প্রকাশিত :  ০১:৩৫, ০৪ মে ২০২১

এক ইংরেজ বেদুইন ও আরব বিদ্রোহী - ডাঃ মুস্তাফিজ রহমান

এক ইংরেজ বেদুইন ও আরব বিদ্রোহী - ডাঃ মুস্তাফিজ  রহমান
পাঠক ভাবছেন, ইংরেজ বেদুইন হয় নাকি? হ্যাঁ, ইতিহাসের সেই গল্পটিই আজ আপনাদের বলবো।
দশ বছর আগের আরব-বসন্তের কথা নয়। এক শ’ বছর আগের  প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ের কথা। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের আলাদা আলাদা অনেক দেশ, সেই সময় কোন দেশ হিসাবে পরিচিত ছিল না। বিশাল এক আরব ভুখন্ডের ইউরোপিয়ান নাম লেভান্ট, যার মধ্যে পড়ে এখনকার ইসরাইল, প্যালেস্টাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ইত্যাদি। এই বিশাল অঞ্চল তখন ছিলো তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। ১৯১৫ সনের আগে তুরস্কের মিত্র দেশ ছিল ব্রিটেন (যুক্তরাজ্য)। তুরস্ক জার্মানির সঙ্গে জোট বাঁধলে এই মিত্রতায় ফাটল ধরে। এই সময়, আরবের কোন কোন অঞ্চলে তুরস্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মাথা চাড়া দেয়। এতে ইন্ধন যোগায় ব্রিটেন ।
মক্কা ও হেজাজে (বর্তমান সৌদি আরবে) তুরস্ক নিযুক্ত শাসনকর্তা  বা শরিফ তখন ছিলেন আরব হাশেমী বংশের হুসাইন বিন আলী, যিনি শরিফ হোসেন নামেই পরিচিত ছিলেন। মিশরের ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে শরিফ হোসেনকে কয়েকটি পত্রে, তুরস্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহবান জানানো হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, এই এলাকা থেকে তুরস্কের অটোমানদের সরাতে পারলে, আলেপ্পো (এখনকার সিরিয়ায়) থেকে ইয়েমেনের সমুদ্র তীর পর্যন্ত পুরো আরব এলাকা এক স্বাধীন রাজ্য হবে এবং শরিফ হোসেন সেই বিশাল আরব রাজ্যের  রাজা হবেন। এতে, ব্রিটেন সব সহায়তা দেবে। প্রথম দিকে, এতে আগ্রহ দেখান না শরীফ হোসেন। পরে এক সময়, তুরস্ক তাঁকে সরিয়ে মক্কার শাসনভার অন্য একজনকে দিতে পারে, এই মর্মে এক গুজব শুনে, তিনি ব্রিটেনের প্রস্তাবে রাজী হন। তাঁর সঙ্গে আলোচনার জন্য পাঠানো হয় টি ই লরেন্স নামের এক সামরিক কর্মকর্তাকে। ঠিক হলো, শরিফ হোসেনের তিন পুত্রের দু'জন- প্রিন্স ফয়সল ও প্রিন্স আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে দুটি দল গেরিলা লড়াই শুরু করবে। যুদ্ধের পরামর্শদাতা হবে টি ই লরেন্স। ফয়সালের সঙ্গে থাকে লরেন্স। লরেন্স আরবিতে কথা বলতে পারে, বেদুইনের পোশাক পরে, খাওয়া-দাওয়া ও অন্য সবকিছুতেই বেদুইনের চালচলনে অভ্যস্ত। এই  “ইংরেজ বেদুইন” তাই অতি সহজেই প্রিন্স ফয়সল ও আরব সৈন্যদের ভক্তি ও আস্থার পাত্রে পরিণত হয় ।


হেজাজ রেলওয়েঃ

তুরস্কের অটোমান শাসকেরা একটি নতুন রেল লাইন ও ট্রেন চালু করে ১৯০৮ সনে। দামেস্ক থেকে হেজাজের মদিনা পর্যন্ত ১৩০০ কিলোমিটার রেলপথটি গড়া হয় হজ্ব যাত্রী এবং সৈন্যদের চলাচলের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ এই মরুপথে রেল লাইন খোলার আগে, একমাত্র চলাচল মাধ্যম ছিল উট। রেললাইনটি দামস্ক থেকে এখনকার জর্ডানের উপর দিয়ে হেজাজের মদিনা পর্যন্ত আসে। পরে আরো দূরে মক্কা পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়াতে আর কাজ শুরু হয়নি। আরব বিদ্রোহের সময়ে (১৯১৬-১৮), এই হেজাজ রেলওয়ের বিভিন্ন অংশে গেরিলা পদ্ধতিতে পর পর অনেকগুলো হামলা চালানো হয়। এইসব হামলার পরামর্শদাতা এবং কোন কোন সময়ে সরাসরি অংশগ্রহনে ছিলেন ‘ইংরেজ বেদুইন’ টি  ই  লরেন্স। ফয়সাল, লরেন্স ও তাদের সৈন্যরা ছাড়াও  এইসব হামলায় অংশ নেয় উট ও ক্যারাভান ব্যবসায়ী বেদুইনরা, যাদের যাত্রী ও মালামাল বহনের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় রেললাইন হওয়ার কারনে। প্রিন্স আব্দুল্লাহ হেজাজ এলাকায় আর প্রিন্স ফয়সল এবং লরেন্স উত্তরাংশে (এখনকার জর্ডান এলাকায়) একযোগে গেরিলা আক্রমণ চালাতে থাকে। রেল লাইনের অংশ তুলে ফেলা, বোমা মেরে ট্রেন উড়িয়ে দেওয়া, অটোমান সেনাদের হত্যা, আহত বা বন্দী করা ইত্যাদিতে বিদ্রোহীদের সাফল্য আসতে থাকে।  এদিকে, এই রেললাইন রক্ষা ও মেরামতের জন্য অতিরিক্ত অটোমান সৈন্য এখানে মোতায়েন রাখতে হয়। ফলে, তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষায় দুর্বলতা আসে। বিদ্রোহীদের হাতে বন্দী হওয়া আরব সৈন্যরা  অটোমান সেনাবাহিনী ছেড়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলে আরব বিদ্রোহীদের শক্তি আরো বেড়ে যায়। বিদ্রোহীদের অসামান্য সাফল্য আসে ১৯১৭ সনের জুলাইতে। লোহিত সাগর তীরের  আকাবা তখন ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ  শহর ও সমুদ্র বন্দর। সমুদ্রপথে বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিল অটোমান সেনারা । কিন্তু, ভেতরের দিকের মরুভূমি ও পাহাড় থেকে আচমকা আঘাত হানে লরেন্সের নেতৃত্বে আরব বিদ্রোহীরা। অটোমান সেনাদের পরাজয় এবং আকাবার পতন ঘটে ১৯১৭ সনের ৬ জুলাই।

ব্রিটেনের ডিগবাজি ও দ্বিমুখী আচরণঃ

বিদ্রোহের আগে, ব্রিটেনের দেওয়া প্রস্তাব মতে, অটোমান মুক্ত আরব এলাকা নিয়ে এক বড় দেশ হবে এবং শরীফ হোসেনকে তার রাজা বানানো হবে। এই বিদ্রোহ চলার মধ্যেই, ব্রিটেন অন্য মতলব আঁটতে থাকে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স  এক গোপন চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় যে, আরবের বিভিন্ন অংশ তারা নিজেদের দখলেই রাখবে। সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্কের একাংশ ফ্রান্সের হাতে আর  ইরাক, প্যালেস্টাইন, জর্ডান সহ অন্য অঞ্চলগুলি থাকবে ব্রিটেনের হাতে। এর এক বছর পরেই, ব্রিটেন আর এক অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয় একতরফা ভাবে ও আন্তর্জাতিক কারো সাথে আলোচনা না করেই। ব্রিটিশ বিদেশ মন্ত্রী আর্থার বেলফার (Arthur Balfour Declaration,1917) ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়কে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় যে, প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জাতীয় বাসভুমি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন আছে ।
এদিকে, আকাবা দখলের পরে, ফয়সালের বিদ্রোহী দল ও মিশর থেকে আসা ব্রিটিশ বাহিনীর যৌথ আক্রমণে জেরুজালেম জয় করে ব্রিটেন। ফয়সল ও লরেন্সের দল এর পর জর্ডান অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও জনপদ জয় করে আরো উত্তরে দামেস্ক শহরে প্রবেশ করে । ১৯১৮ সনের ১ অক্টোবর, দামস্ক পতনের মধ্য দিয়েই আরব এলাকায় অটোমান শাসনের অবসান ঘটে। 
ব্রিটেন-ফ্রান্সের গোপন চুক্তির কথা জানাজানি হয়ে গেলে, ব্রিটেনের বিশ্বাসঘাতকতায় অসন্তুষ্ট ও লজ্জিত হয়ে লরেন্স বিদেশের চাকরি ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যায়। প্রিন্স ফয়সাল দামেস্ক দখল করে সিরিয়া সহ অন্য এলাকাকে স্বাধীন রাজ্য এবং নিজেকে তার রাজা বলে ঘোষণা করে, আর প্রিন্স আব্দুল্লাহ  ইরাককে স্বাধীন রাজ্য ও নিজেকে তার রাজা বলে ঘোষণা দেয়। ফ্রান্স ও ব্রিটেন তাতে বাধা দেয় এবং ফ্রান্সের স্থানীয় সৈন্যরা ফয়সালকে দামেস্ক থেকে ক্ষমতাচ্যুত করে ।