প্রকাশিত :  ০১:২৭, ২৪ জুন ২০২১

বাংলাদেশে জেনোসাইড ১৯৭১ - বিচার হতে হবে একদিন!

বাংলাদেশে জেনোসাইড ১৯৭১ - বিচার হতে হবে একদিন!

||ইমরান চৌধুরী||

জেনোসাইড এই শব্দটি প্রথম আবির্ভূত হয় রাফায়েল লেমপকিন নামক একজন পোল্যান্ড এর আইনজীবীর মুখ থেকে - প্রাচীন গ্রীক শব্দ ‘জেনোস’ (Ge’nos) এর অর্থ হচ্ছে জনগণ বা জনগোষ্ঠী  বা রেস (জাতি) এবং ল্যাটিন শব্দ ‘সে’ডারে (caedere, ‘to kill’) থেকে মিলিয়ে ‘জেনোসাইড’ শব্দটির উৎপত্তি। এর মানে হল ‘জাতিহত্যা’।

১৯৭১ সালে নয় মাসে সংঘটিত সেই হত্যাযজ্ঞ কী এর কোন ব্যাতিক্রম ছিল? সেই প্রাচীন যুগ থেকে অদ্যাবদি যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটেছে এই ধরনের গণহত্যা। লেম্পকিন এর এই নামকরণ এবং এর পরবর্তী আইন প্রণয়ন নিয়ে এসেছিল এক নতুন আলো গণহত্যার বিচার সম্পাদন করতে - তারই হাত ধরে নাৎসি বাহিনীর বিচার হয়েছিল, যা নুরেম্বারগ এর বিচার হিসেবে আজ সারা বিশ্বে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ পরবর্তী কালের ওটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্যতম বিচারকার্য - যা পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিগনিত হয়েছে। 

কিন্তু বিংশ শতাব্দটিতে যা ঘটেছিলো আমাদের দেশে তা নজিরবিহীন । ৫৫ হাজার বর্গমাইল জায়গা জুড়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে একটা এঙ্ক্যাম্পমেন্ট (শিবির এর মধ্যে বন্দী করে রাখা) করে ফেলেছিল সেই বর্বর পাকিস্তানি মুসলিম আর্মি এবং ওদের দোসর দালালরা মিলিতভাবে। ৬৪ হাজার গ্রামের মাঝে প্রায় ৪৫ হাজার গ্রামে ওরা পদার্পণ করেছিল। বাঙ্গালী রেস (জনগোষ্ঠী) কে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসেই চালিত হয়েছিল এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ। চিরতরে বন্ধ করতে চেয়েছিল ঐ পাষন্ডরা বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধ এবং বাঙ্গালীর স্বাধিকার আদায়ের দাবি। কিন্তু কেন? আজও সেই প্রশ্ন বারংবার উঁকি মেরে উঠে কোটি কোটি বাঙ্গালীর মনের আঙ্গিনায়। পাঞ্জাবি মুসলিম পাকিস্তানি আর্মির রোষের প্রধান কারনই ছিল এক ধরনের বর্ণবাদ (রেসিইজম) ওদের সাথে হাত মিলিয়ে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগই ছিল আমাদের নিজেদের বানানো ফাঁদে পা দেয়া। ওদের কাছে বাঙ্গালীরা সবাই ছিল নামে মুসলমান -  যা কিনা ওদের দেশের পত্রিকার বিজ্ঞাপনে প্রতীয়মান - ১৯৭১ সালের পশ্চিম পাকিস্তানি পত্রিকায় জেহাদের বিজ্ঞাপন দিয়ে সৈন্য রিক্রুট করার প্রয়াসই প্রমাণ করে আমাদের প্রতি ওরা বর্ণবাদ মনোভাব পোষণ করতো। ওদের নিকট -  বাঙ্গালী কালো, বেঁটে, বাঙ্গালী মাছ খায়, গায়ে মাছের গন্ধ করে, বাঙ্গালীরা ভাল এবং সাহসী সৈন্য  বা সৈনিক হতে পারে না - এই সব গুলোই বর্ণবাদের মাপকাঠি হিসেবে প্রকাশ্যে দিবালোকের মত পরিষ্কার । 


পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বড় গণহত্যা আর কোথাও হয়েছে বলে এর কোন নজির নেই - কি দোষ ছিল আমাদের ১৯৭১ সালে? আমরাতো পাকিস্তানী পাঞ্জাবি মুসলিম সেনাবাহিনীর দ্বারা পরাজিত কোন রাজ্য ছিলাম না! আমরা ছিলাম ওদের এবং আমাদের প্রচেষ্টায় বানানো একটি দেশের অংশীদার। কিন্তু, কে দিয়েছিল ঐ পাপিষ্ঠদের এত বড় সাহসÑ যেই সাহসের বলে ওরা আমাদেরকে এত ব্যাপকভাবে অপমানিত করল? আমাদের রেস, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ এবং সর্বপরি আমাদের মা এবং বোনদের ইজ্জতকে এভাবে লুণ্ঠন করার সাহস ওরা পেলো কোথা থেকে? ওদের তল্পিবাহক দালাল এবং অন্যান্য মতবাদী কিভাবে সহায়তা করেছিল ওদের বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসের ঐ ক্রান্তিলগ্নে? এর জবাব আজও বাঙ্গালী জাতি পেল না। 

১৯৭১ থেকে ২০২১ বাংলার নদ নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল - ওদের নিগৃহীত সেই বাংলা আজ ওদের ঈর্ষার কারন, যাদেরকে ওরা একদিন অপমান করেছিল আজ তাদেরই উন্নয়নের মডেল ওরা অনুকরণ করতে করজোড়ে অনুরোধ করে প্রকাশ্য দিবালোকে - যেই নারীদের ইজ্জত - সম্ভ্রম যারা লুটেছিল আজ সেই নারীকুল ওদের জন্য ঈর্ষার উদ্রেক করে - নারী উন্নয়নের শিখরে দাঁড়িয়ে আছে বীরের মাতৃকুল হিসেবে। 

কিন্তু , ১৯৭১ এর সেই লজ্জা, ১৯৭১ এর সেই বর্বরতা, ১৯৭১  এর সেই অপমান, ১৯৭১ এর সেই ব্যাভিচার, ১৯৭১ এর সেই গণহত্যা, ১৯৭১ এর  সেই সম্পদ লুণ্ঠন, ১৯৭১  আর সেই অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, ১৯৭১ সেই অত্যাচার কি বাঙ্গালী জাতি ভুলে গেছে ? 

১৯৭১ বাঙ্গালী জাতির জীবনের এক বিভীষিকা যা’ মনের পর্দায় সেলুলয়েডের মত উদ্ভাসিত হয় প্রতিনিয়ত। এই অপমানের একটা সুরাহা আজ সময়ের দাবী । 

বাংলাদেশের এমন কোন পরিবার নেই যারা ১৯৭১ এর সেই বিষাক্ত রোষানলে পুড়েনি - তাই বার বার মনের ঈশান কোনে জেগে উঠে সেই দাবী - কবে হবে ঐ পাপিষ্ঠ, বর্বর, পৈশাচিক পাকিস্তানি পাঞ্জাবি মুসলিম আর্মির বিচার ১৯৭১ সালে সংগঠিত জেনোসাইডের বিচার? বিশ্বের সকল জাতি, সকল দেশ এর কাছে বাংলাদেশিদের একটাই দাবী - ১৯৭১ এর অবমাননার ১৯৭১ এর অপমানের সুবিচার । 

ওদেরকে চাইতে হবে শর্তবিহীন ক্ষমা, দিতে হবে একটা বিশাল ক্ষতিপূরণ এবং প্রায়শ্চিত্ত ।



Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর