প্রকাশিত :  ০৭:১৫, ২৮ এপ্রিল ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২৯, ২৮ এপ্রিল ২০২১

করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সামাল দিতে যা যা করা যেতে পারে

করোনার  ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সামাল দিতে যা যা করা যেতে পারে

জনমত ডেস্ক: মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলেই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। ১৪ দিনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে ভারতীয় সীমান্ত। তারপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদেরকে এ যাবতকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজস্ব অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, ভারত ইতোমধ্যে অক্সিজেন রফতানি বন্ধ করেছে।

ভারতে করোনায় মৃত্যু ক্রমেই বাড়ছে। সোমবার (২৬ এপ্রিল) দিল্লিতে মৃত্যু হয়েছে ৩৮০ জনের। সেখানে মেডিক্যাল অক্সিজেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং ওষুধের মারাত্মক অভাব দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনেই ভারতে ১০ লাখের বেশি নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে পরিমাণ আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য সরকারিভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে তার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।

ভারতের অবস্থা দেখে স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে জানিয়েছে, কোনোভাবেই যেন ভারতীয় এই ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে না পৌঁছায়। একইসঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মানুষ যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানে তাহলে বাংলাদেশের অবস্থাও ভারতের মতো হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘সীমান্ত বন্ধসহ যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলো সব যদি কিছুদিন থাকে তাহলে হয়তো ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টকে আটকানো যাবে। ভারত এখন সংক্রমণের পিকে চলে গেছে, পিক থেকে ডাউন ফল হবে। সেক্ষেত্রে এটা আরও মিউটেশন হয়ে গিয়ে কোল্ডও হয়ে যেতে পারে। আমাদেরকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, একইসঙ্গে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো মেনে চললে আমরা হয়তো ঠেকাতে পারবো।’

তিনি বলেন, ‘তাদের নির্বাচন হয়েছে, বিভিন্ন রকমের মেলা হয়েছে। এসব কারণে ওখানে সংক্রমণ সেখানে বেশিই হয়ে গেছে। আর অনেক বেশি ট্রান্সমিশন হলে মৃত্যুও বেশি হবে। তবে যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানা হয়, তাহলে আমাদের অবস্থা ভারতের মতোই হবে। আমরা যদি ডাবল বা ট্রিপল মিউটেশনের মধ্যে পরে যাই তাহলে আমাদের অবস্থা কী পরিমাণ ভয়ঙ্কর হবে সেটা চিন্তা সবাই চিন্তা করবেন।’


সংক্রমণ বেশি হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে যায়

মার্চের শুরুতে দেশে রোগী সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বগতিতে চলে যায়। সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় একদিনে ১১২ জনের। মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার হয় মাত্র ১০ দিনে। তখন চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালে সাধারণ বেড পায়নি মানুষ, আইসিইউ ছিল সোনার হরিণ। সেখানে ভারতীয় এই ভ্যারিয়েন্ট দেশে এলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সে চাপ নিতে পারবে কিনা প্রশ্নে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘সংক্রমণ বেশি হলে যেকোনও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভেঙে যায়। এটা উন্নত বিশ্বেও হয়েছে ভারতেও হয়েছে। ইতালি-আমেরিকা সাফার করছে। আর আমাদের অবস্থা তো কখনোই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো ছিল না। এরকম অবস্থা হলে সবাইকেই সাফার করতে হবে।’

যশোর হাসপাতাল থেকে ভারত থেকে আসা রোগীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এরা যদি মিক্সিং আপ করে তাহলে সমস্যা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘বাংলাদেশে এটা চলে এলে খুবই ভয়াবহ অবস্থা হবে। বাংলাদেশ যদি সচেষ্ট হয়, সম্মিলিতভাবেভাবে চেষ্টা করে তাহলে এর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’

ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট এসেছে বলেই আশঙ্কা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই মতো বাংলাদেশে এই ভ্যারিয়েন্ট ইতোমধ্যেই ঢুকে গেছে। আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এই ভ্যারিয়েন্ট অনেক আগেই শনাক্ত হয়েছে। বিষয়টা তো এমন না যে, ইন্ডিয়াতে কাল শনাক্ত হয়েছে, কালকেই আমরা বর্ডার বন্ধ করেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ছয়টি স্থলবন্দর রয়েছে যেখান থেকে পণ্যবোঝাই হয়ে ভারত আসে শ’য়ে শ’য়ে ট্রাক আসে, এগুলো কিন্তু বন্ধ করা হয়নি। এসব ট্রাকের চালকসহ অন্যদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে। যদিও সে ব্যবস্থা নেই সেখানে। অথবা তাদেরকে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের আওতায় আনতে হবে। যদি তাদের মধ্যে কেউ শনাক্ত হন তাদেরকে যেন আইসোলেশনে রাখা যায়।’

অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘যেহেতু প্রতিবেশী দেশ, এমনকি এয়ার ট্রাভেল বন্ধ করার আগেও চলে আসতে পারে। এই ভ্যারিয়েন্ট ইন্ডিয়াতে বহুদিন আগে ডিটেক্ট হয়েছে, তাই এয়ার ট্রাভেল বন্ধ হওয়ার আগে আসাও অসম্ভব নয়। আর আমাদের এখন কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং হচ্ছে না, তাই পুরোপুরি জানিও না আমাদের দেশে এসছে কিনা।’

কী করতে হবে বাংলাদেশকে

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় অন্তত তিনটি কাজ করতে হবে বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধির কোনও বিকল্প নেই এটা শুরু থেকেই বলে আসা হয়েছে। মাস্ক পরা, হাত ধোয়া এবং ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে, এখন সময় এসছে সাধারণ মানুষকে সরকার বাধ্য করাবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে এটা কেবল কঠিন নয় অসম্ভব বলেও মন্তব্য তাদের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘অক্সিজেন উৎপাদনের কোনও বিকল্প এই মুহূর্তে নেই। অক্সিজেন উৎপাদন করে যেখানে অক্সিজেনের প্রয়োজন হবে সেখানে যেন অক্সিজেন নেওয়া যায় সে ব্যবস্থা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে হবে এবং এর কোনও বিকল্প নেই। মানুষকে কাজে লাগতে হবে। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলা নির্ভর করছে কেবলমাত্র পরিকল্পনার ওপর। পরিকল্পনা করে কাজ করলে হয়তো এটা সামাল দেওয়া যাবে।’

করোনা সংক্রমণ রুখতে রোগীকে আইসোলেশন, রোগীর সংস্পর্শে আসাদের ট্রেসিংয়ের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু এখানে কাজ হচ্ছে না ঠিকমতো।

ভ্যারিয়েন্ট সর্ম্পকে জানায় জিনোম সিকোয়েন্সিং

করোনা ভাইরাসের স্ট্রেইন সর্ম্পকে জানার উপায় জিনোম সিকোয়েন্সিং। বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ করছে। তার মধ্যে অন্যতম চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন।

ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও অনুজীব বিজ্ঞানী ডা. সমীর কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন যখন সিকোয়েন্সিং করে তখন সেটা পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডাটা (GISAID-Global  Initiative on sharing  all influenza  data)তে।

প্রস্তুতি জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে প্রস্তুতি কতটুকু জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘দেশে গ্যাস অক্সিজেনের অভাব নেই। কেবল করোনাকালেই আমদানি করার প্রয়োজন হয়েছিল লিকুইড অক্সিজেন। বর্তমানে যে পরিমাণ রোগী আছে আমরা হিসাব করে দেখেছি, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে রোগী যদি ৭ হাজারের জায়গায় ২১ হাজার হয় তাহলে কিন্তু সংকট হবে। শুধু এই দেশ না, যেকোনও দেশেই সংকট হবে। তবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি যতটুকু রয়েছে সেটা সবারই জানা। রাতারাতি হাসপাতাল নির্মাণ করা চিকিৎসক বানানো যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা স্থাপনা এবং জনবল সবদিক দিয়ে ক্যাপাসিটির সবটুকু ইউটিলাইজ করে ফেলেছি। সবদিকে আমরা পিকে চলে গেছি, পিকে যাওয়ার পরে যদি আরও প্রেশার আসে তাহলে তখন আর আমাদের জন্য লোড নেওয়া সম্ভব হবে না।’

আইইডিসিআর এখনও কিছু জানায়নি

দেশে সরকারিভাবে রোগ নিয়ে কাজ করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আইইডিসিআর কিছু জানিয়েছে কিনা জানতে চাইলে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘আইইডিসিআর এখনও তাদেরকে কিছু জাানায়নি। এখনও কোনও রিপোর্ট আমাদেরকে তারা দেয়নি।’

আর এ বিষয়ে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিনকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।



Leave Your Comments


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর