প্রকাশিত :  ০০:৪২, ১০ জুন ২০২১

সুটা ও মেলিল্লা: মুসলিম উত্তর অফ্রিকায় অবশিষ্ট দুই ইউরোপীয় ভূখন্ড

সুটা ও মেলিল্লা: মুসলিম উত্তর অফ্রিকায় অবশিষ্ট দুই ইউরোপীয় ভূখন্ড

বাকি বিশ্ব জানে সুটা এবং মেলিল্লা উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দুই সার্বভৌম ভূখন্ড। কিন্তু মরক্কোর কাছে ‘সেবতাহ এবং মেলাইলাহ’ তাদের জায়গা যা স্পেন কয়েকশ বছর ধরে জবরদখল করে রেখেছে। আফ্রিকার মুল ভূখন্ডে এখনও ইউরোপের অবশিষ্ট এই দুটো এলাকার রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনই মরক্কো স্বীকার করেনি।

শুধু সুটা এবং মেলিল্লাই নয়, ভূমধ্যসাগরের জিব্রালটার প্রণালির ভেতর আরো ছোটে ছোট চারটি ভূখণ্ডের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য মরক্কো স্পেনের কাছে দাবি করে আসছে। জায়গা নিয়ে ঐতিহাসিক এই বিবাদের দিকে নতুন করে দৃষ্টি পড়ে যখন গত মাসে মরক্কো থেকে একদিনে আট হাজার মানুষ সীমান্ত ডিঙ্গিয়ে সুটা এবং মেলিল্লায় ঢুকে পড়ে। 

অবৈধ এই অভিবাসীদের সিংহভাগই ছিল মরক্কোর নাগরিক। অনুপ্রবেশের সময় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা তাদের আটকানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। ঐ ঘটনা রাতারাতি স্পেন এবং মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। স্পেন সাথে সাথেই ঐ দুই ভূখন্ডে বাড়তি সৈন্য পাঠায়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ ঘটনাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মরক্কোর মধ্যে ‘নজিরবিহীন সংকট বলে’ বর্ণনা করেন। 

অন্যদিকে মরক্কোতে শুরু হয় স্পেন-বিরোধী পাল্টা প্রচারণা। টুইটারে এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়া প্লাটফর্মে হাজার হাজার মানুষ স্লোগান তোলে - ‘সুটা এবং মেলিল্লা স্পেন নয়,’ ‘ উপনিবেশবাদ নিপাত যাক।’ 

‘ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের উপযুক্ত নমুনা’

ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয় যে সুটাতে হাজার হাজার অভিবাসী ঢুকে পড়ার সময় ইচ্ছে করেই মরক্কোর সীমান্ত-রক্ষীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে ছিল। 

কেন তারা এমন করলো তার কারণও বেরিয়ে পড়তে শুরু করে। ওয়েস্টার্ন সাহারা অঞ্চলে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে পলিসারিও ফ্রন্ট নামে যে গেরিলা গোষ্ঠী তাদের নেতা ব্রাহিম ঘালিকে স্পেনে আমন্ত্রণ জানানোর একটি ঘটনা যে তারা পছন্দ করেনি মরক্কো সেই বার্তা দিতে চেয়েছিল। 

অন্য অনেক দেশের মত স্পেনও কখনই ওয়েস্টার্ন সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেনি। তবে আফ্রিকায় মরক্কোর লাগোয়া এই স্পেনের এই দুই শহরের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঝগড়া মাঝে মধ্যেই ফুঁসে ওঠে। বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে।

আপাতদৃষ্টিতে এই দুই এলাকার ওপর মরক্কোর মালিকানা দাবিকে যৌক্তিক মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই ভূখন্ড দুটো আফ্রিকায়। কিন্তু এগুলোর ওপর যাদের মালিকানা সেই স্পেনের অবস্থান ইউরোপে।

সেই বিচারে সুটা এবং মেলিল্লার ওপর স্পেনের মালিকানা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের আদর্শ একটি নমুনা। এবং জমির মালিকানা নিয়ে অন্য সব বিরোধের মত এখানেও রয়েছে ইতিহাস, আবেগ আর অহংকার। 

মুসলিম ‘অপমানের’ ইতিহাস

ইতিহাসে রয়েছে যে ৮ম শতাব্দীতে ইউরোপের ইবেরিয়ান উপদ্বীপ অর্থাৎ স্পেন ও পর্তুগাল দখলে মুসলিম মূর সম্রাটদের অভিযান শুরু হয়েছিল সুটা থেকে। ইউরোপে মুসলমানদের সেই সাম্রাজ্য টিকে ছিল ৮০০ বছর। পরে খ্রিস্টানরা ইউরোপ থেকে মূর মুসলিমদের বিতাড়িত করার পর পর্যায়ক্রমে সুটা এবং মেলিল্লা দখল করে নেয় স্পেন। 

পঞ্চদশ শতাব্দিতে স্পেন যখন ভূমধ্যসাগরের অন্য তীরে মেলিল্লা কব্জা করে, ঠিক একই সময়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছান যে ঘটনার ভেতর দিয়ে শুরু হয় উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেন এবং ইউরোপীয়দের উপনিবেশবাদী শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস। 

মেলিল্লা দখলের প্রায় দুশ বছর পর সপ্তদশ শতাব্দীতে সুটাও দখলে নেয় স্পেন। 

১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে মরক্কো স্বাধীনতা পেলেও সুটা এবং মেলিল্লার নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি স্পেন। মরক্কো এবং আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের শত চেষ্টাও কাজে আসেনি। মুসলমানদের কাছে সুটা এবং মেলিল্লা ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তির কাছে তাদের পরাজয় এবং অপমানের স্মৃতি-চিহ্ন। আরবরা, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম আরবরা মনে করে সুটা এবং মেলিল্লা মুসলমানদের জায়গা, তা সে যতদিন ধরেই অন্যের দখলে থাকুক না কেন। 

মরক্কোর একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, “পুরনো সেই ক্ষত এখনো সারেনি এবং তা সারবেও না যতদিন না ঐ দুই ভূখন্ড আবারো মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে।” এমনকি আরবি উইকিপিডিয়ায় এই দুই শহরের পরিচিতি লেখা হয়েছে হয়েছে - স্পেন নিয়ন্ত্রিত মরক্কোর শহর ।  তবে ওয়েস্টার্ন সাহারায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে মরক্কো যেভাবে মরিয়া আচরণ করে, সুটা এবং মেলিল্লার বিষয়ে নিয়ে তা তারা কখনই করেনি। জাতিসংঘে গিয়ে দেন-দরবার করেছে, কিন্তু তাতে তেমন সুবিধা হয়নি। 

মরক্কোর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সামির বেনিস বলেন, ফ্রান্সের কাছে থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর মরক্কো ভেবেছিল সুটা এবং মেলিল্লার মালিকানার বিষয়টি আপোষেই সুরাহা হয়ে যাবে। কিন্তু স্পেন কখনই নমনীয় হয়নি। 

১৯৬৩ সালের ৬ জুলাই মরক্কোর প্রয়াত বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান এবং স্পেনের তৎকালীন শাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কো মাদ্রিদের বিমানবন্দরে ভূখন্ড নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ নিয়ে এক বৈঠক করেন। কিন্তু সুটা এবং মেলিল্লা নিয়ে কোনো অগ্রগতি তখন হয়নি। “অন্য অঞ্চলগুলো নিয়ে বিরোধের আওতা থেকে সুটা এবং মেলিল্লাকে আপাতত বাইরে রাখতে রাজী হয়েছিলেন মরক্কোর বাদশাহ,” বলেন মি বেনিস।  পরে মরক্কো অভিযোগ নিয়ে হাজির ‘ফোর্থ কমিটি’ নামে জাতিসংঘের একটি বিশেষ কমিটির কাছে, যেটি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উপনিবেশবাদ নিয়ে কাজ করছিল। 

কিন্তু স্পেন কখনই এই দুই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনোরকম আপোষ-মীমাংসায় রাজী হয়নি। তাদের কথা - এই দুই শহর ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং এগুলো স্পেন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।  কিন্তু মি বেনিস মনে করেন স্পেনের এই দাবির ঐতিহাসিক এবং আইনগত ভিত্তি নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, “রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিবেচনায় ইতিহাসের সিংহভাগ সময় এই দুই শহর সঠিক অর্থে পুরোপুরি স্প্যানিশ ভূখন্ড ছিলনা।”

যুক্তি হিসাবে মি বেনিস বলেন, এই দুই ভূখন্ডকে একসময় সামরিক ঘাঁটি এবং “উন্মুক্ত” কারাগার হিসাবে ব্যবহার করেছে। স্পেনের মূল ভূখন্ড থেকে দাগী অপরাধীদের এখানে এনে আটকে রাখা হতো।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে? 

“আন্তর্জাতিক আইনে সুটা এবং মেলিল্লার ওপর মরক্কোর মালিকানার দাবি ধোপে টিকবে না। কয়েকশ বছর ধরে এ দুটো জায়গা স্পেনের নিয়ন্ত্রণে। জায়গা দুটোর বাস্তবতা বদলের জন্য মরক্কোর সামনে বিস্তর আইনি এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে,” লিখেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জেমি ত্রিনিদাদ। 

তিনি বলেন, “সুটা এবং মেলিল্লার অধিবাসীরা স্পেনের নাগরিক হয়ে থাকতে চান। ফলে, বর্তমান বিশ্বে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সেখানে মরক্কোর সার্বভৌমত্ব কায়েম করা প্রায় অসম্ভব।”

“পরিস্থিতি যদি কখনও এমন হয় যে ঐ দুই ভূখন্ডের দখল ধরে রাখতে সাময়িকভাবে স্পেন মরক্কোর সাথে টক্কর দিতে অপারগ হয়ে পড়লো, তখন এই দুই শহরের বাসিন্দারা কোন পথে যাবেন? তারা কি মরক্কোর নাগরিকত্ব নেবেন নাকি ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েই থাকতে চাইবেন? 

তেমন কোনো প্রশ্নের উত্তর অনুমান করা কঠিন।




Leave Your Comments


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর