প্রকাশিত :  ১৮:৩২, ০৩ জুন ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ২২:৪৯, ০৩ জুন ২০২১

আনোয়ার শাহজাহান’র ‘সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’ - ফরীদ আহমদ রেজা

গ্র | ন্থা | লো | চ | না

আনোয়ার শাহজাহান’র ‘সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’ - ফরীদ আহমদ রেজা

লেখক, সংবাদিক ও সমাজসেবক এবং বিলাতের সর্বজন পরিচিত এক প্রিয়মুখ আনোয়ার শাহজাহান। তিনি মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক কয়েকটি বই আমাদের উপহার দিয়েছেন, এর মধ্যে ‘সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’ অন্যতম। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে দু খন্ডে সমাপ্ত ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ‘সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ’ "Gallantry Award Recipient Freedom Fighters In Sylhet", ‘ক’জন কৃতিসন্তান’, ‘মধ্যাহ্নের কোলাহল’ (কাব্যগ্রন্থ, সম্পাদনা), ‘সময়ের শ্রেষ্ট ছড়া’ (ছড়া সংকলন, সম্পাদনা), ‘বিলাতের দিনগুলি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘করোনা আতঙ্ক দেশে দেশে’ এবং ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’। শেষোক্ত ‘গোলাপগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থটি বিদগ্ধজনের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি সমাদৃত হয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে এবং ২০১৫ সালে এর পরিমার্জিত ও বর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ বাজারে এসেছে। ‘সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি ২০১৮ সালে অমর একুশ গ্রন্থমেলা উপলক্ষে পান্ডুলিপি প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত হয়। মাত্র ১১১ পৃষ্ঠার মোড়কে সেখানে স্বাধীনতাযুদ্ধের সাথে জড়িত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলার জনগণের জন্য এক সোনালী অধ্যায়। এর সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে এ অঞ্চলের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিজের বলে অহঙ্কার করার মতো একটি দেশের অধিকারী হয়েছে। গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ যে সকল বীর সৈনিকের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতায় সাফল হয়েছে তারা আমাদের গৌরব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস এবং সে ইতিহাস যারা তৈরি করেছেন তাদের ব্যাপারে অবহিত রাখা দেশের সংহতি ও অগ্রগতির আবিশ্যিক উপাদান। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং দেশসেবার অঙ্গীকার সতেজ ও সচল রাখার জন্য রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস যেমন তাদের সামনে বার বার উপস্থাপন করতে হবে, তেমনি জাতীয় বীরদের সংগ্রামী ও প্রেরণাদায়ক জীবন-কাহিনী তাদের শোনাতে হবে। অবশ্য শুধু ইতিহাস রচনার মাধ্যমে এ কাজ সার্থকভাবে সম্পন্ন করা যায় না। রাষ্ট্রনির্মানের পেছনে ঘটে যাওয়া ইতিহাসকে গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা প্রভৃতি মাধ্যম ব্যবহার করেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অব্যাহত ভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ কাজের অংশ হিসেবে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামমুখর জীবন নিয়ে কয়েকটি বই লেখে আনোয়ার শাহজাহান আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন।

কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে সিলেটের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলাদা ভাবে লেখার কারণ কি? না, আনোয়ার শাহজাহান তাঁর দেশপ্রেমকে সিলেটপ্রীতির কাছে কুরবানী দেননি। ইতোপূর্বে তাঁর বাংলাদেশের সকল খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখিত বই ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। এর দু বছর পর ২০১৮ সালে প্রকাশিত হলো ‘সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি। একজন মানুষ পৃথিবীর যে অঞ্চলে বা এলাকায় জন্ম নিয়েছেন সে এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সুখ-দুঃখের কথা বর্ণনা করা আঞ্চলিকতা নয়, বরং এটা সামগ্রিক ভাবে গোটা দেশের জন্য মঙ্গলকর। গ্রাম দিয়ে শহর, শহর দিয়ে জেলা এবং জেলা নিয়ে সমগ্র দেশ। এখানে আঞ্চলিকতার অন্বেষণ তারাই করবে যাদের সামনে দেশের সমাগ্রিক উন্নয়ন ও কল্যাণ অনুপস্থিত।

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের অধিবাসীদের অনন্য অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বার্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। বিশেষ করে লন্ডন-প্রবাসী সিলেটবাসী এবং মুক্তিযোদ্ধের সামরিক নায়ক জেনারেল ওসমানীকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়, যদিও আমাদের কেউ কেউ এমনও আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধ বা বিজয় দেখেছেন কিন্তু ‘ওসমানীকে দেখেননি’। মুক্তিযুদ্ধে সিলেটবাসীর অবদানের কিছু দিক আনোয়ার শাহজাহান তাঁর ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গ্রন্থে তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন। বইটির প্রসঙ্গ কথায় তিনি দাবি করেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা সিলেট অঞ্চলেই হয়েছিল।’ 


উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সিলেটের কৃতিসন্তানরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সিলেট থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকগণ দুটো বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমতঃ সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞ সংগঠক প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রের অভাব সর্বত্রই ছিল। তবে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিনিয়র সামরিক অফিসারের ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চল ছিল সমৃদ্ধ। এ সকল সিনিয়র সামরিক অফিসার সহজেই উপযুক্ত কর্মকৌশল গ্রহণ করে সামরিক ও বেসামরিক লোকদের সংগঠিত করার কাজে এগিয়ে আসেন। দ্বিতীয়তঃ মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়ক জেনারেল ওসমানী ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রাণপুরুষ এবং তিনিও ছিলেন সিলেটের অধিবাসী। (নোটঃ জেনারেল ওসমানীর নিয়োগপত্র লেখা হয় ইংরেজিতে Commander-in-Chief হিসেবে। কমান্ডার ইন চিফ’র  বাংলা কি হবে তা নিয়ে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের মধ্যেই মতপার্থক্য তৈরি হয়। জেনারেল ওসমানীর ভাষ্যমতে সি-ইন-সি মানে সর্বাধিনায়ক এবং তাজউদ্দীন আহমদের মতে এর বাংলা হবে প্রধান সেনাপতি। এ বিরোধের মীমাংসা এখনো হয়নি।) এ জন্যেই সিলেট অঞ্চলে দ্রুতগতিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ২৫ মার্চ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ৪ এপ্রিল বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার তেলিয়াপাড়ায় কর্নেল (পরে জেনারেল) এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে লেফট্যানেন্ট কর্নেল আব্দুর রব, লেফট্যানেন্ট কর্নেল সালেহ উদ্দীন মোহাম্মদ রেজা, মেজর কাজি নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ সেনা অফিসার মিলিত হয়ে সংগঠিত ভাবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য মুক্তিফৌজ বা মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। একই দিনে গোটা দেশকে ৪টি অঞ্চলে ভাগ করে অঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে মেজর কে এম সফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ ঐতিহাসিক ঘটনা তেলিয়াপাড়া ডকুমেন্ট হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

অস্থায়ী মুজিব নগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য যাদের বিভিন্ন দায়িত্বে  নিয়োগ করেন তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গ্রন্থের লেখক আমাদের প্রদান করেছেন। তাদের মধ্যে মধ্যে রয়েছেন খাগাউড়া, বানিয়াচং আসনের এমএনএ কর্নেল এমএ রব (প্রথমে উপদেষ্টা এবং পরে চীফ অব আর্মি স্টাফ), কর্নেল এ আর চৌধুরী (সহকারী চিফ অব স্টাফ), ৪ নম্বর সেক্টর কমাণ্ডার মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ), চিফ অব স্টাফ দফতরের স্টাফ অফিসার মেজর আব্দুল ফাত্তাহ চৌধুরী ( বিয়ানীবাজার, সিলেট), মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী (শিওর খাল, বালাগঞ্জ), ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ((ছত্রিশ, গোলাপগঞ্জ), ক্যাপ্টেন এজাজ আহমদ চৌধুরী (ফুলবাড়ি, গোলাপগঞ্জ), কর্নেল এম এম কে জেড জালালাবাদী, মেজর জেনারেল হারুন আহমদ চৌধুরী (চারখাই, বিয়ানী বাজার), লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিরঞ্জন ভট্টাচার্য, লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাহের উদ্দীন আখঞ্জি, ক্যাপ্টেন এম এ মোতালিব, সৈয়দ মঈন উদ্দীন আহমদ (নিজামপুর, হবিগঞ্জ), লেফটেন্যান্ট এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী ( বরইকান্দি, দক্ষিণ সুরমা), লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামান (বিয়ানীবাজার), লেফটেন্যান্ট শমসের মবিন চৌধুরী (ভাদেশ্বর, গোলাপগঞ্জ) প্রমুখ।

আলোচ্য গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে লেখক ছয়জন বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার জীবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা হচ্ছেন মোহাম্মদ আব্দুর রব, চিত্তরঞ্জন দত্ত, হারুন আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, আফতাব আলী এবং শফিক উদ্দিন চৌধুরী। 

মোহাম্মদ আব্দুর রব ১৯১৯ সালে বানিাচং উপজেলার খাগাউড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ-নবিগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমএনএ হিসেবে নির্বাচিত হন। মোহাম্মদ আব্দুর রব চিরকুমার ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ইন্তেকাল করেন। 

চিত্তরঞ্জন দত্ত, সংক্ষেপে সি আর দত্ত ১৯২৭ সালে আসামের শিলচরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। ৭১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মেজর দত্ত সে সময় রশিদপুর চা বাগানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। ৪ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বশীল হিসেবে তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ সৈনিক এবং ৯ শ গণযোদ্ধা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে কানাইঘাটের যুদ্ধ, আটগ্রামের যুদ্ধ, নানদুয়ার যুদ্ধ, শমসের নগর যুদ্ধ প্রভৃতি।   

হারুন আহমেদ চৌধুরী সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ৭১ সালে তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি বুলেটবিদ্ধ হলে তাকে চিকিৎসার জন্য মিয়ানমারে পাঠানো হয়। চিকিৎসা শেষে তিনি ১ নম্বর সেক্টরে যোগ দিয়ে আবার মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ছত্রিশ গ্রামের সন্তান। পাক-বাহিনী যখন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে তখন তিনি রেজিমেন্টের এডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যান্য এলাকার পাশাপাশি তিনি সিলেট শহরের আশপাশেও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। কালিঘাট চা-বাগানের যুদ্ধে তিনি মারাত্মক ভাবে আহত হন।

আফতাব আলী সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৭১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। এ রেজিমেন্ট তখন রংপুরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। সেখান থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একবার সম্মূখ সমরে তাঁর শরীরে চারটি বুলেট লাগে। সুস্থ হয়ে তিনি পুনরায় যুদ্ধে ফিরে যান এবং বীর বিক্রমে লড়াই অব্যাহত রাখেন। ২০১৭ সালে আফতাব আলী ইন্তেকাল করেন। 

শফিক উদ্দিন চৌধুরী গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ইপিআর-এ যোগদান করেন। ৭১ সালে তিনি চুয়াডাঙ্গার কালিগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। যশোর, রঝিনেদা, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা প্রভৃতি এলাকায় তিনি লড়াই করেন। যশোহরের বালিডাঙ্গা এলাকায় ১৬ সেপ্টেম্বর ৪ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত এক রত্তক্ষয়ী অসম যুদ্ধে তিনি শাহাদত বরণ করেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসেছে ১৮ জন বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্তদের কথা। তাঁরা হচ্ছেন মইনুল হোসেন চৌধুরী (বালাগঞ্জ, শিওরখাল), এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (দক্ষিণসুরমা, বরইকান্দি), ইমাম-উজ-জামান (সিলেট বিয়ানীবাজার), শমসের মবিন চৌধুরী (গোলাপগঞ্জ, ভাদেশ্বর), আব্দুল মালেক চৌধুরী (মৌলবী বাজার, ত্রৈলক্ষ বিজয়), মো: তাহের আলী (গোলাপগঞ্জ, কিসমত মাইজভাগ), আব্দুর রহমান আজাদ (হবিগঞ্জ, মাধবপুর, বড়ধলিয়া), আব্দুল হক (চুনারুঘাট, শাহপুর), আব্দুল খালেক (চুনারুঘাট, খৈগাঁও), রমিজ উদ্দিন (হবিগঞ্জ, জগন্নাথপুর), ফখরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী (গালাপগঞ্জ, বারকোট), জুম্মা মিয়া (গোলাপগঞ্জ, হেতিমগঞ্জ), আরব আলী (দক্ষিণসুরমা, লতিফ পুর), তৌহিদ আলী (গোলাপগঞ্জ, মুকিতলা), নীলমণি সরকার (সিলেট সদর, পালপুর), জগৎজ্যোতি দাস (হবিগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, ইছবপুর), ইয়ামিন চৌধুরী (গোলপগঞ্জ, রণকেলি) এবং তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (বিয়ানীবাজার, নাটেশ্বর)।

তৃতীয় অধায়কে লেখক সাজিয়েছেন ২২ জন বীরপ্রতিককে নিয়ে। তারা হলেন মোহাম্মদ আব্দুল মতিন (মৌলবীবাজার, রসুলপুর), সৈয়দ মঈন উদ্দীন আহমদ (হবিগঞ্জ, ফকিরাবাদ), রাসিব আলী (ফেঞ্চুগঞ্জ, বাদেদেউলি), আব্দুল কুদ্দুস (চুনারুঘাট, গোগাউড়া), রফিকুল ইসলাম (শ্রীমঙ্গল, হুগলিয়া), গোলাম মোস্তফা (সিলেট সদর, কালারুখা), মকবুল আলী (ফেঞ্চুগঞ্জ, ছত্রিশ), ফজলুল হক (জকিগঞ্জ, খাদিমান), আব্দুল ওয়াহিদ (দক্ষিণ সুরমা,বরইকান্দি) , শফিক উদ্দিন আহমদ (বড়লেখা, বর্ণি), আব্দুল মালেক (গোলাপগঞ্জ, নগর), রশিদ আলী (ফেঞ্চুগঞ্জ, মাইজগাঁও), নান্নু মিয়া (গোলাপগঞ্জ, দাড়িপাতন), মোহাম্মদ আব্দুস সালাম (গোলাপগঞ্জ, বরায়া), মাহবুবুর রব সাদী (হবিগঞ্জ, নবিগঞ্জ, বনগাঁও), নূরউদ্দিন আহমেদ (নবিগঞ্জ, সাতাইহাল), সিরাজুল ইসলাম (বিশ্বনাথ, আগ্নাপাড়া), মো. আব্দুল মজিদ (সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা), ফখরুদ্দীন চৌধুরী (গোলাপগঞ্জ, ফুলবাড়ি), এম এ হালিম (সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা), এনামুল হক চৌধুরী (বালাগঞ্জ, সুলতানপুর) এবং মো. ইদ্রিস আলী (সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজার, বড়খাল)। 

বইয়ের ৬৭ পৃষ্ঠা থেকে ১০৮ পৃষ্ঠা ব্যাপী বিস্তৃত পরিশিষ্টে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। রয়েছে। এর শিরোনামগুলো হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধের বীর নায়ক এম এ জি ওসমানী’, সংকেতের বিশ্লেষণ ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরসমূহ, খেতাবপ্রাপ্ত বীর শ্রেষ্ট, বীর-উত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতিকদের তালিকা (সমগ্র বাংলাদেশ), যাঁরা দুটি করে খেতাব পেয়েছেন, সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আলোকচিত্র, সহায়কগ্রন্থ, পত্রিকা, এবং স্মারকগ্রন্থ।  

আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

লন্ডন ৩০ মে ২০২১

লেখকঃ কবি ও শিক্ষাবিদ, প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক সুরমা



Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর