসান চাইছে এখনকার রাজনৈতিক দলগুলি।
এ নিয়ে আগামী ৬ই মে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পাশাপাশি, টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদ্ধতি বহাল রাখা হবে কি-না, তা নিয়েও এক গণভোট  অনুষ্ঠিত হবে।
বিবিসি বাংলা অনলাইনে এ ব্যাপারে বিশেষ একটি প্রতিবেদন করেছেন মাসুদ হাসান খান। জনমত পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি হুবহু এখানে তুলে হলো।...
টাওয়ার হ্যামলেটসের লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, কনজারভেটিভ এবং গ্রিন পার্টির রাজনীতিকরা মেয়র পদ্ধতি বিলোপের পক্ষে একযোগে প্রচার চালাচ্ছেন। তারা গড়ে তুলেছেন 'লিডিং টুগেদার' ক্যাম্পেইন।
বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী এবং বারার বর্তমান মেয়র জন বিগস নিজেও এই প্রথা বিলোপের পক্ষে, যদিও এর পেছনেও রয়েছে স্থানীয় রাজনীতি।
এরা চাইছেন, সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি বিলোপ করে তার জায়গায় কাউন্সিলে 'লিডার ও ক্যাবিনেট' পদ্ধতি চালু করতে। তাদের যুক্তি: এর মাধ্যমে ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলারদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে এবং ক্ষমতার সুষম বণ্টন সম্ভব হবে।
মূলত একজন নির্বাহী মেয়র থাকলে বারার কাউন্সিলাররা আর পাদপ্রদীপের আলোতে থাকতে পারেন না। সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন একজন মেয়র।
অন্যদিকে, এই প্রস্তাবের বিপক্ষে মাঠে নেমেছেন প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমান। ব্যারোনেস পলা উদ্দিনের মতো কিছু রাজনীতিক, কমিউনিটি নেতা এবং ব্যবসায়ী তাকে সমর্থন দিচ্ছেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এক খোলা চিঠিতে লুৎফুর রহমান বলেছেন, মেয়র পদ্ধতি বিলোপ হলে টাউন হলে বসে এক দল কাউন্সিলার গোপনে একজনকে 'লিডার' বানাবেন। তখন ক্ষমতা চলে যাবে পর্দার আড়ালে।
"সাধারণ জনগণ নয়, লিডারকে খুশি রাখতে হয় স্বল্প সংখ্যক কিছু কাউন্সিলার এবং নেতাকে … টাউন হলে বসে ব্যক্তি-বিশেষের রাজনীতি করতে হয়," লিখেছেন তিনি।
"ব্যাপারটা মোটেও সে রকম না," বলছেন মেয়র প্রথা বিলোপ সমর্থনকারী সাবেক লেবার কাউন্সিলার হেলাল উদ্দিন আব্বাস। "জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।"


সাবেক কাউন্সিল লিডার হেলাল আব্বাস মেয়রাল সিস্টেম বাতিলের পক্ষে... ছবিটি হেলালআব্বাসডটকম থেকে নেয়া।

মেয়র প্রথা বিলোপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বিবিসিকে বলেন, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলাররাই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি। ভোটারদের ভালমন্দের দায়দায়িত্ব তাদেরই। ভোটাররা যদি চান পরবর্তী নির্বাচনে তাকে বাদ দিতে পারেন।
"কিন্তু একজন মেয়রকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এককভাবে, যেখানে ভুল করার সুযোগ থাকে। এ কারণেই এটা বেশ অগণতান্ত্রিক। এখানে যথেষ্ট চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

নির্বাহী মেয়র: এক যুগের পরীক্ষা

টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র পদ্ধতির বিলোপ নিয়ে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান অনেকটা রাষ্ট্রপতি এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার পার্থক্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
জনগণের সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি চালু হয়েছিল ২০১০ সালে। ওই সময় এক গণভোটে টাওয়ার হ্যামলেটসের বাসিন্দারা লিডারশীপ পদ্ধতি বাতিল করে একজন মেয়রকে ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের তৎকালীন লেবার পার্টির মধ্যে দেখা দেয় দলীয় কোন্দল। প্রথমদিকে লুৎফুর রহমানকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হলেও পরে প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন করা হয় বারবার।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টির জাতীয় নির্বাহী কমিটিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। কমিটি শেষ পর্যন্ত মি. রহমানের নাম বাদ দিয়ে হেলাল উদ্দিন আব্বাসকে মনোনয়ন দেয়। 
এর প্রতিবাদে লেবার পার্টি থেকে বেরিয়ে লুৎফুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়েন এবং প্রথম নির্বাহী মেয়র হিসেবে বিজয়ী হন।
কিন্তু মেয়র পদে নির্বাচনের আগে এবং পরে মি. রহমানের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তার সাথে ইসলামী কট্টরবাদের যোগাযোগ, 'বাংলাদেশী কায়দায়' ভোটের প্রচারকাজ, ভোট জালিয়াতি এবং ব্যাপক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে।


বারার বর্তমান মেয়র জন বিগস নিজেও এই প্রথা বিলোপের পক্ষে... ছবিটি তার টুইটার হ‍্যান্ডল থেকে সংগৃহিত

তবে ব্রিটেনের নির্বাচন সংক্রান্ত আদালত এসব অভিযোগ নাকচ করে দেয়। ফৌজদারি অভিযোগগুলোও পরে পুলিশী তদন্তে ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততদিনে লুৎফুর রহমানের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।
পরের মেয়াদের জন্য যে মেয়র নির্বাচন হয়, ভোটে অনিয়মের অভিযোগে সেই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল হয়ে যায়।
এসব ঘটনা নিয়ে ব্রিটেনের মূল সংবাদমাধ্যমে যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়, তার একটি প্রভাব হচ্ছে: অন্তত স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মধ্যে সরাসরি ভোটে মেয়র নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কেই আস্থা দৃশ্যত অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফলে ১০ বছর পর পর মেয়র পদ্ধতি সম্পর্কে গণভোটের বিধান এখন এই পদ্ধতিকে বদলে দেয়ার নতুন আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে।

হ্যাঁ-ভোট, না-ভোট: রাজনীতির খেলা

"টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতি আগেও বিভাজনের রাজনীতি ছিল, এখনও তা-ই আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা।
অতীতে কাউন্সিলারদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে গেলেই তাকে ফেলে দেয়া হতো বাংলাদেশী-'নন বাংলাদেশী' রাজনীতির আবর্তে, তিনি বলছেন, ফলে সেই ঘূর্ণিপাক থেকে তার আর বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকতো না।