প্রকাশিত :  ১৯:১৪, ৩১ মে ২০২১

যেভাবে ছড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর মাদক এলএসডি

যেভাবে ছড়াচ্ছে ভয়ঙ্কর মাদক এলএসডি

ভয়ঙ্কর মাদক লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথাইলামাইড (এলএসডি) ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অনেক স্থানে। ব্যয়বহুল মাদকটির প্রতি ঝুঁকে পড়েছে উচ্চবিত্ত ঘরের তরুণ-তরুণীরা। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশে ভ্রমণ করতে গিয়ে অনেকেই এটি দেশে এনেছে। আবার কেউ কেউ অনলাইন শপিংয়ের মাধ্যমে এনেছে। প্রথমে নিজে আসক্ত হয়ে পরে বন্ধুমহলে ছড়িয়েছে। কেউ কেউ আবার সেবনের পাশাপাশি ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েছে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে এই মাদকটির বিস্তার হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে এটি নতুন মাদক। আশির দশকের পরে এর উপস্থিতি দেশে থাকলেও পরে আর আসেনি।

যদিও মাদক নিয়ন্ত্রণের মূল প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বলছে, দুই বছর আগেই তারা এলএসডিসহ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ‘মৃত্যু রহস্য’ তদন্ত করতে গিয়ে ফের আলোচনায় এসেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুই বছরে দেশে এলএসডি’র ব্যাপক বিস্তার হয়েছে। মাদকসেবী, ব্যবসায়ী ও সরকারি সংস্থাগুলো যখন ফেনসিডিল ও ইয়াবা নিয়ে ব্যস্ত তখন খুব সহজে অপরিচিত এই মাদকটি বিভিন্নমহলে খুব সহজে ঢুকে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে যখন এলএসডি’র মতো ভয়ঙ্কর মাদকটির বিস্তার বহুদূর চলে গেছে তখন কেন সরকারি সংস্থাগুলোর নজরে আসলো।

মাদক নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি দুটি সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, ২০১৯ সালেই তারা এই মাদকটির উপস্থিতি দেশে পেয়েছেন। কয়েকদিন ধরে ফের আলোচনা উঠায় তারা তাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন। মাদকটি নিয়ে কারা কাজ করছে, কোথা থেকে আসছে এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখনই কিছু বিষয় সামনে চলে আসে এবং এলএসডি খুব নীরবে দেশে আনা হয়েছে। যারা এনেছে বা সেবন করেছে এরকম দুটি গ্রুপকে তারা গ্রেপ্তার করেছেন। আর মাদক নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘মানস’ বলছে, ফেনসিডিল ও ইয়াবার আড়ালেই এলএসডি দেশে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও তৎপর হতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক কুসুম দেওয়ান মানবজমিনকে বলেন, আমরা ঢাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি। এই মাদকের উৎসটা কোথায়? কারা এটি নিয়ে আসছে, কাদের কাছে আছে সেই বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এসব বিষয় কনফার্ম হয়ে গেলে আমরা অপারেশনে যাবো।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা ‘মানস’-এর সভাপতি অরূপ রতন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ফেনসিডিলের পরে ইয়াবা এসেছে। এই দুটির ব্যাপকতা দীর্ঘদিন ধরে খুব বেশি ছিল। যার কারণে আরও অনেক মাদক দেশে ঢুকে গেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব বিষয় খেয়াল করেনি। ২০১৯ সালে এলএসডিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ধরা পড়েছিল। ওই শিক্ষার্থী তখন বলেছিল সে কানাডা থেকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন যেটা ধরা পড়েছে সেটি নেদারল্যান্ডস থেকে এসেছে। বাইরে থেকে মাঝেমধ্যেই বিক্ষিপ্তভাবে দেশে আসছে এলএসডি। এটার ভয়াবহতা বেশি হওয়াতে সত্তর দশকের দিকে ইউরোপ- আমেরিকাতে মাদকটি নিষিদ্ধ হয়েছে। মাদকটি সেবন করলে হ্যালুসিনেশন হয়। যারা সেবন করে তারা নানা কিছু দেখতে পায়। মনে হয় বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। গান শুনলেও মনে হয় গানের শব্দগুলো চোখে দেখছে। তখন ওই ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে আত্মঘাতী হয়। এলএসডি’র ভয়াবহতা যেমন বেশি এটার অ্যাকশনও চব্বিশ ঘণ্টার মতো থাকে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত কমিশনার কে এম হাফিজ আক্তার মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে দুটি গ্রুপের সন্ধান পেয়েছি। বাকি গ্রুপগুলোকে ধরার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছি। একটা ঘটনার বহিঃপ্রকাশ যখন ঘটে তখনই নজরে আসে। আর এলএসডিটা খুব বেশিদিন ধরে দেশে আসেনি। আশির দশকের দিকে এটি দেশে ছিল। এরপরে দীর্ঘদিন আর আসেনি। সম্প্রতি কেউ কেউ খুব নীরবে দেশে নিয়ে এসেছে। আমরা যখন খবর পেলাম এলএসডি আবারো দেশে আনা যাচ্ছে তখনই আমরা এটাকে নিয়ে কাজ করা শুরু করেছি।

তিনি বলেন, যে দুটো গ্রুপকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছি তারা অনলাইন শপিংয়ের মাধ্যমে এটি দেশে এনেছে। তবে বিদেশি চক্র জড়িত আছে কিনা এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নাই। এলএসডির সঙ্গে খুব বেশি গ্রুপ জড়িত নেই। কারণ এটা উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানেরা ব্যবহার করে। বিশেষকরে গুলশান-বনানী এলাকায় যারা বাস করে তারাই মূলত এটি সেবন করে ও দেশে নিয়ে আসে। এ ছাড়া  বেসরকারি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এই মাদকের সঙ্গে জড়িত আছে। মফস্বল শহরে এটার অস্বিত্ব এখনো মিলেনি। কারণ এটি অনেক ব্যয়বহুল। এটা যে আইনগত ভাবে অপরাধ সেই বোধটাও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নাই। এটা ব্যবহার করলে তার ৬ থেকে ৭ বছরের জেল হবে এটা যদি কেউ বুঝতে পারে তাহলে এটার সঙ্গে যুক্ত হতে ভয় পাবে। এলএসডি’র সঙ্গে জড়িত আছে এমন সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এদিকে শনিবার রাজধানীর খিলগাঁওসহ আরো কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে এলএসডিসহ গ্রেপ্তার পাঁচজনের প্রত্যেকেরই ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে ডিবির রমনা বিভাগ ধানমণ্ডি ও লালমাটিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে এলএসডিসহ আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারাও তিনদিনের রিমান্ডে আছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছেন। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে দেশে এলএসডি নিয়ে অন্তত ২০টি গ্রুপ কাজ করছে। কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইন শপিং, বিদেশে ভ্রমণ করতে গিয়ে সঙ্গে করে এলএসডি নিয়ে আসছে অনেকে। ব্যয়বহুল হলেও মাদকটিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে ধনী ঘরের সন্তানেরা। বিশেষকরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা এটিতে বেশি আসক্ত। বিশেষকরে ঢাকার অভিজাত এলাকার তরুণ-তরুণীরা বেশি ব্যবহার করে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এলএসডিসেবী ও এই কারবারের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে নজরদারিতে রেখেছেন। 



Leave Your Comments


লাইফ স্টাইল এর আরও খবর