প্রকাশিত :  ১৮:০০, ২০ জানুয়ারী ২০১৯

উন্নয়নের অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশ

উন্নয়নের অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশ
রায়হান আহমেদ তপাদারবাংলাদেশের উন্নয়নে যুগান্তকারী এক দর্শন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য। বাঙালি জাতির স্বপ্নপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা। সমৃদ্ধ ও উন্নত সেই সোনার বাংলা গড়তে নতুন অভিধান হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বেই। আধুনিক বাংলাদেশের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল মূলত নব্বই দশকের শেষ প্রান্তে। ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের উন্নয়নের স্বপ্ন কান্ডারি শেখ হাসিনা আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশ সমৃদ্ধির নতুন সোপান অবলোকন করতে শুরু করে। দিন বদলের মূল চেতনা হচ্ছে ব্যক্তির অবস্থার ইতিবাচক পরিবতর্ন সাধনের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির ইতিবাচক পরিবতর্ন। ব্যক্তির ইতিবাচক পরিবতর্ন বলতে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্ঞান, দক্ষতা, অভ্যাস, আগ্রহ, মূল্যবোধ, মনোভাব, উদ্যম ও আত্মবিশ্বাস প্রভৃতি মানবিক গুণাবলির ইতিবাচক পরিবতর্ন এবং পরিবতির্ত এসব গুণকে সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে পেশা নিবার্চন, কমর্সংস্থান তথা আথির্ক স্বয়ম্ভরতা অজর্ন। নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি দায়িত্ব-কতর্ব্য পালন। ব্যক্তির এমন পরিবতের্নর মাধ্যমেই সামাজিক উন্নয়ন, জাতীয় অগ্রগতি অজর্ন নিশ্চিত হবে। জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে বিশেষায়িত সংস্থা আইটিইউয়ের ২০১৭ সালের আইসিটি উন্নয়ন সূচকে (আইডিআই) বাংলাদেশের অবস্থান তালিকাভুক্ত ১৭৫টি দেশের মধ্যে ১৪৭তম। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের পরের অবস্থান পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের। কিন্তু তারপরও বলা হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর দূরের কোনো স্বপ্ন নয়। বেসরকারি সংস্থা বেসিসের হিসেবে দেশ থেকে এ বছর সফটওয়্যার রপ্তানি হতে যাচ্ছে এক বিলিয়ন ডলারের। উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে থাকলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশে সম্ভাবনার আলোচনা এখন বিশ্বজুড়ে। মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে আমরা ট্যাক্সি ডাকছি, বাজার করছি। পাসপোর্ট করার এবং বিভিন্ন বিষয়ে আবেদনের ফরম আমরা অনলাইনেই পাচ্ছি। ট্রেন, সিনেমার টিকিটও অনলাইনে সংগ্রহ করতে অভ্যস্ত হচ্ছি। এসব বিবেচনায় আমরা সঠিক পথেই রয়েছি। কিন্তু এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। অনেক নাগরিক সুবিধা এখনো অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা অনলাইনে আবেদন ফরম পাচ্ছি, কিন্তু তা জমা দিতে হচ্ছে সরাসরি সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে। ১০ বছরে ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে ১০০ গুণ। ইন্টারনেট প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে পৌঁছে গেছে। তাদের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কনটেন্ট তৈরি করতে হবে। একসময় এ দেশের মানুষ মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার অথবা ইন্টারনেট ফেসবুক ব্যবহারের কথা ভাবতে পারত না। অথচ এখন এ দেশের মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। ঘরে ঘরে কম্পিউটার। অফিসে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। ইন্টারনেট, ফেসবুক ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অচল প্রায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়। বাস্তব হয়েই ধরা দিয়েছে। যার সুবাদে উন্নয়নের গতি বেগবান হয়েছে। দেশে গত প্রায় ১০ বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে এক শ গুণেরও বেশি। ২০০৮ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ লাখ, এখন প্রায় ৯ কোটি। মোবাইল ফোনের গ্রাহকও বেড়েছে চার গুণ। ২০০৮ সালে মোবাইলের চালু সিমের সংখ্যা ছিল ৪ কোটির কম, সেখানে চলতি বছরের জুনে এই সংখ্যা ১৫ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজারে পৌঁছে যায়। ২০০৮ সালে দেশ থেকে ২৬ মিলিয়ন ডলারের সফটওয়্যার রপ্তানি হয়। এ বছর তা এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে যাচ্ছে। এ খাতে ২০২১ সালের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। আর্থিক লেনদেনের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না থেকে জনগণ ডিজিটাল পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। পৃথিবীতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ এখন এক নম্বরে। মোবাইল ফোনে লেনদেন হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ যেভাবে গ্রহণ করেছে তা অসাধারণ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রিজি) মোবাইল ফোন সেবা চালু হওয়ার প্রায় সাড়ে চার বছর পর গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চালু হয় চতুর্থ প্রজন্মের (ফোরজি) মোবাইল ফোন সেবা। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ২০২১ সালে পঞ্চম প্রজন্ম বা ফাইভজি মোবাইল সেবা চালু করা। অপারেটরদের তথ্য অনুসারে দেশে এ পর্যন্ত থ্রিজি গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। ফোরজি গ্রাহকও ৫৮ লাখের কাছাকাছি। সাহসী সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে অবশেষে মহাকাশে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম যোগাযাগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। এর মাধ্যমে স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু-১ এই নামটির মাধ্যমেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো কয়েকটি স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। কতদূর এগিয়েছি আমরা এ প্রশ্নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকার চরম বিপর্যয় ঘটে গেলে জাতীয় তথ্যভা-ারে রক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য হারানোর ভয় আর নেই। দেশের সবচেয়ে কম দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে যশোরকে চিহ্নিত করে সম্প্রতি সেখানে ‘ইনফো-সরকার’ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার। এই সেন্টারে ব্যাকআপ হিসেবে জাতীয় তথ্যভা-ারের সব তথ্য জমা থাকছে। এ ধরনের ব্যবস্থা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই প্রথম।কৃষিতে, টেলিমেডিসিনের জন্য আমাদের আরো কাজ করতে হবে। তবে এ গতি বহাল রাখার জন্য দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে। একটি হচ্ছে দক্ষ জনবল তৈরি; অন্যটি হচ্ছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি। সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণের ফলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ দিন দিন অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মানবসম্পদ সূচক এবং টেলিকমিউনিকেশন সূচককে এখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ডাটার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সিআরভিএস, ওপেন ডাটা পোর্টাল, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, এসডিজি পোর্টাল, বিগ ডাটাসহ নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে অনলাইন সার্ভিস সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরো ভালো হবে। আমাদের চারপাশে যে তথ্য-উপাত্ত তার পরিপূর্ণ প্রতিফলন প্রতিবেদনে হয়নি, সে জন্য প্রত্যাশিত প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা যায়নি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অতীতের চেয়ে ভালো সূচকে অবস্থান করছে। কয়েকটি স্বল্পোন্নত দেশের সঙ্গে এটুআই এরই মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের মতো করে ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা যায়। এই জরিপে মূলত আইসিটি টুলকে ব্যবহার করে বিভিন্ন অনলাইন সেবা তৈরি এবং মোবাইল বা ওয়েব অ্যাপে সেবা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে অনলাইন সেবা সূচকে বাংলাদেশের মূল অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতিই প্রতিবার বাংলাদেশের অবস্থানকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। তা ছাড়া টেলিকমিউনিকেশন সূচক এবং হিউম্যান কেপিটাল সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারের ব্যাপক আগ্রহ ও দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের প্রেক্ষিতে বিনিয়োগের বিরাট একটি সম্ভাবনা ও ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসাও শুরু হয়েছে। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি থেকে বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আসছে। এর আগে ফেইসবুকে তিনি এক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য কিছু চমৎকার খবর আছে। এই প্রথমবারের মত সিলিকন ভ্যালির মতো একটি উদ্যোক্তা তহবিল বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সান হোসে এবং সানফ্রান্সিসকো এই দুই শহরের মাঝামাঝিতে ৩০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা সিলিকন ভ্যালি ইন্টারনেট সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গুগল, ফেইসবুক, ইয়াহু, অ্যাপল, ইনটেল, এএমডি, এইচপি, ওরাকল, অ্যাডবির মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় এই সিলিকন ভ্যালিতেই। এছাড়াও রয়েছে তুলনামূলকভাবে ছোট কয়েকশ’ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। শুরু হয়েছে ‘ইনফো সরকার-৩’ প্রকল্প। এর মাধ্যমে দেশের দুই হাজার ৬০০ ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ২০১৮ সালের মধ্যে ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক পৌঁছে যাবে। এতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা ইউডিসিগুলো উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা পাবে। ইউডিসির উল্লেখযোগ্য সরকারি সেবাগুলো হলো : জমির পর্চা, জীবন বিমা, পল্লী বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, সরকারি ফরম, পাবলিক পরীক্ষার ফল, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অনলাইনে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিএফ-ভিজিডি তালিকা, নাগরিক সনদ, নাগরিক আবেদন, কৃষি তথ্য, স্বাস্থ্য পরামর্শ ইত্যাদি। বেসরকারি সেবাসমূহ হলো : মোবাইল ব্যাংকিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ছবি তোলা, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল, চাকরির তথ্য, কম্পোজ, ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি শিক্ষা, ভিসা আবেদন ও ট্র্যাকিং, ভিডিওতে কনফারেন্স, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং, ফটোকপি, লেমিনেটিং এসব। কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক স্থাপনের লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে। এই হাইটেক পার্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, কল সেন্টার এবং টেলিযোগা যোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। এখানে তৈরি হবে বিশ্বমানের পণ্য। এখানে উল্লেখ্য, ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে দেশব্যাপী নির্মীয়মাণ ২৮টি হাইটেক ও আইটি পার্কে প্রায় তিন লাখ চাকরি সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জানা যায়, দেশের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো থেকে এখন প্রতি মাসে ৪৫ লাখ মানুষ ৬০ ধরনের সেবা গ্রহণ করতে পারছে।                   লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট                     raihan567@yahoo.com


Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর