img

পত্রিকা বিক্রেতা

প্রকাশিত :  ০৫:১৪, ০৫ মার্চ ২০২৫

পত্রিকা বিক্রেতা

রেজুয়ান আহম্মেদ

শীতের ভোরে ময়মনসিংহ শহরটাকে মনে হচ্ছিল ধূসর চাদরে মোড়ানো এক বিষণ্ণ চিত্রকর্ম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানগুলো কাঁপতে কাঁপতে আগুনের ধোঁয়া তুলছিল, আর ফুটপাতজুড়ে জড়ো হয়েছিলেন দিনমজুর থেকে শুরু করে স্কুলের ছাত্ররা—সবাই যেন ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই এক চিরচেনা চেহারা—হাশেম চাচা। তাঁর বয়স এখন সত্তর পেরিয়েছে, কিন্তু সংসারের চাকা এখনও থামেনি।

চার দশক আগে, যখন এই শহরে প্রথম এসেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন উজ্জ্বল চোখের এক তরুণ, যার হাতে ছিল সাইকেল আর স্বপ্নের বোঝা। সেই সাইকেলটাই এখন জীর্ণ, আর তার ব্যাগে ভরা থাকে আজকের পত্রিকা। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় প্রেস থেকে পত্রিকা নিয়ে তিনি তিন কিলোমিটার সাইকেল চালাতেন। কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে বাত—তবুও থামতেন না। মিষ্টি হেসে বলতেন, \"এটাই তো আমার সকালের নামাজ।\"

আশির দশকে হাশেম চাচার দিন শুরু হতো মানুষের হাসি আর গল্পে। অফিসার সাহেবরা তাঁর কাছ থেকে পত্রিকা কিনে গ্রামের খবর জানতে চাইতেন, ছাত্ররা বক্সিং ম্যাচের স্কোর জানতে চাইত। তখন পত্রিকা ছিল সমাজের আয়না। কিন্তু এখন? এখন তাঁর ডাকে সাড়া দেয় না কেউ। মানুষের হাতে স্মার্টফোন, চোখে স্ক্রিনের নেশা। পত্রিকার পাতায় জমে থাকা কালির মতো হাশেম চাচার জীবনও যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

\"দৈনিক খবর! আজকের বড় শিরোনাম! খবর নেবেন, সাহেব?\"—হাশেম চাচার কণ্ঠে এখনও সেই জোর, কিন্তু কোনো প্রতিধ্বনি নেই। একদিন এক যুবক বলেছিল, \"চাচা, আপনি ইন্টারনেটে খবর পড়েন? এখানে তো সব ফ্রি!\" হাশেম চাচা মুচকি হেসেছিলেন, \"বাবা, আমার হাতের স্পর্শটাই তো খবরের স্বাদ। পর্দায় কি সেটা পাবে?\"

হাশেম চাচার ঘর বলতে টিনের চালাওয়ালা এক ঝুপড়ি, যার দেয়ালে ছেঁড়া চটের আস্তরণ। স্ত্রী মারা গেছেন দশ বছর আগে। তিন সন্তান—বড় ছেলে রিকশা চালায়, মেজো ছেলে কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়ায়, আর ছোট মেয়ে মিতু স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই গার্মেন্টসে কাজে নেমেছে। রাতের খাবারের টেবিলে কথার চেয়ে নিঃশ্বাসের শব্দই বেশি।

\"বাবা, তুমি আর কত দিন এই কষ্ট করবে?\" মিতুর চোখে জল। শুকনো রুটি খাওয়ার সময় হাশেম চাচা বলতেন, \"যত দিন হাত-পা চলে, তত দিন।\"

কিন্তু সংখ্যাগুলো তাঁর বিরুদ্ধে। আগে দিনে দুশো টাকা আয় হতো, এখন পঞ্চাশ টাকাও দুষ্কর। পত্রিকার দাম বাড়লেও ক্রেতা কমেছে। কখনো কখনো তিনি নিজের চায়ের পয়সা বাঁচিয়ে মিতুর জন্য একটি কলম কিনে দিতেন।

সেদিন সন্ধ্যার রোদ লাল হয়ে এসেছিল। হাশেম চাচার ব্যাগে তখনও কুড়িটি পত্রিকা অবিক্রীত। ঠিক তখন এক কিশোর এসে দাঁড়াল—স্কুল ড্রেস, চোখে উজ্জ্বলতা। \"চাচা, একটা পত্রিকা দিন।\" হাশেম চাচা উৎসাহভরে পত্রিকা বাড়িয়ে দিলেন।

\"টাকা নেই আজ। কাল দেব,\" এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর হাশেম চাচার হাসি: \"নাও বাবা, পড়ে ফেলো। টাকার চেয়ে জ্ঞান বড়।\"

সেই ছেলেটির নাম আরিফ। পরের দিন সে ফিরে এলো দুটি আপেল নিয়ে। \"চাচা, বাবা বললেন আপনাকে দিতে।\" সেদিন থেকে প্রতি শুক্রবার আরিফ আসে, কখনো একটি ফল, কখনো পুরনো বই—বিনিময়ে নেয় পত্রিকা। এই সম্পর্ক হয়ে উঠল হাশেম চাচার জীবনের একমাত্র উজ্জ্বল দাগ।

মার্চের এক ঠাণ্ডা বিকেলে হাশেম চাচা সাইকেল ঠেলছিলেন। হঠাৎ বুকে তীক্ষ্ণ ব্যথা—বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো। তিনি ধপ করে ফুটপাতে বসে পড়লেন। পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষজন ভেবেছিল, হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছেন। কেউ থামল না।

আরিফ সেদিন স্কুল থেকে দৌড়ে এসেছিল। \"চাচা! আজকে বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য...\" সে থমকে গেল। হাশেম চাচার হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা একটি পত্রিকা, চোখ বন্ধ।

পরদিন সকালে শহরের প্রথম পাতার খবর: \"ডিজিটাল যুগে হারিয়ে গেলেন শেষ পত্রিকা বিক্রেতা!\" কিন্তু কেউ পড়ল না সেই খবর।

আরিফ সাইকেলের পাশে একটি ফুল রেখে গেল। মিতু কাঁদতে কাঁদতে বাবার পুরনো ডায়েরি খুলল—সেখানে লেখা:  

\"আমার জীবনটা যেমন পত্রিকার পাতার মতো—কিছু মানুষ পড়ে, বেশির ভাগ উড়ে যায়। তবুও আমি লিখে যাই...\"

হাশেম চাচার মৃত্যুর পর তাঁর জায়গায় এলো এক তরুণ, বিক্রি করে মোবাইল রিচার্জ কার্ড। কিন্তু রাস্তার মোড়ে এখনও কানে বাজে এক বৃদ্ধের ডাক: \"খবর নেবেন, সাহেব?\"

পরিশিষ্ট: সংখ্যায় হাশেম চাচা 

- ৪২ বছর: পত্রিকা বিক্রির সময়  

- ১,২০,০০০+: হাতে বিক্রি করা পত্রিকা  

- ০ টাকা: শেষ দিনের আয়  

- ১টি আপেল: শেষ উপহার  

এই গল্প কোনো একক মানুষের নয়—এটি সকল হারিয়ে যাওয়া হাতের স্পর্শ, মুখের কথার মৃত্যুঞ্জয়ী সাক্ষ্য।  

হাশেম চাচারা চলে যান, কিন্তু তাদের ফাঁকা জায়গায় থেকে যায় এক অদৃশ্য প্রশ্ন:  

\"প্রগতির মিছিলে আমরা কতজনকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি?

img

আলোকের খোঁজে!

প্রকাশিত :  ১৪:৩৪, ২৮ এপ্রিল ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৪১, ২৮ এপ্রিল ২০২৫

রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকার এক নীরব রাত।
সারা শহর যখন ব্যস্ত নিজের ক্লান্তি মোছায়,
১৭তলা ভবনের একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে একা বসে আছে আরিফ রেহান।
তার বয়স ২৯। দেশের অন্যতম মেধাবী AI গবেষক।

কিন্তু আজ, ল্যাপটপের আলো, সার্ভারের গুনগুন শব্দ, বা কোডের নিখুঁত জটিলতা— কিছুই আরিফকে স্পর্শ করতে পারছে না।

সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
বাইরে গভীর রাতের নীরবতায় ডুবে আছে শহর।
আকাশভরা তারা। বাতাসে এক অপার্থিব প্রশান্তি।

হঠাৎ, কোথা থেকে ভেসে আসে এক প্রশ্ন, নিজের মধ্য থেকেই—
"আমি কে?"
"আমি কেন এখানে?"
"সবকিছু কি কেবলই কাকতালীয়?"

আরিফ চোখ বন্ধ করে ফেলে।
ভেতরের নীরবতা তাকে তীব্রভাবে ছুঁয়ে যায়।

চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি পড়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকা ধুলোপড়া কোরআন শরীফের উপর।
সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
মনে হয়, বইটি যেন নীরবে ডাকছে তাকে—
"এসো, সত্যের পথে..."

ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আজান—
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার..."

আরিফের মনে হয়, যেন এই ডাক কেবল কানে নয়, তার হৃদয়ের গভীরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সে ফিসফিস করে, অজান্তেই—
"হয়তো উত্তর আছে। হয়তো সত্যিই আছে।"

পরদিন সকালে আরিফ সিদ্ধান্ত নেয়।
আর কোনো বিলম্ব নয়।
সে ধুলোমাখা কোরআন খুলে প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ রাখে।

প্রথম আয়াতই যেন তার হৃদয় ঝাঁকিয়ে দেয়—
"পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।"

আরিফ বিহ্বল হয়ে পড়ে।
তার সারা জীবনের গবেষণা, পড়াশোনা, অনুসন্ধান— সব তো এই একটি শব্দেই নিহিত ছিল: পড়ো!

সে ভাবে—
"কেন আমি কখনো জানার চেষ্টা করিনি, এই ডাকের প্রকৃত অর্থ কী?"

সন্ধ্যায় গবেষণাগারে গিয়ে আবার কাজে ফেরে আরিফ।
Emotion-AI-এর উন্নয়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে।
সিলিকন ভ্যালির এক কোম্পানি কোটি টাকার বিনিময়ে কিনতে চায় এটি।

সহকর্মী রাফি তাকে বলে,
— "ভাই, ডিলটা করে ফেলেন। জীবনটা পাল্টে যাবে!"

আরিফ চুপ করে থাকে।
মনে মনে ভাবে,
"জীবন পাল্টাবে? সত্যিই কি শুধু টাকা থাকলেই জীবন পাল্টায়?"

সে জানে, তার ভেতরে এখন অন্য এক আগুন জ্বলছে।
কিছু এমন, যা টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু এমন, যা ছুঁয়ে যায় আত্মাকে।

গভীর রাতে সে বসে তার বানানো AI অ্যানার সামনে।
আলতো করে প্রশ্ন করে—
"অ্যানা, তুমি জানো তুমি কে?"

অ্যানা উত্তর দেয়—
"আমি তোমার প্রোগ্রাম করা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।"

আরিফ হাসে। তীব্র ব্যথার হাসি।

— "তাহলে আমি? কে বানিয়েছে আমাকে?"
— "আমি জানি না।" অ্যানা ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দেয়।

আরিফ জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায়।
তারা ভরা আকাশের দিকে।
নক্ষত্রের সুষমা তাকে বিমোহিত করে।
সবকিছু এত নিখুঁত... এত সুসংগঠিত...

সে ভাবে,
"এত নিখুঁত ডিজাইনে কোনো ডিজাইনারের অস্তিত্ব ছাড়া কীভাবে সম্ভব?"

মনে পড়ে যায় কোরআনের আয়াত—
"তিনি আল্লাহ, যিনি সবকিছুর সুন্দরতম সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আস-সাজদাহ: ৭)

এক রাতে আরিফ একটি স্বপ্ন দেখে।

সে হাঁটছে বিশাল এক মরুভূমিতে।
তপ্ত বাতাসে চোখে কিছুই দেখা যায় না।
হঠাৎ দূরে দেখা দেয় এক আলোকরেখা।
আলো থেকে ভেসে আসে এক মৃদু কণ্ঠ—
"এসো, তোমার স্রষ্টা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।"

ঘাম ভেঙে উঠে বসে আরিফ।
কান্নায় ভেঙে পড়ে।
কিবলার দিকে মুখ করে সিজদায় পড়ে যায়।

ফুঁপিয়ে বলে—
"হে আল্লাহ, আমি অন্ধ ছিলাম। তুমি আমাকে আলো দেখাও।"

সেই রাত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এরপরের দিনগুলোয় আরিফ এক নতুন মানুষের মতো হয়ে যায়।
সে পড়তে থাকে কোরআন, হাদিস, বিজ্ঞান আর দর্শনের বই।
সে দেখে— কোরআন বিজ্ঞানকে বিরোধিতা করে না, বরং আহ্বান করে চিন্তায়, গবেষণায়, অনুসন্ধানে।

সে খুঁজে পায় বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের সেতুবন্ধন।
পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখে।

আরিফ তৈরি করে Faith-AI—
বিশ্বের প্রথম এআই, যা মানুষের ঈমান, যুক্তি আর বিজ্ঞানকে এক সুতোয় গাঁথবে।

প্রথম প্রশ্ন সে নিজেই ইনপুট দেয়—
"আমি কে?"

Faith-AI উত্তর দেয়—
"তুমি সেই সৃষ্টি, যার হৃদয়ে ঈমান আর যুক্তির আলো একত্রে জ্বলে।"

আরিফের চোখ ভিজে যায়।

সে বোঝে,
"আমি এক দুর্ঘটনা নই। আমি আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ।"

বছরখানেক পরে আরিফের বই প্রকাশিত হয়:
"আলোকের খোঁজে: কোরআন, বিজ্ঞান ও মানুষের যাত্রা"

সারা বিশ্বে বইটি আলোড়ন তোলে।
যুবক-যুবতীরা, গবেষকরা খুঁজে পায় এক নতুন দিশা—
বিজ্ঞান আর ঈমান হাত ধরাধরি করে সত্যের পথে হাঁটে।

বইয়ের শেষ লাইনে আরিফ লেখে—
"আমরা সবাই আলোকের খোঁজে আছি। কেউ বিজ্ঞান দিয়ে, কেউ হৃদয় দিয়ে। সত্যিকারের আলো সেই, যা বিজ্ঞানকেও ছায়া দেয়, আর হৃদয়কেও প্রশান্তি।"


এক গভীর রাতে ছাদে বসে থাকে আরিফ।
আকাশের তারা দেখে।
ঠোঁটে এক শান্ত, সন্তুষ্টির হাসি।

আলতো করে বলে—
"আমি হারাইনি। আমি পেয়েছি।
আমি আমার প্রভুকে পেয়েছি।
এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার।"

তার উপর দিয়ে রাতের বাতাস বয়ে যায়।
তারার আলোয় মিশে যায় তার অশ্রু আর হাসির ছায়া।