প্রকাশিত :  ০১:২৬, ২৪ জুন ২০২১

প্রবাসীদের পাসপোর্টকেই পরিচয় পত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক

প্রবাসীদের পাসপোর্টকেই পরিচয় পত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক

গত ১৪ই জুন সোমবার বাংলাদেশে হাইকোর্টের নতুন রুলে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয় পত্র ছাড়া আদালত ও থানায় মামলা গ্রহণ করা হবেনা। এই খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথেই প্রবাসে বিশেষ করে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের মধ্যে শুরু হয়েছে বিভিন্ন ধরণের কথাবার্তা। যেখানেই যাওয়া যায় সেখানেই একই আলোচনা, একই প্রশ্ন আমরা যারা প্রবাসে আছি আমাদের কি হবে? আমাদের পরিচয় পত্র কি? আমাদের অনেকের পুরো পরিবার বাংলাদেশে আছেন তার উপর ভিত্তি করে দেশে আমরা জায়গা জমিন, দোকানপাট সহ বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্য করছি। এসব জায়গা জমিন বা ব্যবসা নিয়ে অনেকেরই মামলা মোকদ্দমাও কোর্টে আছে আবার নতুন করেও হচ্ছে। এ সবের মোকাবিলা করতে গেলেই কোর্টের রায় অনুযায়ী পরিচয় পত্র প্রয়োজন। আমরা এই পরিচয় পত্র পাবো কোথায়? বৃটেনে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ প্রবাসীদের এই আর্তনাদ আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। শুধু বৃটেনের প্রবাসীরাই নয়, এই আইনের আওতায় বিশ্বের সকল প্রবাসীরাও। 

হাইকোর্টের এই জারী করা রুলকে আমি স্বাগত জানাই, এই আইন দেশের জন্য খুবই জরুরী। কেননা, দেশে জায়গা জমিন নিয়ে যে অরাজকতা শুরু হয়েছে, তা বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আর কোন গত্যান্তর ছিলোনা। আমার বিশ্বাস, হাইকোর্টের এই রুল জারীর ফলে, “জোর যার মুল্লুক তার” এই প্রবণতা থেকে দেশের শান্তশিষ্ট নিরীহ মানুষ এদের হাত থেকে মুক্তি পাবে। জায়গা জমি কেনা বেচা করতে গেলেও হয়রানীর শিকার হবেন না। বিশেষ করে প্রবাসীরা দেশে গেলে তাদের হয়রানী করার জন্য একদল লোক আছে, যারা তাদেরকে প্যাচের মধ্যে ফেলে অর্থাৎ মিথ্যা মামলা করা, জোর করে প্রবাসীদের জায়গা দখল করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে নানান ধরণের হুমকি ধুমকি দেয়া। আমার বিশ্বাস এই রুল জারীর ফলে তা কিছুটা কমে আসবে। 

বাংলাদেশের মানুষের শান্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করার নিশ্চয়তাদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার যে আইন পাশ অথবা যে কোন রুলই কোর্ট থেকে জারী করা হোক না কেন প্রবাসীরা তাতে খুশী হন। কারণ, প্রবাসীদের নারি বাংলাদেশের মাটিতেই গেড়ে আছে। আমাদের সবারই যাদের মা বাবা বেঁচে আছে অনেকেই দেশের আছেন, আছেন ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন সবাই। আমারা এদেশে থাকলেও আমাদের মনপ্রাণ বাংলাদেশের মাটিতেই গাঁথা। এদেশে টাকা রোজগার করতে এসে আমরা যে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে রোজগরের কোটি কোটি টাকা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছি তা দিয়ে তো শুধু আমাদের পরিবার আত্মীয় স্বজনই নয়, পুরো বাংলাদেশই চলছে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সোজা কথায় বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের যে ইনকাম আছে তার সিংহ ভাগই প্রবাসীদের পাঠানো টাকা। আজ দেশে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, বিশ্বের বুকে আমাদের দেশ উন্নত দেশগুলোর সাথে টেক্কা দিতে শুরু করেছে সেই গর্বের সাথে প্রবাসীদের ঘামে ঝরা রোজগারের টাকাও জড়িত, তাই এই গর্বে প্রবাসীরাও অংশীদার এ কথা সরকারকে মনে রাখতে হবে। 


এতো গেলো বর্তমানের কথা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে প্রবাসীরা বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশীরা যে যেখানেই ছিলেন যেমন ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশীরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করেছেন। তারা বাংলাদেশীদের ঘরে ঘরে গিয়ে টাকা তুলেছেন, রেষ্টুরেন্টে রেস্টুরেন্টে গিয়ে টাকা তুলেছেন এবং এই টাকাগুলো (পাউন্ড) তখনকার সময়ে লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট জনাব আবু সাঈদ চৌধুরীর হাতে তুলে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধাদের সাহায্য করা এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে ্আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের ভরণ পোষনের জন্য।  এমন কি বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো তখন প্রবাসীদের টাকা দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ শুরু হয়। সংক্ষেপে এগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য প্রবাসীদের ইতিহাস। সুতরাং আমি বলতে চাই, প্রবাসীদের অবজ্ঞা না করে বরং তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, দেশে যে কোন আইন প্রণয়ন করার সময় প্রবাসীদের কথাটাও চিন্তায় রাখতে হবে, যাতে দেশে আসলে তাদেরও কোন অসুবিধার সম্মুখীন হতে না হয়। 

বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। যার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী। যিনি শত্রুপক্ষের অনেক চোখ রাঙ্গানো, হুমকি ধুমকি, মৃত্যু ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।  আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন এর ভাষায়” তলাবিহীন ঝুড়ি” থেকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে একটি রোল মডেল দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। জানিনা নিক্সন সাহেব আজ বেঁচে থাকলে কি বলতেন? 

অতি সংক্ষেপে আমি বংলাদেশে প্রবাসীদের অবদান সম্পর্কে কিছু আলোচনা করলাম এ জন্য যে, গত ১৪ই মে বাংলাদেশের হাইকোর্ট যে রুল জারী করেছেন সেখানে প্রবাসীদের কথাটি উহ্য রয়েছে। যার ফলে প্রবাসীদের মধ্যে দারুন উৎকন্ঠা, অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

 তারা ভাবছেন, বাংলাদেশে তাদের জায়গা জমিন বা ব্যবসাপাতির কি হবে? প্রবাসীদের এই অসন্তোষ দূর করার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা হাইকোর্টের এই রায় পূনর্বিবেচনার দাবী জানিয়েছেন। প্রবাসীদের এই উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে গত ১৮ই জুন এনআরবি’র পক্ষ থেকে লন্ডন্থ বাংলাদেশের হাই কমিশনার জনাব জুলকার নাইনের কাছে এক স্মারক লিপি হস্তান্তর করা হয়। এই হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রতিনিধি আহাদ চৌধুরী বাবু, জুয়েল রাজ, শাহ বেলাল, আনসার আহমদ উল্লাহ, জামাল খান, আ স ম মাসুম।  

প্রবাসীরা দেশে গিয়ে যখন জায়গা জমি সংক্রান্ত বা অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে আদালত বা থানার মুখাপেক্ষী হবেন তখন তাদের পরিচয় পত্র কোনটা হবে? পাসপোর্ট নাকি বাংলাদেশে তৈরী করা পরিচয় পত্র? প্রবাসীরা মনে করেন, শুধু মাত্র বৃটেনেই বসবাসরত প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের জন্য পরিচয় পত্র তৈরী করা এক দিকে যেমন ব্যয় সাপেক্ষ অন্যদিকে তাদের মধ্যে সরবরাহ করাও দুরুহ ব্যাপার। সুতরাং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের পরিচয় পত্র প্রদান করা একেবারেই অসম্ভব। অতএব সরকারের উচিৎ, প্রবাসীদের পরিচয় পত্র প্রদান করার অযৌক্তিক চিন্তা না করে বরং তাদের পাসপোর্টকেই পরিচয় পত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।



Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর