প্রকাশিত :  ১০:০০, ০৫ জুলাই ২০১৮
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৫৪, ১৯ আগষ্ট ২০১৮

সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা ও আগামী নির্বাচনে খালেদা

সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা ও আগামী নির্বাচনে খালেদা

অলিউল্লাহ নোমান

ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আগামী দিনের নির্বাচনী রাজনীতি। গত ১৬ মে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ সেটাকে আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন প্রশ্নে আপিল করেছিল ও দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকার। আপিল নাকচ করে জামিন বহাল রাখা হয়েছে। তবে একটি গিট্রু মেরে দিয়েছে আপিল বিভাগ। সেটা হচ্ছে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা মূল আপিল নিষ্পত্তির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। কোন বেঞ্চে সেটা নিষ্পত্তি করতে হবে তাও বলে দেয়া হয়েছে আপিল বিভাগের রায়ে। আপিল বিভাগের বেঁধে দেয়া নির্ধারিত সময় ৩১ জুলাই। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে হাইকোর্ট বিভাগকে। আপিল বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য হাইকোর্ট বিভাগ। এখন দেখার বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন বা সরকার কবে শুনানীর জন্য আবেদন করেন। ৫ হাজার পৃষ্টার উপরে নি¤œ আদালতের রায়ের নথি পেপারবুক আকারে নিশ্চয়ই এর মধ্যে তৈরি হওয়া শেষ পর্যায়ে। নতুবা আপিল বিভাগ এমন কঠিন করে সময় বেঁধে দিত না। হাইকোর্ট বিভাগে আপিল শুনানীতে পেপারবুক তৈরি হওয়া লাগবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগ, অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগ রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে চলেছে ২০০৯ সাল থেকেই। ইংরেজীতে একটি প্রবাদ রয়েছে, ক্যাথলিক মোরদেন পোপ। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টও রাজনৈতিক ইস্যুতে শেখ হাসিনার চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। রাজনৈতিক ইস্যুতে তারা এক চুল ছাড় দিয়েছেন এরকম নজির নাই বললেই চলে। জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলাটিও পুরোপুরি রাজনৈতিক ইস্যু ভিত্তিক একটি মামলা। বিএনপি’র রাজনৈতিক গতিপথ সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কৌশল হিসাবেই এই মামলাটি তৈরি করা হয়। সুতরাং সুপ্রিমকোর্টের রাজনৈতিক ইস্যু ভিত্তিক মামলার ধারাবাহিকতায় বলা যায়, সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন এখানেও ঘটার আশঙ্কাই বেশী। তবে রায়ের আগে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে দীর্ঘ শুনানী করার সুযোগ থাকবে। যাতে কেউ বলতে না পারে মামলার শুনানীতে যথেষ্ট বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

দুই বছর অগে ২০১৬ সালের জানুয়ারীতে লিখেছিলাম বেগম খালেদা জিয়ার মামলার নিষ্পত্তির উপর নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনীতি। সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি মারপ্যাচের মাধ্যমে নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রক্রিয়া নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এটাই ছিল ২ বছর আগের আমার লেখার মূল বক্তব্য। তখন ওই লেখার পর অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন এটা কি বাংলাদেশে সম্ভব হবে! অনেকে বলে ছিলেন এসব পাগলামী কথাবার্তা! বেগম খালেদা জিয়ার মত একজন জনপ্রিয় নেত্রী ও বিএনপি’র মত বড় দলের চেয়ারপার্সনকে এমনটা কখনো করা সম্ভব হবে না। এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এক শ্রেনীর বিএনপি নেতার মুখে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ নির্বিঘেœ অত্যন্ত সফলতার সাথে অতিক্রম করেছে সরকার। এখন সরকারের শতভাগ অনুগত হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগে শেষ পেরেকটা শুধু মারার বাকী। এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ গ্রহনের বিষয়টি চুড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে। এর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে শুধু ৩১ জুলাই পর্যন্ত।

বিএনপি’র বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান দেশে নেই। তাঁর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুইটি মামলায় কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তিনিও আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ গ্রহনে অযোগ্য হবেন। কারন তাঁর পক্ষে এখনো অপিল করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মামলায় দন্ড হলে কারাগারে আত্মসমর্পনের মাধ্যমে আপিল করতে হয়ে। তিনি বিদেশে অবস্থান করায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। অতএব, রাজনীতির বর্তমান ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে দাড়াতে পারছেন না। যদিও দলটির নেতারা জোড় দিয়ে বলা শুরু করেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। পাল্টা জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্পষ্ট করে বলেছেন, নিএনপি না এলেও নির্বাচন হবে। নির্বাচনী ট্রেন কারো জন্য থেমে থাকে না।

বিএনপি বা ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে কি হবে?

ধরে নিলাম সরকার তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুগত বিচার বিভাগের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে চুড়ান্ত অযোগ্য ঘোষণা করল। বিএনপি তাদের চলমান ঘোষনা অনুযায়ী চেয়ারপার্সন ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহন থেকে বিরত থাকল। প্রথমত: নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি ও জোটের শরীক দল গুলোর নিবন্ধন বাতিলের ঝুকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী পরপর দুইবার নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের বিধান রয়েছে। তবে নিবন্ধন বাতিলের আগে কেন নির্বাচনে অংশ নেয়নি, সেই বিষয়ে নির্বাচন কমিশন চাইলে কৈফিয়ত তলব করতে পারে সংশ্লিষ্ট দলের কাছে। ২০১৪ সালের ৫জানুয়ারীর নির্বাচনে ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। মোটমাট ৩৯টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ছিল তখন। এর মধ্যে ২৮টি, অর্থাৎ নিবন্ধিত সংখ্যা গরীষ্ঠ রাজনৈতিক দল তখন নির্বাচন থেকে বিরত ছিল। এই দল গুলোর কোন একটি যদি এবারও নির্বাচনে অংশ না নেয় তখন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার রাখে।

দ্বিতীয়ত: বিএনপি নামে কোন একটি গ্রুপকে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করবে সরকার। তাদের জন্য ধানের শীষ প্রতীকও বরাদ্দ থাকবে। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনে এমনটা করার চেস্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার সফল হয়নি। এবার দলের চেয়ারপার্সন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনে অযোগ্য হলে কি ঘটবে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বিএনপি নামের একটি দলকে নির্বাচনে নিতে সরকারের বড় অঙ্কের বাজেট রয়েছে এমনটা শোনা যায়। অনেকেরই ধারনা ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী নির্বাচনে গঠিত সংসদ বেশিদিন স্থায়ী হবে না। যে কোন মূহুর্তে এই সংসদ বাতিল হয়ে যাবে। তাই তখন অনেকে ঝুকি নেয়নি। ভোটার বিহীন একটি সংসদ নির্বিঘেœ ৫ বছর পার করে দেয়ায় অনেকেই বিষয়টি নতুন করে ভাবতে পারেন আগামী নির্বাচনে।
বিএনপি এখন করার কি আছে?

বিএনপি নেতারা এক সময় আইনি লড়াই বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলতেন। সরকারি দলের অনুগত সদস্য সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে দেশ থেকে বিদায় হতে বাধ্য করার মাধ্যমে চুড়ান্ত প্রমানিত হয়েছে আইন-আদালত কোথায় রয়েছে! তারপরও যদি কেউ আইনি লড়ায়ের কথা বলেন তখন আর বলার কিছু থাকে না। ২০০৯ সালের জানুয়ারীর পর থেকেই সুপ্রিমকোর্ট পুরোপুরি সরকারি কব্জায়। এমনকি দলদাস বিচারপতিরা কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেরা উদ্যোগী হয়ে সরকারি দলের ভুমিকা পালন করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে সরকারি দলের নেতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হন। এর আগে ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে সরকারি ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে শেষ পেরেকটি মেরে দিয়ে অবসরে যান। যদিও তাফাজ্জাল ইসলাম ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি ছিলেন। তাঁর উপর বিএনপি’র আস্থা এবং বিশ্বাস এতটাই গভীর ছিল যে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় আর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়া হলে ছাত্রী বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন উত্থাল হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন নবনির্বাচিত ভিসি আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল সেই ঘটনায়। এরকম একটি ঘটনা তদন্তের জন্য বিচার বিভাগী তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল ৪ দলীয় জোট সরকার। এই তদন্ত কমিটির প্রধান হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয় তৎকালীন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলামকে। এই ছিল তাফাজ্জাল ইসলামের প্রতি বিএনপি’র আস্থা ও বিশ্বাসের নজির। তিনিই কিন্তু ৫ম সংশোধনীতে শেষ পেরেকটা মেরেছেন। হাইকোর্ট বিভাগে খায়রুর হকের অবৈধ ঘোষণা করা ৫ম সংশোধনীর রায়কে বৈধতা দেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেন তাফাজ্জাল ইসলাম।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণই শুধু নয়, গণতন্ত্রের জন্য অলঙ্কার হিসাবে ঘোষনা করেছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ। অথচ সেই রায়কে বাতিল করেছেন খায়রুল হক নিজে উদ্যোগী হয়ে। তখন আপিল বিভাগে ৭জন বিচারপতি ছিলেন। এর মধ্যে মোজাম্মেল হোসেন, সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে রায় দেন। ইমান আলী, আবদুল ওয়াহাব মিঞা ও নাজমুন আরা সুলতানা হাইকোর্ট বিভাগের রায়কে বহাল রাখেন। এতে প্রধান বিচারপতি হিসাবে খায়রুল হক তাঁর কাষ্টিং ভোট দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেন। সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতেই তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগী হন খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি আপিল বিভাগে ঝুলে থাকা মামলাটি নিজ উদ্যোগী হয়ে খুজে বের করেন। এই রায়ই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করেছে।

বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ যখন ৫ সংশোধনী বাতিলেরর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় তখনো বিএনপি রাজৈতিক মাঠে ছিল নীরব। সংবিধানের মূলনীতি থেকে সকল কাজে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের বিধান বাতিল করা হল। সেই জায়গায় মূলনীতি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট এতে নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেছে। সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিল গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূ গুলোতে গণভোটের বিষয়ে। সেই গণভোটের বিধান বাতিল করা হল।

সুপ্রিমকোর্টের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে। এতে এমন কঠিন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোথায়ও নজির নেই। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলসহ সব গুলো বিষয়ে ২০ দলীয় জোটে রহস্যজনক নিরবতা পালন করতে দেখা গেছে তখন। যদিও ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচনের দাবীতে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার মরনকামড় দিয়ে সেই আন্দোলন অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে এখন শেষ বছরে রয়েছে। সেই নির্বাচনের পর শেখ হাসিনাকে আর বড় কোন রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয়নি।

এখন শেষ বেলায় এসে লেভের প্লেইং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দল নিরেপেক্ষ সরকারের দাবী কি বাস্তবয়ন করতে পারবে ২০ দলীয় জোট? জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ গ্রহনসহ কারামুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন করা কি সম্ভব হবে এই সময়ের মধ্যে? আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহন মূলক করতে এবং বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের যোগ্য নেতা হিসাবে বহাল রাখতে অবশ্যই দরকার একটি গণআন্দোলন। আওয়ামী লীগের শতভাগ অনুগত সুপ্রিমকোর্টে বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়ে শেষ পেরেক মারার আগেই যদি সরকার পতনের আন্দোলনে সফল হওয়া যায় তবেই সম্ভব। বিএনপি কি পারবে জোটের শরীকদের নিয়ে সেই গণআন্দোলন গড়ে তুলতে? নাকি আওয়ামী লীগ যে আরেকটি সাজানো নির্বাচনের চকে এগিয়ে যাচ্ছে সেটাই সফল হবে?

বিএনপিতে ইন্ডিয়া প্রীতি নাকি ইন্ডিয়া ভীতি

২০০৭ সালে জেনারেল মঈন ইউ আহমদের তত্ত্বাবধানে বায়বীয় তত্ত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। সেই সরকারের সময় দেশের সার্বভৌমত্ব অর্পন করা হয় ইন্ডিয়ার কাছে। ইন্ডিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জি আত্মজীবনীতে নিজেই লিখেছেন। কিভাবে মইন উদ্দিনকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে সেটা বলেছেন অকপটে। বিনিময়ে মঈন উদ্দিনের চাকুরিতে বহাল থাকার নিশ্চয়তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তখন থেকেই ইন্ডিয়ার স্বার্থে বিভিন্ন চুক্তি করা শুরু হয়। সার্বভৌমত্ব বিরোধী এসব চুক্তির বিরুদ্ধে বিরোধীতা দূরের কথা, নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট। সর্বশেষ নিরাপত্তা চুক্তির নামে চলতি মাসে যা করা হল সেটাতে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণও অনেকটা ইন্ডিয়ার হাতে অর্পন করা হয়েছে। ইন্ডিয়া ভীতি বা ইন্ডিয়া প্রীতিতে লিপ্ত বিএনপি এসব বিষয়েও নীরব। ২০১৫ সালের আন্দোলনের সময় বিএনপি’র বহু গরুত্বপূর্ণ নেতার মুখে শোনা গেছে ইন্ডিয়া তখন নিউট্রাল। যার বাংলা তরজমা হচ্ছে ইন্ডিয়া নিরপেক্ষ ভুমিকায় রয়েছে। এখনো ওইসব গুরুত্বপূর্ণ নেতার মুখে শোনা যায় ইন্ডিয়া নিউট্রাল হয়ে গেছে। আগামী নির্বাচনে ইন্ডিয়া নিরপেক্ষ ভুমিকায় থাকবে।

তাদের কথা সঠিক ধরে নিলাম। ইন্ডিয়া নিরপেক্ষ থাকবে। সম্প্রতি খুলনা সিটি কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন হয়েছে। দু’টি নির্বাচনের ফলাফল একই সাথে বের হয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নতুন আওয়ামী স্টাইল বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অত্যন্ত সফলতার সাথেই আওয়ামী স্টাইলে নতুন নির্বাচনী সংস্করণের মহড়া হয়েছে খুলনায়। যদি এরকম একটি সফল আওয়ামী স্টাইল নির্বাচন জাতীয় সংসদে করতে পারে তখন কি হবে! এটা কি কেউ ভাবছে একবারও। নিরপেক্ষ ইন্ডিয়া তো দর্শকের ভুমিকায় থাকবে। তাই না!

তবে তারাই আবার একটি খোড়া যুক্তি খাড়া করেন। খুলনায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে সরকার। সারা দেশে যখন নির্বাচন হবে তখন এভাবে পারবে না। ভোটের দিন মানুষ বের হয়ে আসলে সরকার সারা দেশে ঠেকাতে পারবে না তখন। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় পেশাজীবীদের সংগঠন হচ্ছে আইনজীবীদের বার কাউন্সিল। এই বার কাউন্সিলের ইলেকশনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্যানেল মাত্র ২টি পদে বিজয়ী হয়েছে। বাকী ১৪টি পদে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের প্যানেলের প্রার্থীরা। শিক্ষিত আইনজীবী সমাজের এই ভোটে কোন রকমের জালিয়াতির অভিযোগ এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। সুতরাং আগামী নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইন্ডিয়া প্রীতি ও ইন্ডিয়া ভীতি থেকে বের হয়ে একটি সঠিক গণ আন্দোলনের মাধ্যমে ৩১ জুলাইয়ের আগে সরকার পতন আন্দোলন চুড়ান্ত ধাপে নিতে না পারলে আরো কঠিন মাশুল দেয়া লাগতে পারে।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত।



Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর