img

বাংলাদেশ: অপরাধ, সংকট ও আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ বাস্তবতা!

প্রকাশিত :  ১৭:৩৮, ১০ মার্চ ২০২৫

বাংলাদেশ: অপরাধ, সংকট ও আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ বাস্তবতা!

রেজুয়ান আহম্মেদ

বাংলাদেশ বর্তমানে এক সংকটময় সময় পার করছে। অপরাধের বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অর্থনৈতিক সংকট—এই তিনটি প্রধান সমস্যা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন ও বেকারত্বের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো মানুষের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।  

বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে অপরাধের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ছিনতাই, খুন, সশস্ত্র ডাকাতির মতো ঘটনা একসময় মাঝেমধ্যে শোনা গেলেও এখন তা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কর্মজীবীরা, রাতের বেলা রাস্তায় চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। পুলিশের টহল ও তদারকির অভাব এবং অপরাধীদের বারবার আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে তারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।  

যেকোনো সমাজে বেকারত্ব বাড়লে অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়—বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে অনেক তরুণ অসৎ পথে পা বাড়াচ্ছে। মাদকাসক্তি ও অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে অনেকে জীবিকার জন্য অপরাধকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এভাবে সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যা দেশ ও জাতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।  

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত চাঁদাবাজদের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন। শিল্প এলাকা, বাজার ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নষ্ট হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাবে।  

বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। ধর্ষণের শিকার নারীরা দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি সামাজিক লজ্জা ও অপমানের ভয়ে আইনি লড়াই এড়িয়ে চলেন। এ অবস্থা পরিবর্তনে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি নারী নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতা জোরদার করা জরুরি।  

দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচার না হওয়ায় সমাজে \"বিচারহীনতার সংস্কৃতি\" প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে, ফলে দুর্বল জনগোষ্ঠী আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য স্বাধীন ও স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।  

বাংলাদেশ বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের ফলে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে তাদের হতাশা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াবে।  

সংকট উত্তরণে করণীয়  

এই সংকট কাটাতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ হলো:  

১.আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি: আধুনিক প্রযুক্তি ও নজরদারি বাড়িয়ে পুলিশের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে।  

২.দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।  

৩.চাঁদাবাজি রোধ: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাবিহীন কঠোর অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিতে হবে।  

৪.নারী নিরাপত্তা জোরদার: নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট চালু করতে হবে।  

৫.অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার: বিনিয়োগবান্ধব নীতি, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।  

৬.শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজকে উৎপাদনশীল করে তুলতে হবে।  

 ৭.নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা: পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে।  

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের কঠোর নীতির পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনই এই মুহূর্তের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।


রেজুয়ান আহম্মেদ: কলামিস্ট, বিশ্লেষক; সম্পাদক অর্থনীতি ডটকম

বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

যেভাবে গভীর গর্তে পড়ে গেল শিশু সাজিদ, জানালেন মা

প্রকাশিত :  ১৮:১৯, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজশাহীর তানোরে মায়ের সঙ্গে মাঠে গিয়ে একটি গভীর গর্তে পড়ে যায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। পরিত্যক্ত নলকূপের জন্য গত বছর খোঁড়া প্রায় ৪০ ফুট গভীর সেই গর্তটি খেয়াল করতে পারেননি মা কিংবা শিশু—ফলে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় সে। তারপর থেকেই পুরো এলাকায় শুধুই উৎকণ্ঠা। শুরুতে সাড়া পাওয়া গেলেও ক্রমেই সে সাড়া মিলিয়ে যেতে থাকে।

আজ বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শিশু সাজিদ পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট গ্রামে রাকিবের ছেলে।

শিশুটির মা রুনা খাতুন জানান, বেলা একটার দিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পাশের মাঠে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ সাজিদ ‘মা’ বলে ডাকার শব্দে তিনি পেছনে তাকান, কিন্তু তখন আর ছেলে পাশে নেই—গর্তের ভেতর থেকে তাকে ডাকছে।

খড়ের নিচে লুকিয়ে থাকা গর্তটি বুঝতে না পেরে সেখানেই পা দিয়ে নিচে পড়ে যায় শিশু সাজিদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে এবং একসময় পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাজারো মানুষ ভিড় করে ঘটনাস্থলে। এতে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে জানায় প্রশাসন।

সেখানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স ও জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারে কাজ করছে; গর্তে আলো ও বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, এক বছর আগে জমির মালিক কছির উদ্দিন সেচের জন্য সেমি ডিপ নলকূপ বসাতে গিয়ে এই গর্তটি খনন করেছিলেন। কিন্তু পানি না মেলায় কাজটি আর এগোয়নি— ফলস্বরূপ খোলা অবস্থাতেই রয়ে যায় বিপজ্জনক এ গর্তটি। আজ সেই অবহেলাই যেন প্রাণ সংকটে ফেলেছে দুই বছরের নিষ্পাপ সাজিদকে।

শিশুটির মা খড় তুলতে মাঠে গিয়েছিলেন। সেই সময় খেলতে থাকা সাজিদ হঠাৎ গর্তে পড়ে যায়। প্রথমে স্থানীয়রা প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাকে তুলতে পারেননি। পরে খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসে।
তানোর, রাজশাহী সদর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩টি স্টেশনের ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। গর্তের ভেতরে পাইপ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে, যেন সাজিদ বেঁচে থাকার শক্তিটুকু ধরে রাখতে পারে। পাশেই স্কেভেটর দিয়ে খনন চলছে। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত খোঁড়া হয়। মাটি সরানোর কাজে লাগানো হয়েছে দুটি ট্রাক্টর। খননকাজ শেষ হতে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক দিদারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, স্থানীয়দের প্রাথমিক উদ্ধার চেষ্টায় কিছু মাটি গর্তে পড়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেছে। ক্যামেরা নামিয়ে শিশুটির অবস্থার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। মানুষের ভিড় আর কোলাহলে শিশুটির সাড়া ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। শিশুটি জীবিত আছে নাকি মারা গেছে তা নিশ্চিত নয়। উদ্ধার কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ এর আরও খবর