‘অক্ষর ও অশ্রু’
ঢাকার বাংলাবাজারের একটি গলি থেকে এক সকালে চিঠিটি এসেছিল। হাতের লেখা ঝাপসা, খামের কোণায় জমাট বৃষ্টির দাগ। আকবর আলী, সাহিত্যিক প্রেস-এর মালিক, চা খাওয়ার ফাঁকে চিঠিটি খুললেন। ভিতরে ছিল এক পুরনো ডায়েরি—মলাটে লেখা "জলছবি"। প্রথম পাতায় নাম লেখা ছিল: শাহানা বেগম। আকবরের হৃদস্পন্দন থেমে গেল। শাহানা... যে নারীকে সে চিনত এক যুগ আগে, যখন বাংলাবাজারের দোকানে দোকানে তার কবিতার বই বিক্রি হতো ঝড়ের গতিতে।
চিঠিতে কেবল এক লাইন: "আমি মরার আগে এটা ছাপো। নাহলে আমার সব কথাই মিথ্যা হয়ে যাবে।"
সাহিত্যিক প্রেস বাংলাবাজারের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে যেন কালের ধুলোয় মোড়া এক সিন্দুক। ১৯৬৭ সালে আকবরের বাবা শুরু করেছিলেন এই ছাপাখানা। তখন এখানে ছাপা হতো বিপ্লবী কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, আর নারী জাগরণের উপন্যাস। এখন? আকবর টিকে আছেন নবম-দশম শ্রেণির গাইড বই আর মৃত্যুসংবাদের কার্ড ছাপিয়ে। দেয়ালে টাঙানো পুরনো ক্যালেন্ডারে শাহানার কবিতা: "জীবন মানে এক টুকরো কাগজ, যার উপর বৃষ্টি লিখে যায় অদৃশ্য অক্ষর..."
স্ত্রী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। মেয়ে তাহমিনা এখন মালয়েশিয়ায়, আইটি ইঞ্জিনিয়ার। শেষ কথা বলেছিল: "বাবা, তুমি কেন এই মরচেধরা যন্ত্রের সাথে আটকে আছো? ডিজিটাল যুগে কেউ বই কিনে না!" আকবরের টেবিলের ড্রয়ারে তাহমিনার ছোটবেলার আঁকা ছবি—একটি ঘর, তিনটি মানুষ, সূর্য হাসছে।
১৯৯২ সাল। একুশে বইমেলায় শাহানার প্রথম কবিতার বই "নদী আমার মা" ছাপিয়েছিল সাহিত্যিক প্রেস। আকবর তখন যুবক, শাহানা সদ্য বিবাহিতা। তার কবিতায় ছিল পদ্মার জলে ভাসা নারীর আর্তনাদ, স্বামীর নির্যাতন, আর একাকী মাতৃত্বের যন্ত্রণা। বইটি বেস্টসেলার হয়েছিল, কিন্তু শাহানার স্বামী বই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন লজ্জায়। এক রাতে শাহানা আকবরের দোকানে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল: "আমার কথা লেখা বন্ধ করো, নাহলে ও আমাকে মেরে ফেলবে।"
তারপর থেকে শাহানা নিভে গেল। গুজব শোনা গেল, স্বামী তালাক দিয়েছে, মেয়েকে নিয়ে গ্রামে চলে গেছে।
"জলছবি" কোনো উপন্যাস নয়—একটি মায়ের ডায়েরি। পাতায় পাতায় লেখা শাহানার যন্ত্রণাময় জীবনের হিসাব: মেয়ে জলিকে নিয়ে পালানো, রিকশায় ঘুমানো রাত, সেলাইয়ের কাজ করে দুটো ভাত জোগাড় করা। শেষ পাতায় লেখা: "আকবর ভাই, আপনি একবার বলেছিলেন, আমার শব্দে নদীর গান আছে। এই নদী এখন বিষাক্ত। জলিকে বাঁচানোর একটাই উপায়—এই ডায়েরি ছাপা। ওর বাবা চায় না ও জানুক আমি কে..."
আকবর ডায়েরিটি বুকে চেপে ধরে বসে রইলেন অন্ধকার দোকানে। বাইরে বাংলাবাজারের হৈচৈ, ভেতরে কেবল পুরনো প্রিন্টিং মেশিনের টিকটিক শব্দ।
শাহানার ফোন নম্বরটি অকার্যকর। গ্রামের ঠিকানায় গিয়েও কেউ জানে না তার খবর। আকবর সিদ্ধান্ত নিলেন বই ছাপবেন। কিন্তু টাকা কোথায়? মেশিনের কিছু যন্ত্রাংশ বদলানো দরকার, কাগজের দাম আকাশছোঁয়া। তাহমিনাকে ফোন করলে সে বলল: "বাবা, তুমি আবার সেই পুরনো গল্পে ঢুকেছো? এই বয়সে এসে কী পাগলামি!"
আকবর বাবার সোনার চেনটি বেচলেন, স্ত্রীর গয়না বন্ধক দিলেন। রাতের পর রাত জেগে ডায়েরিটি টাইপ করলেন নিজেই। প্রুফ রিডিং করতে গিয়ে শাহানার চিঠির লাইন বারবার পড়লেন: "জলিকে বলো, আমি ওকে ভালোবেসেও অধিকার রাখিনি..."
বইমেলার প্রথম দিন। আকবর দাঁড়িয়ে আছেন সাহিত্যিক প্রেস-এর স্টলে। "জলছবি"-র মলাটে শাহানার ছবি—তিরিশ বছর আগের তরুণী। বিকেল হতে না হতেই আকাশ ভেঙে পড়ল বৃষ্টি। মানুষ ছুটল বাড়ির দিকে। মাত্র বারো কপি বিক্রি হলো।
সেদিন রাতে আকবরের শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। হাসপাতালে ভর্তি করে পাঠাল প্রতিবেশীরা। তাহমিনা এসেছিল তিন দিন পর, যখন আকবর ভেন্টিলেটরে, চোখে অসহায় প্রশ্ন: "জলিকে খুঁজেছ?"
মৃত্যুর আগে আকবর তাহমিনার হাতে একটা ঠিকানা গুঁজে দিয়েছিল—মেয়ে জলির হোস্টেলের ঠিকানা।
আকবরের মৃত্যুর পর তাহমিনা দোকানটা বন্ধ করতে এসেছিল। টেবিলের ড্রয়ারে পেয়েছিল "জলছবি"-র অবিক্রিত কপি, আর এক চিরকুট: "তাহমিনা, আমি জানি তুমি বুঝবে না। কিন্তু শব্দগুলো মরতে দেয়া যায় না..."
জলিকে খুঁজে পেতে সময় লাগল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জলি কাঁদতে কাঁদতে বলল: "আম্মু ক্যান্সারে মারা গেছেন গত বছর। এই ডায়েরির কথা জানতাম না।"
তাহমিনা বইটি পুনরায় মুদ্রণ করল। প্রচ্ছদে শাহানা ও জলির যুগল ছবি। বইমেলায় লাইনের পর লাইন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। মঞ্চে জলি বলল: "আমার আম্মু আর আকবর চাচা—এঁরা ছিলেন দুই নদী, যাদের স্রোত কেউ দেখেনি।"
সাহিত্যিক প্রেস-এর জায়গায় এখন শপিং কমপ্লেক্স। তাহমিনা শুধু রেখে গেছে সেই পুরনো প্রিন্টিং মেশিন—বাবার স্মৃতি হিসেবে। মেশিনের উপর এক কপি "জলছবি", যার পাতায় পাতায় বাংলাবাজারের ধুলো আর বৃষ্টির দাগ মিশে গেছে।
কোনো এক সন্ধ্যায় তাহমিনা বইয়ের শেষ লাইনটি পড়ে: "মা হওয়া মানে নিজেকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলা, যাতে সন্তানের পায়ে কাঁটা না বিঁধে..."
বাইরে বৃষ্টি নামে। মনে হয়, আকবরের টিনশেড ছাদে ফোঁটার শব্দ যেন এক অদৃশ্য প্রেস মেশিনের টিকটিক...



















