img

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী

প্রকাশিত :  ২০:১৭, ২৯ মে ২০২১

কোয়াড সিক্যুরিটি ডায়লগঃ বাংলাদেশকে নিয়ে চীনের মাথাব্যাথা? - ইমরান চৌধুরী
কোয়াডল্যাট্যারাল (চতুর্ভুজাকার) নিরাপত্তা সংলাপ একটা  নতুন অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইন্ডিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে - এই চারটি দেশের কারণে এই সংলাপটির নামের আবির্ভাব। ২০০৭ সালে জাপানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী সেঞ্জে আবে’ প্রথমে এই নতুন উদ্যোগটি নিয়ে অগ্রসর হয় তখনকার আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড এবং ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রমুখদের সহায়তায়। সংলাপটির সাথে সাথে তাঁরা সমান্তরালভাবে শুরু করেন একটি যৌথ সামরিক মহড়া - ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মহড়া - ‘\'মালাবার মহড়া।‘\'
সামরিক মহড়া এবং কূটনৈতিক সংস্থিতির ব্যাপকতা এবং আয়োজনের পরিসর দেখেই বিশেষজ্ঞরা অনুধাবন করেন  যে, এই সকল সংলাপ এবং মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য হল চায়নার সামরিক এবং অর্থনৈতিক পেশী সঞ্চালন রোধ করা। চায়না সরকার  সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি করে সকল সদস্যদেরকে  আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ প্রেরণ করে।
অস্ট্রেলিয়ার জন হাওয়ার্ড এর নেতৃত্ব চলে গেল নতুন সরকার প্রধান কেভিন রুড এই ডায়লগ থেকে দূরে সরে যায় বিভিন্ন কারণে - তারপরেও বাকি তিন দেশ তাদের ডায়লগ চালিয়ে যেতে থাকে এবং ২০১০ সালে রুড সরকার এর পর যখন জুলিয়া গিলার্ড প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পুনরায় পুনরুজ্জীবিত হয় কোয়াড এবং এর ফলশ্রুতিতে ইউ, এস মেরিনরা অস্ট্রেলিয়ার নিকট ডারউইন দ্বীপে অবস্থান গ্রহণ করে যাতে করে মেরিনরা তিমুর সাগর এবং ল্যাম্বক প্রণালিতে নজর রাখতে পারে এবং একই সাথে পুনরায় সেই পুরানো চার দেশে মিলে মালাবার এ নৌ বাহিনীর মহড়া করতে থাকে। 
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও চায়নার হটাৎ বৃদ্ধি প্রাপ্ত সামরিক এবং ব্যাবসায়িক প্রতিপত্তি খর্ব না করলে সামনের দিনগুলোতে অত্র অঞ্চলের সকল ক্ষমতা দখল হয়ে যেতে পারে ভেবে পুনরায় এই সংলাপ আশিয়ান ট্রিটি ভুক্ত দেশ গুলোর সম্মেলনে উৎথাপন করে এবং সংলাপ চালাতে থাকে - যা কিনা চীনকে বেশ ভাবান্বিত করে তুলে - চায়না এই নব্য উদ্যোগ কে ‘\'নতুন কোল্ড ওয়ার‘\' হিসেবে আখ্যায়িত করে। 
চায়না কোন অংশে  কম না সেও সাউথ চায়না সমুদ্র এবং পূর্ব চায়না সমুদ্রে তার পেশি প্রসার করতে থাকে - আশেপাশের দেশগুলোকে সস্তা কিস্তিতে ঋণ দিয়ে ক্রমান্বয়ে ঐ দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলতে থাকে। আর ঐ ফাঁদের বেড়াজালে আস্তে আস্তে সমুদ্র - ব্যবসা - উন্নয়নের নামে চায়না তার প্রভাব বিস্তার করতে থাকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে। এখন সে সম্পূর্ণ ইন্ডিয়ান মহাসাগর - থেকে শুরু করে বে অফ বেঙ্গল রিজিওন কন্ট্রোল নেবার পায়তারা করছে। 
চায়নার এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ভয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনাম ও কোয়াড প্লাস প্লান এ সংযোজিত হতে থাকে, ক্রমে ক্রমে কোয়াড সংলাপ এর ছত্রতলে আরও অনেক গুলো হুমকি প্রাপ্ত দেশ আশ্রয় নিতে থাকে চায়নার এই  নতুন আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির ভয়ে। ইন্ডিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাজ্য সেই ১৯৯১ সালে ইন্ডিয়ার ওপেন হবার সময় থেকেই একে ওপরের সম্পূরক এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে থাকে এবং কোয়াড সংলাপকে আজ অনেক ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা এশিয়ান ন্যাটো হিসেবে দেখতে থাকে। 

অত্র এলাকার নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে চায়নার এই মোড়ল এর পোশাকে আবির্ভূত হওয়া কোন দেশই সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছে না। মার্কিন নব্য প্রেশিডেন্ট এই বার কোভিড ১৯ এর দুর্দশা কে ব্যবহার করতঃ অত্র এলাকার দেশ গুলোর সাথে এক সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলছে যা কিনা আগামীতে এই নতুন সংলাপকে এক নতুন সামরিক - ভূ রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সে পর্যবসিত করতে পারে এবং তার জন্য চায়নার সরকার চায়নার আশেপাশের সকল দেশ উপর এক ধরনের স্নায়ু চাপ বৃদ্ধি করতে থাকে বিভিন্ন পন্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাথে ইন্ডিয়ার ঐতিহাসিক, সংস্কৃতি, অংশীদারি সামাজিক নীতি রীতি দ্বারা সমৃক্ত সেই ৫০০০ বছর যাবত; বাংলাদেশের সবচে’ নিকটতম প্রতিবেশী- যার দ্বারা বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ঘেরা - এবং একই জলরাশি বে অফ বেঙ্গল - এরাবিয়ান সমুদ্র এবং ইন্ডিয়ান ওশান দিয়ে পরিমন্ডলে। স্বভাবত কারণেই বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার সাথে এই নতুন স্নায়ুযুদ্ধের অংশীদার হওয়াটাই স্বাভাবিক । বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিকটতম দেশের নিকটই সংরক্ষিত দুরের এই নব্য  পেশীশক্তির পেশীর নিষ্পেষণে না যাওয়াটাই শ্রেয়। সেই কারণেই হয়ত বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার স্বার্থ এবং বাংলাদেশের ভূমি, সৈকত, জনবলকে নিরাপদ রাখার জন্য এই সংলাপে থাকাটাই সবচে’ বুদ্ধিমান বিবেচনা। 
যদিও এখনও এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি - কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে চায়না খুবি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে - গত কয়েক মাস যাবত যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সামরিক নেতাদের আগমন এবং বাংলাদেশের সামরিক ব্যক্তিবর্গদের বিদেশ ভ্রমন দেখে চায়না ধরে নিয়েছে যে, বাংলাদেশ হয়ত বা এই দলে যোগ দিয়েই ফেললো বুঝি । বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এবং ভারত বাংলাদেশের সবচে পরীক্ষিত বন্ধুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকাটা শ্রেয় , তাহলে অন্যদের এই ব্যাপারে কোন প্রকার নাক গলানোর অবকাশ নাই। কিন্তু, আশ্চর্য হলেও সত্য যে চায়না বাংলাদেশেকে এই সংলাপে না প্রবেশ করার জন্য বেশ তৎপর হয়ে পরেছে। কয়েকটি অতি উচ্চ শ্রেণীর হর্তা কর্তা ব্যক্তিরা অহরহ বাংলাদেশে কূটনৈতিক ভ্রমণ করছে - যাতে করে বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার হাত ধরে - এই উদ্যোগ  এর দিকে পা’  না বাড়ায় । কিন্তু কেন ? কেন এত মাথাব্যথা এবং কেনই বা তাদের এত কুম্ভীরাশ্রু নির্গমন করার দরকার ? যে দেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সকল ধরনের সাহায্য করেছিল - এই সেই বাংলা যেই বাংলার মানুষদের নির্মম ভাবে হত্যা করার জন্য চায়নিজ রাইফেল এর গুলি বানানোর ফ্যাক্টরি ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তড়িঘড়ি করে চালু করেছে - যাহার  পর্দা উন্মোচন করতে তদানীন্তন চায়নিজ ডিফেন্স মিনিস্টার এসেছিল , আজ সেই দেশের জন্য এত ভালবাসা কেন? 
ব্যাবসায়িক সম্পর্ক, অস্ত্র বিক্রি, অর্থ লগ্নি, তাদের বানানো কাঁচামাল ব্যবহার করে আমাদের রফতানি বাণিজ্যে প্রসার এবং আমাদের অবকাঠামো প্রোজেক্টে সফট হারে সুদ দিয়ে সাহায্য করা -এই সব গুলোই ওরা করেছে ওদের স্বার্থে - যার জন্য বাংলাদেশ হয়তো কৃতজ্ঞ এবং সফলতার অংশীদার মনে করে; তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ তাদের একটি ভ্যাসাল স্টেট বা তাবেদার রাষ্ট্র। বর্তমান পৃথিবীতে বাংলাদেশ একটি উদাহারন - বাংলাদেশ একটি রোল মডেল - বাংলাদেশকে অনুকরণ করতে সেই ১৯৭১ বর্বররাও উৎসাহী। বাংলাদেশ আজ সারা পৃথিবীতে সমাদরে সম্ভাষিত তাঁর ফেলা আসা অতীত দারিদ্রতাকে উন্নয়নের সোপানে পরিবর্তনের এবং রূপান্তরের জন্য। 
সম্প্রতি চায়নিজ  পদাতিক সামরিক এবং নৌ সেনাদের পায়তারা - হিমালয়ের চূড়ায় সৈন্য সমাবেশ, মায়ানমার এর সাথে সখ্যতা, বে অফ বেঙ্গল এ নৌসেনা জনিত পেশী সঞ্চালন, ঋণ ফাঁদ পেতে পার্শ্ববর্তী দেশের সমুদ্র বন্দর দখলে নিয়ে নেওয়া, ইন্ডিয়ান ওসোন রিজিওন এবং থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া সহ আশেপাশের সকল দেশের দিকে চাতক পাখির মত তাকানোর কারণে বাংলাদেশের ও শঙ্কা হওয়াটা স্বাভাবিক - এবং এই চাইনিজ সামরিক অক্ষের থেকে তাদের চির পরীক্ষিত বন্ধু জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত এর সাথে হাত  মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আনিত এই সংলাপ থেকে জোট যোগদান করাটা এক ধরনের নিরাপত্তা বীমা। 
আর এতে চাইনিজ অস্ত্র ও ঋণ কূটনীতি দিয়ে ভয় দেখানো বা অহেতুক বাংলাদেশকে নিয়ে মাথাব্যাথা  একান্তই অহেতুক এবং অনভিপ্রেত। 
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে তাঁর সামরিক এবং ভূ রাজনৈতিক পার্টনার খোঁজার স্বাধীনতা একান্তই কাম্য। 

[লেখক একজন বিশ্লেষক এবং ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ]
img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর