চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রকাশিত :  ০৮:২১, ০৪ নভেম্বর ২০২৩

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা

শিক্ষাবর্ষের শেষ দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছে। নভেম্বর মাসজুড়ে এসব কর্মসূচি চলবে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে বলা হচ্ছে। ফলে ইতোমধ্যে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। স্কুল ছাড়াও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষা রয়েছে নভেম্বরে। লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শেষ প্রান্তিকের মূল্যায়নও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ৫ নভেম্বরের পরিবর্তে এই দুটি শ্রেণির নতুন শিক্ষাক্রমের বার্ষিক মূল্যায়ন আগামী ৯ নভেম্বর ধার্য করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জানানো হয়েছে, যেসব শিক্ষার্থী হরতাল কিংবা অবরোধে স্কুলে আসতে পারছে না তাদেরকে স্কুলে অনুপস্থিত দেখানো যাবে না। বরং ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস করাতে হবে।

দেখা গেছে, অবরোধকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের স্কুল-কলেজে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল নগণ্য। কোথাও কোথাও ক্লাস হলেও শিক্ষার্থী ছিল কম। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপস্থিতিও ছিল হতাশাজনক। এতে সন্তানদের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় পাঠানো নিয়ে ‘দোটানায়’ পড়েছেন অভিভাবকরা। আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না থাকলেও রুটিনমাফিক স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরীক্ষাগুলো সময়মতো না হলে সন্তানদের শিক্ষাজীবন এলোমেলো হয়ে যাবে-এমন শঙ্কার কথা জানান অভিভাবকরা।

রাজধানীর বেশ কিছু স্কুলে ১ নভেম্বর থেকে প্রাথমিকের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবরোধের কারণে তা পিছিয়ে ৫ নভেম্বর থেকে শুরু করার নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া হরতাল-অবরোধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষাও পিছিয়েছে। তবে উচ্চমাধ্যমিক কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো সেভাবে প্রভাব পড়েনি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়েছে। আর বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই হরতাল-অবরোধে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। এমনকি অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে স্কুলগুলোতে ভর্তিতে অনলাইনে আবেদন শুরু হয়েছে। নভেম্বরে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে। চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নভেম্বরের শেষে প্রকাশ করার কথা। এরপরেই উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন বছরের শুরুর দিকে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা রয়েছে।

অভিভাবকরা বলেন, সামনে সন্তানদের বার্ষিক পরীক্ষা। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য মূল্যবান। নিরাপত্তাহীনতায় তারা স্কুলে যেতে পারছে না। তারা আরও জানান, ভয়ে অনেকে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। আবার যারা পাঠাচ্ছেন সন্তান কখন বাসায় ফিরবে এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে। এরপর শুরু হবে নতুন শ্রেণিতে ভর্তির কার্যক্রম। ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষায় বসবে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রভাব ফেলবে এই পরীক্ষার্থীদের ওপরও।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, লাগাতার হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, নভেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ জন্য এবারের গ্রীষ্মকালীন ছুটি বাতিল করা হয়। সেই নির্দেশনায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি পরীক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, হরতাল বা অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। সব শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে শিক্ষা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সে ধরনের কর্মসূচি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষাবিদ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্কুলে শুরু হতে যাওয়া পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের শিশুরা যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারে।


Leave Your Comments


যৌন নিপীড়নের অভিযোগে বরখাস্ত জাবি শিক্ষক জনি

প্রকাশিত :  ০৪:২৯, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

অবশেষে যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জনির বিচার শেষ করলো প্রশাসন। তদন্ত প্রতিবেদনের পর স্ট্রাকচার্ড কমিটির প্রতিবেদনেও জনির বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের সত্যতা মেলায় শাস্তিস্বরূপ তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত (চাকরিচ্যুত) করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নূরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও সিন্ডিকেট সচিব আবু হাসান বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

আবু হাসান বলেন, ইতোপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত স্ট্রাকচার্ড কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশের ৪ (জ) ধারা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এর আগে, ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর মাহমুদুর রহমান জনি ও একই বিভাগে ওই সময় সদ্য নিয়োগপাওয়া প্রভাষক আনিকা বুশরা বৈচির একটি অন্তরঙ্গ ছবি (সেলফি) বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে পোস্টারিং করা হয়। যেখানে বলা হয়, ‘এভাবেই ললিপপের ভেল্কিতে শিক্ষিকা হলেন আনিকা বুশরা বৈচি।’

একই সাথে বিভাগের শিক্ষক পদে আবেদনকারী ৪৩ ব্যাচের আরেক ছাত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ কথাবার্তার অডিও প্রকাশ্যে আসে। যেখানে মাহমুদুর রহমান জনি ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর কথা শোনা যায়। এছাড়া, জনির সাথে ছাত্রলীগের একাধিক নেত্রীর ‘অনৈতিক’ সম্পর্ক স্থাপন এবং ‘অশালীন’ চ্যাটিংয়ের ছবি ও তথ্য উঠে আসে।

এর প্রেক্ষাপটে জনির বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। পরে ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর একাধিক ছাত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে জনির বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটিকে ওই বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন স্পষ্ট নয় মর্মে দাবি করে একই বছরের ৯ মার্চ পুনরায় গঠিত হয় ‘স্পষ্টীকরণ কমিটি’ । সর্বশেষ গত বছরের ১০ আগস্ট ওই কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাাথমিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠিত হয়।

সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কুরিয়ারযোগে সাংবাদিকদের কাছে উপাচার্যকে গালিগালাজ করার অডিও ক্লিপ-সম্বলিত একটি ডিভিও, দায়মুক্তিপত্র প্রত্যাহার সংক্রান্ত আবেদনপত্র ও একটি উড়োচিঠি আসে। সেখানে ৫২ সেকেন্ডের অডিও ক্লিপে মাহমুদুর রহমান জনিকে বলতে শোনা যায়, ‘বাট ইউ ফরগেট, আই ওয়াজ ওয়ন্স আপন এ টাইম, আই ওয়াজ দ্য এক্স প্রেসিডেন্ট অফ বিএসএল-জেইউ। আমি হয়তো ধরা খাবো, ধরা খাবো না এমন বলছি না। কিন্তু ধরা খাওয়ার আগে আমি চার-পাঁচটা মুখ শেষ করে দেবো।’

দক্ষতা ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ অনুসারে স্ট্রাকচার্ড কমিটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ভিসি। এ ছাড়া নিজ অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান, দুজন সিন্ডিকেট সদস্য এবং রেজিস্ট্রার এই কমিটির সদস্য মনোনীত হন। স্ট্রাকচার্ড কমিটির কার্যক্রম উপাচার্যের আহবানে সংগঠিত হয়। সে হিসেবে মাহমুদুর রহমান জনির বিরুদ্ধে গঠিত এই কমিটিতে আছেন ভিসি অধ্যাপক নূরুল আলম, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক নুহু আলম, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান মাহফুজা মোবারক এবং সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ ও অধ্যাপক আশরাফ-উল আলম।


img