img

নেতানিয়াহু-বাইডেনের সখ্যতায় ফাটল কি লোক দেখানো?

প্রকাশিত :  ১৯:৩৩, ১১ মে ২০২৪

নেতানিয়াহু-বাইডেনের সখ্যতায় ফাটল কি লোক দেখানো?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন বিবি নেতানিয়াহুকে দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে আক্রমণ শুরু করার বিষয়ে গত সোমবার আবারও জরুরিভাবে সতর্ক করেছেন। এর আগেও বারবার রাফাহ শহরে হামলা না চালাতে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মার্কিন সতর্কবাণী রীতিমতো অগ্রাহ্যই করছেন নেতানিয়াহু। ফলে ফিলিস্তিনে মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়ছে, দুই দেশ আর দুই নেতার মধ্যে বিভাজনও ততটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে!

মার্কিন মুলুকের আহ্বান, এমনকি সতর্কবাণীও বারবার উপেক্ষা করার স্পর্ধা কীভাবে দেখাচ্ছেন নেতানিয়াহু? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এ কথাও ঠিক, বাইডেন নেতানিয়াহুকে ফোন করে হুঁশিয়ার করেছিলেন। বলেছিলেন, রাফায় হামলা চালানো হলে ইসরায়েলকে দেওয়া অস্ত্রের চালান বন্ধ করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। হয়েছেও তাই। এই ফোন কলের দুই দিন পরই ইসরায়েলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা ২০০০ ও ৫০০ পাউন্ড ওজনের বোমার চালান বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুধু তাই নয়, ইসরায়েলকে আরও অস্ত্র সহায়তা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন। কিন্তু সত্যিই কি তাই?   

ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন, গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা, তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারে। এমনকি মিত্র দেশটিতে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি তার দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলেও জানিয়েছেন বাইডেন।

সতর্ক করলেও, সেবার ইসরায়েলকে অস্ত্র পাঠিয়েছিল ইসরায়েল। বাইডেনের নিজের রাজ্য দেলাওয়ার থেকে অস্ত্র নিয়ে দক্ষিণ ইসরায়েলে যায় একটি কার্গো বিমান। 

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসরায়েল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অস্ত্র পাচ্ছে এবং যা কিছুই হোক না কেন, এর পরিবর্তন হবে না।

বিষয়টি এমন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে গাজায় হামলা না চালানোর অনুরোধ করছে। সতর্ক করছে। হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।

একই সঙ্গে গাজায় ত্রাণ সাহায্য পাঠাচ্ছে। কখনও ত্রাণের জন্য বন্দর বানাচ্ছে। কখনও আকাশ থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমে ত্রাণ ফেলছে। দেখে মনে হচ্ছে, তারা কত কিছুই না করছে গাজার জন্য। ফিলিস্তিনিদের জন্য। 

কিন্তু আবার যুক্তরাষ্ট্র বারবার ইসরায়েলে অস্ত্রও পাঠাচ্ছে। এইসব অস্ত্রই তো ইসরায়েলি সেনারা গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগ করছে। অস্ত্র হাতে না পেলে ইসরায়েল কি দিয়ে রাফাহ শহরে হামলা চালাতো? অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যখনই ইসরায়েলের অস্ত্র কম পড়ে, তখনই তারা তা জানায় যুক্তরাষ্ট্রকে। আরও অস্ত্র পাঠাতে অনুরোধ করে। আর তখন তখনই অস্ত্র নিয়ে ইসরায়েলে হাজির হয় যুক্তরাষ্ট্র!

বাইডেন প্রশাসনের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, আমি এমন কোনও দৃশ্য কল্পনা করতে পারি না যেখানে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার জন্য যে কোন ধরনের প্রয়োজন আটকে রাখবে হোয়াইট হাউস। এমনকি সেটা যদি শেষ পর্যন্ত রাফাহ শহরে হামলাও হয়, তারপরও না।

অবশ্য ইসরায়েলে এই অস্ত্র পাঠানো নিয়েই দেশের ভেতরে ও বাইরে চাপের মুখে আছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীরা। মিশিগান, নর্থইস্টার্ন, ইন্ডিয়ানাসহ ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে স্নাতক অনুষ্ঠানে গাউন আর টুপি পরিহিত শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে, তাদের স্বাধীনতার প্রতীক কেফিয়াহ বা বিশেষ স্কার্ফ গলায় বেধে সার্টিফিকেট নিতে মঞ্চে উঠেছে। আর কলাম্বিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। 

এদিকে, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ও চার মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ব্রুস রিডেল বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে, ইসরায়েলকে সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এরই মধ্যে ৩৪ হাজার ৯৭১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৭৮ হাজার ৬৪১ জন। এর উপর আবার রাফাহ শহরে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। আর এই রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ১০ লাখ শরণার্থী। নেতানিয়াহুর ঘোষণার পর থেকেই সরব হয়ে উঠেছে পশ্চিমা বিশ্বসহ আরব দেশগুলো। কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় হামাস আর ইসরায়েলের মধ্যে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতির জন্য বারবার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে সেই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র মূলত হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া ইসরায়েলিদের মুক্তির বিষয়টিতেই জোর দিয়েছে বেশি। সবশেষ আলোচনায় প্রতিনিধিদের সাথে এমনকি সিআইএ প্রধানও অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আলোচনাও ভেস্তে গেলে, সত্যিকার অর্থেই ঝামেলায় পড়ে যায় বাইডেন প্রশাসন।

মিটভিমের প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা এবং ডিপ্লোমেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিমরোদ গোরেন বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকান সমর্থন শক্তিশালী। রাফাহ শহরে হামলা নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের সর্বশেষ হতাশা মূলত নেতানিয়াহুকে কেন্দ্র করে। কারণ একাধিক বিষয়ে নেতানিয়াহুর আচরণে হতাশ মার্কিন প্রশাসন। এর মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো মানবিক ইস্যু।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো, গাজায় দুর্ভিক্ষ আসন্ন বলে বারবার সতর্ক করে আসছে। শুধু খাবারের অভাব নয়, সেখানে চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব। চিকিৎসকের অভাব। ঘরবাড়ি তো নেই-ই। লোকজন রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপন করছে। আরব সেন্ট ওয়াশিংটন ডিসি নামের মানবাধিকার সংস্থার গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক ইমাদ হারব বলেন, যার মধ্যে ন্যূনতম বিবেক রয়েছে, তিনিই গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ হবেন।

এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র চাপের মুখে রাখবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর সেটাই হয়েছে। ইসরায়েলে অস্ত্র চালান বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও চালানটি ছোট, তারপরও এ থেকেই হয়ত ইসরায়েলের কাছে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট থমাস এল ফ্রিডম্যান লিখেছেন, অস্ত্র চালান বন্ধের এই পদক্ষেপ নেতানিয়াহুকে একটাই ইঙ্গিত দিয়েছে; আর তা হলো- আজ ইসরায়েলকে হুমকির মুখে ফেলা সবচেয়ে বিপজ্জনক নেতা জো বাইডেন নয় বরং স্বয়ং বেনিয়ামিন বিবি নেতানিয়াহু!

ফ্রিডম্যান আরও বলেছেন, নেতানিয়াহুর নেওয়া নীতিগুলো গাজায় টেকসই বিজয় আনতে পারেনি; পারবেও না। ইসরায়েলকে তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় হুমকি ইরানের বিরুদ্ধেও সুরক্ষিত করতে পারছে না। বরং বিশ্বে ইহুদিদের বিপন্ন করে তুলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ও লক্ষ্যগুলোকে ক্ষুণ্ন করেছে। আর এ কারণেই ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিভাজন বাড়ছে। ব্যবধান বাড়ছে নেতানিয়াহু ও বাইডেনের মধ্যে। 

কিন্তু আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও পদক্ষেপই কার্যকর হবে না, যদি না গাজায় ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হয়। আর তার জন্য ইসরায়েলকে সব ধরনের অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করে দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু সেটা কি করতে পারবেন জায়নবাদী জো বাইডেন? সেটা দেখতে হলে, হয়ত আরও প্রাণ ঝরবে গাজায়। 

মতামত এর আরও খবর

img

ব্রিটেনে বাংলাদেশিরা কি ‘বিপদে’ পড়বেন

প্রকাশিত :  ১০:১১, ২৬ মে ২০২৪

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ব্রিটেনে অবৈধ অভিবাসন রোধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে । এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রিটেনজুড়ে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিরাপদে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। 

২০১১ সালের ব্রিটিশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪ লাখ ৫১ হাজার ৫২৯ বাংলাদেশি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে ব্রিটেনে বসবাস করছেন। এঁদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ব্রিটেনেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বাকি ৪৮ শতাংশ বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশে জন্ম নিলেও পরবর্তী সময়ে ‘ফ্যামিলি রিইউনিফিকেশন’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেয়েছেন।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ অবৈধভাবে ইউরোপের ছয়টি রুট দিয়ে, বিশেষত ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। ২০২৩ সালে ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত বছরে ইতালিতে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে প্রবেশ করেছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। অবৈধভাবে প্রবেশ করা এসব অভিবাসীর অনেকেই শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যের আদালতে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। ফল হিসেবে, ব্রিটেনে উদ্বেগজনকভাবে শরণার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাসাইলাম ইনফরমেশন ডেটাবেজের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ২৫৮ জন আশ্রয়প্রার্থী যুক্তরাজ্যে ‘প্রোটেকশন স্ট্যাটাস’–এর জন্য আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশ আবেদনকারীর আবেদন খারিজ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে এ রকম আশ্রয়ের আবেদন বেড়ে যাওয়ার কারণে তা ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। 

এখানে বলে রাখা দরকার, ব্রিটিশ সরকারের প্রাইভেসি অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা আবেদনকারীর কোনো প্রকার তথ্য প্রকাশ করে না। কাজেই এই আশ্রয়প্রত্যাশীরা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, নাকি বিদেশে যাওয়ায় পর তাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে, নাকি তাঁরা অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে গিয়েছেন, তা ধারণা করা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ সরকার অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর নীতি প্রয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকেই এর ধারাবাহিকতা চলছে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসা এই শরণার্থীর অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বা ব্রিটেনে আশ্রয় নিতে চান রাজনৈতিক কারণে।

১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত রিফিউজি কনভেনশন অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন যাচাই–বাছাই করে। তবে সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি তারা রুয়ান্ডার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে, যার আওতায় যুক্তরাজ্যে আসা অবৈধ অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে রুয়ান্ডায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

এই অভিবাসীদের যাবতীয় আইনি কার্যকলাপ যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত হলেও তাঁদের রুয়ান্ডায় রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে আইনি ধাপ শেষে তাঁদের আবার রুয়ান্ডা থেকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে।

এর আগে অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের বেলায়ও এ রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। অবৈধ অভিবাসীদের পাপুয়া নিউগিনিতে পাঠিয়ে দিয়ে পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে তাঁদের আবেদনের ভিত্তিতে কিছুসংখ্যক অভিবাসীকে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

ব্রিটিশ সরকারের কঠোর অভিবাসননীতির কারণ হিসেবে প্রথমেই বলা যেতে পারে যে ব্রিটেনে অবৈধ অভিবাসন রোধে সরকারের ওপর বহুমুখী চাপ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানান চ্যালেঞ্জ ব্রিটিশ সরকারকে নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যে ফেলেছে।

অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ বাজেটে কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ১৯৫১ সালের কনভেনশন অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকার এই অভিবাসীদের থাকা–খাওয়া, তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা এবং প্রয়োজনে চাকরি না থাকলে তাঁদের বেকার ভাতার ব্যবস্থা করতে চুক্তিবদ্ধ। এই চাপ মোকাবিলায় তারা এসব অভিবাসীকে রুয়ান্ডায় পাঠাচ্ছে, যাতে অভিবাসীদের পেছনে বরাদ্দ বাজেটের কিছুটা হলেও সাশ্রয় করা যায়। এতে অর্থনৈতিক মন্দা তথা মূল্যস্ফীতিজনিত অর্থসংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।

ব্রিটেনের কঠোর অভিবাসননীতির প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক। কোভিড–পরবর্তী সময়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ব্রিটেন এবং ইউরোপের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। এ যুদ্ধে ইউক্রেনকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করায় ব্রিটেনকে তার নিজস্ব বাজেট থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ ছাড়া ইউক্রেনের অর্থনীতির ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রদান করতে হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন থেকে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ব্রিটেনে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন। যেহেতু ব্রিটিশ সরকার ইউক্রেনকে আর্থিক ও মানবিক দিক থেকে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই ব্রিটেন তাদের সামগ্রিক বাজেটের একটি বড় অংশ ইউক্রেনের পেছনে ব্যয় করছে। ফলে যুক্তরাজ্য অন্যান্য দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে নতুন কোনো অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্রিটেনের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে না পারে।

রুয়ান্ডা সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে তারা কেন যুক্তরাজ্য সরকারকে সাহায্য করতে আগ্রহী, তার বিভিন্ন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রথমত, রুয়ান্ডা বর্তমানে তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে আফ্রিকার দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। 

তবে রুয়ান্ডা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। সে দেশের সরকার এ কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। বলতে গেলে এই অভিযোগগুলো ঢাকার লক্ষ্যে বা নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় রুয়ান্ডা সরকার যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির অন্যতম কারণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। রুয়ান্ডা ধারণা করছে, যুক্তরাজ্য সরকার রুয়ান্ডায় বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করবে। যেহেতু রুয়ান্ডা তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে, তাই এই সময় বিদেশি বিনিয়োগ রুয়ান্ডার জন্য ব্যাপক সুফল বয়ে আনবে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য থেকে আসা অভিবাসীদের আশ্রয় দিলে রুয়ান্ডায় ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আসা বিনিয়োগের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, রুয়ান্ডায় কর্মক্ষম লোকবলের সংকট রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে এসব অভিবাসীকে কাজে লাগানোরও পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। বলে রাখা ভালো, ইইউ-তুরস্ক চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপে শরণার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে অন্যতম রুট তুরস্ককে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য দিয়েছিল (সূত্র: ইউরোপীয় কমিশন)।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, রুয়ান্ডার এই পদক্ষেপ তাদের গণতন্ত্রের দুর্বলতা ঢাকার একটি প্রচেষ্টা। কিন্তু ব্রিটেনের সুশীল সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের নীতিমালার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ করছেন। 

তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনগণ এই অবৈধ অভিবাসীদের বোঝা মনে করছেন না; বরং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদেরা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে অবৈধ অভিবাসনকে সামনে আনছেন। তাঁরা ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, গণতন্ত্র সুরক্ষাসহ মানবিক সংকটে ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক চুক্তি এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের চুক্তি কোনো নতুন বিষয় নয়। এর আগে ২০১৭ সালে ইউরোপে বসবাসরত প্রায় ৯০ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এসওপি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির আলোকে ইউরোপে যেসব বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী আছেন, তাঁদের যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে আশ্রয় না পেলে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

সে সময় মানবাধিকারকর্মীরা এর ব্যাপক সমালোচনা করে বলেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ বা আফগানিস্তানের মতো দুর্বল রাষ্ট্র থেকে আসা অভিবাসীদের বেলায় ভিসা নীতি প্রয়োগের ভয় দেখিয়ে এই চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পদক্ষেপ সমালোচিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে করা চুক্তিতে এ রকম কোনো নীতি আছে কি না, সে সম্পর্কে আমরা কোনো ধারণা পাইনি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে বাংলাদেশে যাঁরা অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের থেকে সরকারকে কোনো রকম সুপারিশ করার সুযোগ ছিল না। এ চুক্তি সম্পর্কে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ধারণা কারও কাছে নেই।

এখানে আমাদের আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশি যাঁরা আছেন, তাঁদের অধিকার কতটুকু সুনিশ্চিত হচ্ছে? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে প্রতিবছর আমরা এই বৈধ এবং অবৈধ পথে যুক্তরাজ্য যাওয়া অভিবাসীদের মাধ্যমে বছরে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাচ্ছি। কাজেই তাঁদের প্রতি আমাদের একধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

এখন তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকারকে পুরো ব্যাপারটাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। আমাদের অভিবাসননীতিতে এই অবৈধ অভিবাসীদের জন্য কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এ বিষয়ে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যাঁরা অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে গেছেন, তাঁরা দিনের পর দিন আবেদনপ্রক্রিয়া–সংক্রান্ত মামলা–মোকাদ্দমা চালানোর কারণে আর্থিক অনটনে রয়েছেন। তাঁদের স্বার্থে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে দ্রুত আলাদা হটলাইন বা সেলের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন অবৈধ অভিবাসীরা দ্রুত হাইকমিশন থেকে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ পান। বিভিন্ন কাগজপত্র প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ থেকে তাঁরা যেন যুক্তরাজ্যে পাঠানোর সুযোগ পান। অভিবাসীরা যেন যেকোনো আইনি জটিলতায় বিশেষজ্ঞ আইনবিদদের সাহায্যের সুযোগ পান, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশি অভিবাসীদের রুয়ান্ডায় পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে আমাদের কোনো পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তবে এই সিদ্ধান্ত বহাল হলে দ্রুত রুয়ান্ডা সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে, যেন বাংলাদেশি অভিবাসীরা রুয়ান্ডায় থাকতে পারেন বা সেখানে কাজের সুযোগ পান।

চতুর্থত, ব্রিটিশ সরকার অবৈধ অভিবাসন রোধে বাংলাদেশ থেকে বৈধ উপায়ে লোক নিয়োগে আগ্রহী। ব্রিটিশ সরকারের এই আগ্রহ সত্যি হলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত এ লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করা। নতুন করে লোক না নিয়ে বাংলাদেশ থেকে পরিবারসহ যাঁরা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তাঁদের যেন বৈধ অভিবাসনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সে লক্ষ্যে প্রচলিত আইনি কাঠামোর বাইরে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

পঞ্চমত, অনেক অবৈধ অভিবাসী দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হতে পারেন। রাজনৈতিক কোনো কারণে বা ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে যাওয়ার কারণে তাঁরা যেন বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ সমস্যাকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।

সবশেষে দেশে ফেরত আসা অভিবাসীদের অনেকেই যুক্তরাজ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে এসেছেন। তাঁদের এই দক্ষতাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি, সে লক্ষ্যে সরকারকে নতুন কর্মপরিকল্পনা গঠন করতে হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, বিদেশ থেকে বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু মানুষ কাজ করতে আসছেন। অথচ নিজ দেশে কাজ না পেয়ে বাংলাদেশিরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কাজেই বাংলাদেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমাদের দেশের মানুষের জন্য সৃষ্টি করতে হবে কাজের সুযোগ ।