প্রকাশিত :  ০১:২৪, ২৬ আগষ্ট ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৯, ২৬ আগষ্ট ২০২১

আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলঃ বিশ্বব্যাপী অশনি সংকেত?

আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলঃ বিশ্বব্যাপী অশনি সংকেত?

আফগানী জনগণ আবারও নিমজ্জিত হল সেই কর্দমাক্ত ক্ষমতা দখলের চোরাবালিতে, খুবই দুর্ভাগ্যজনক বৈ আর কিছুই নয়। রাজনীতির সব টেক্সট বইতে বলে আসছে যুগ যুগ ধরে জনগণই নাকি ক্ষমতার সকল উৎস; কিন্তু এই বেদ বাক্যটি মোটেও প্রযোজ্য নয় এই অভাগা দেশটির জনগণের ভাগ্যে। কে শোনে ঐ জনগোষ্টির কথা, ব্যথা, কান্না, আর্তনাদ! আফগানিস্থান ১৯৫০  দশকেরও পূর্বে ছিল একটি অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু জনপদ, ছিল প্রাচুর্য, ছিল একটা সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা বাকি সব উন্নয়নশীল দেশগুলোর মত - যেখানে মহিলা এবং পুরুষরা কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পড়াশুনায়, বিজ্ঞানে, গবেষণায়, সাংস্কৃতিতে, একটি ওপেন সোসাইটি হিসেবে। কিন্তু, ভাগ্যের চরমতম বিপর্যয়ের এক জীবন্ত বলির শিকার হয়ে আসছে গত ৪০ টি বছর যাবত এই  ভাগ্যহীন জনগণ  এবং দেশটি । 

বিদেশি চক্রান্ত, স্বার্থ পরায়ণ প্রতিবেশী এবং নব্য ধর্মীও আত্মবিদ্যা  দ্বারা (মনগড়া - মতান্তরে) মত্তÍ  জলবৎ তরল মিশ্রনে তৈরী করেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত এক নতুন জঙ্গি সন্ত্রাসী দল - ‘তালেবান’- এক ভিন্ন মতাবিলম্বি গোঁড়া আত্মবিদ্যায় দীক্ষিত দুষ্কৃতিকারী, জুলুমবাজ, নিরবিছিন্ন, পশ্চাদভিমুখে প্রত্যাবর্তনকারী এক সন্ত্রাসী গ্রুপ। প্রতিবেশী পাকিস্তানী সিক্রেট সার্ভিস (আই এস আই)  দ্বারা দীক্ষিত এবং ওদের ছত্রছায়ার মদদপুষ্ট এই (সারা বিশ্ব জানে এদের জন্ম ইতিহাস - আশির দশকের  -  সেই বৃত্তান্ত ) যারা মধ্য যুগের বর্বরতাকেও  হার মানিয়েছেল পূর্বে। একবিংশ শতাব্দীতে যখন পৃথিবীময় চলছে উন্নয়নের, বিজ্ঞানের, মহাকাশের, আর্টিফেসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের, পরিবেশ দূষণের, জলবায়ু পরিবর্তনের এবং  কোয়ান্টাম ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে নতুন সব গবেষণা, প্রকাশনা, থিয়োরি  উদ্ভাবন- উন্মুচন- পরীক্ষা - নিরীক্ষা  - আনতে চায় এক নব্য বিজ্ঞানের উদ্ভাবিত পৃথিবী আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই পৃথিবী আর সেই শুভক্ষণে এই অর্ধ সভ্য বর্বরোচিত মনোভাবাপন্ন এই সন্ত্রাসী দল নতুন মোড়কে আবির্ভাব গ্রহণ  করেছে অধুনালুপ্ত দেশটাতে আবারও; যাতে এই জনগোষ্টির কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে যবনিকা টানতে চায় এদের ভবিষ্যতের শেষবারের মত । 

পূর্বেও এই দল  কেড়ে নিয়েছিল সকল অধিকার, পরিবারের অর্ধেক ভাগীদার মহিলাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল সকল অধিকার, উৎপাটন করেছিল সকল বিদ্যালয় শিক্ষা, চালু করেছিল বর্বর আইন কানুন, কেড়ে নিয়েছিল সকল প্রকার আনন্দ, ক্রীড়া, বিনোদন, বন্ধ কোয়ে দিয়েছিল মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা, আচ্ছাদিত করেছিল সকল মহিলাদের বোরখা পরিধান করতঃ, সহ শিক্ষা, পুরুষ মহিলা সংমিশ্রণ - মোদ্দা কথায় ওদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও বিনোদন আগ্রাসনে আফগান জনগণ হারিয়েছিল সব। এক শ্বাসরুদ্ধকর অমানিশা নেমে এসেছিল ঐ একদা খোলামেলা সমাজে । 

ক্রমান্বয়ে সেই সময় আফগানিস্থানকে গোঁড়া মস্তিষ্কধৃত উগ্রপন্থি  ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুবকদের প্ররোচিত করার কাজে নিমগ্ন এই সকল স্বার্থপর প্রবর্তকরা আফগানিস্থানকে বেছে নিয়েছিল একটি তীর্থস্থান হিসেবে - দলে দলে প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, নিকট প্রাচ্য, পশ্চিম এবং উপমহাদেশ থেকে ঐ সব প্রবর্তকরা  প্রেরণ করেছিল হাজার হাজার অবুঝ, কোমলমতি যুবাদেরকে সন্ত্রাসীতে রূপান্তর করার মাধ্যমে ঐ সব প্রবর্তকদের দুরভিসন্ধি স্বপ্ন চরিতার্থ করার জন্য - যার ফলশ্রুতিতে ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ সারা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ঐ সকল ভ্রষ্ট, সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে অতীতে এবং এখনও হুমকিতে আছে । এখন এই সব দেশ সদা সর্বদা সজাগ এবং সন্ত্রস্ত। 


তালেবানকে উৎখাত করার ফলে ক্রমান্বয়ে পৃথিবীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অনেক প্রশমিত হয়েছিল অধুনা। ৭/৭ লন্ডন বোমা বিস্ফোরণ তদন্তে আফগানিস্থান হয়ে  ইরাকি আল কায়েদা এবং পাকিস্তানী প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত (তালেবানের জন্মস্থান) এই দুই সন্ত্রাসী দলের সম্পৃক্ততা উন্মেচিত হয়েছে, তার আগের ৯/১১ যুক্তরাষ্ট্রে বিমান হামলার নীলনকশার কেন্দ্রবিন্দুও ছিল আফগানিস্তান, ভারতের ২৬/১২ মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার উৎপত্তিস্থান তালেবান দীক্ষায় দীক্ষিত এবং পাকিস্তানী নাগরিক দ্বারা পরিচালিত। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে ৫০০টি বোমার সমন্বয়ে সারা দেশে একযোগে বোমা  বিস্ফোরণও ছিল আফগানিস্তানি আল কায়েদার তান্ডব।

এই সব জন - মাল ক্ষয় ক্ষতির মুল হোতাই ছিল তালেবান।  ওদেরই ছত্রছায়ায় আফগানিস্থানে গড়ে উঠেছিল ধর্মের নামে একদল সন্ত্রাসী গ্রুপের স্বর্গরাজ্য। এরাই বিঘিœত করেছিল পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন জন মানুষের নিত্য নৈমিত্তিক শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন, হয়ত আবারও সংগঠিত হবে সেই পুরানো বিছিন্নতাবাদি, সন্ত্রাসী, হত্যাকারী, পৈশাচিক কাপালিকদের এই তালেবানদের নব্য উত্থানে । 

আশ্চর্যের বিষয় যে, এই উত্থানে পাকিস্তান কেমন যেন নীরব, চীনের সাহায্যের হাত এগিয়ে দেওয়া, পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রীর অসংলগ্ন বক্তব্য, ইরানের অনেক দিনের লালিত ইচ্ছার বাস্তব রূপধারণ তালেবানের আগমন এর মাধ্যমে - এক নব্য প্রশান্তি। চীন পাবে ইরানী তেল, আফগানিস্থানের ভূমির মধ্য দিয়ে নির্মিত পাইপ লাইন দিয়ে। তালেবানদের সাহায্যের পরিবর্তে উইঘরদের অত্যাচার নিয়ে তালেবানরা চীনে নাক গলাবে না হয়ত। পাকিস্তানের বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্পে হবেনা কোন তালেবানি বা অন্য কোন আফগান উপজাতিদের উপদ্রপ। পাকিস্তান হয়ত পাবে  বা পেয়ে যেতে পারে এক নতুন এক্সিস অফ ইভোল - হয়ত যুগপৎভাবে চালাতে পারবে তার ডীপ এস্টেট কর্মকান্ড এবং রফতানি করতে  পারবে যৌথভাবে নব্যমস্তিষ্ক ধৌতকৃত সন্ত্রাসী জনবল, সন্ত্রাসী দীক্ষা, সন্ত্রাসী মন্ত্র যা’ দিয়ে বিঘিœত করবে শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার, সমৃদ্ধি এবং ভূ রাজনৈতিক ভারসাম্য । 

কিন্তু, অত্যন্ত পরিতাপের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর রাজনৈতিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সকল কিছু পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সকলেই শঙ্কিত এই নতুন সন্ত্রাস এর মহা উদ্ভাবনে। ভারত, বাংলাদেশ, তাজাকিস্থান, কাজাকিস্থান, গিরগিস্থান, সহ রাশিয়ান  ব্লকের সকল মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সহ পাশ্চাত্যের সভ্যতাগুলোতেও নেমে আসতে পারে কালো সন্ত্রাসের অমনিসা । 

অতএব, সময় সমাসন্ন এই সকল দেশ গুলোকে সম্মিলিত ভাবে এই নতুন আক্রমণ - হুমকিকে প্রতিহত করার। এবং সকলে মিলে সমন্বিত উপায়ে একে একে উৎপাটন করতে হবে ঐ সব বিষবৃক্ষ সম প্ররোচকের আঁখড়াগুলোকে যাতে করে ঐ সব মানুষ নামের ভ্রষ্টরা আর কোন যুবকদের বিপথে না নিতে পারে । 

ইমরান চৌধুরী: ভূ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ 



Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর