img

হবিগঞ্জে ছিনতাইয়ের অভিযোগে দুজনকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, শরীরে আগুন

প্রকাশিত :  ১০:২৭, ১৪ মার্চ ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫৪, ১৪ মার্চ ২০২৫

 হবিগঞ্জে ছিনতাইয়ের অভিযোগে দুজনকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, শরীরে আগুন

হবিগঞ্জের বাহুবলে ছিনতাই ও মুঠোফোন চুরির অভিযোগে এক তরুণকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করছেন কিছু লোক। পরে সেই তরুণের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী তরুণ চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনাটি হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সিলিমনগর গ্রামে। তবে একজন নয়, দুই তরুণের সঙ্গে গত শনিবার রাতে ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণদের একজন বৃহস্পতিবার ১৩ জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ আদালতে একটি মামলা করেছেন।

বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে দুই তরুণকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বাহুবল উপজেলার সিলিমনগর গ্রামের আবদুল কাইযুমের ছেলে সোহেল মিয়া গত শনিবার পশুর হাটে একটি গরু বিক্রি করে বাড়িতে ফিরছিলেন। রাত ৯টার দিকে উপজেলার কটিয়াদি বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পথে নির্জন রাস্তায় কয়েকজন ছিনতাইকারী সোহেলকে ঘিরে ধরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। এ সময় তিনি চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তখন ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় সোহেল উপস্থিত লোকজনের কাছে সহিদুল ইসলাম (২৪) নামের এক তরুণকে দেখিয়ে দাবি করেন, তিনি ছিনতাই জড়িত। এরপর ওই তরুণকে ধরে সিলিমনগরে সোহেলের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। পরে সোহেল পাশের বনদক্ষিণ গ্রামের আরেক তরুণ জাহেদ আলীকে (২০) ফোন করে ‘জরুরি কাজ আছে’ বলে বাড়িতে ডেকে আনেন। জাহেদ তার বাড়িতে গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তুলে গাছে বেঁধে নির্যাতন শুরু করেন। পরে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগী দুই তরুণ বর্তমানে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জাহেদ আলীর শরীরের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার শরীরে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাধীন আরেক তরুণ সহিদুলের বাঁ হাতের কিছু অংশ ঝলছে গেছে।

জাহেদ আলী বলেন, তিনি কটিয়াদি বাজারে একটি দর্জির দোকানে কাজ করেন। তাকে মুঠোফোনে কল করে সোহেল বাড়িতে ডেকে নেন। যাওয়ার পর সোহেল দাবি করেন, তার দুটি মুঠোফোন বাড়ি থেকে চুরি হয়েছে। চুরির সঙ্গে তিনি জড়িত। পাশাপাশি ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার অপবাদ দিয়ে সোহেল ও তার স্বজনেরা অমানসিক নির্যাতন করেন। পরে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি জড়িত হতাম, তাহলে সোহেলের ফোনে তাদের বাড়িতে যেতাম না। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়।’

ভুক্তভোগী সহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি গ্রামে গ্রামে মাছ বিক্রি করেন। ওই দিন রাতে কটিয়াদি বাজারে কাজে গেলে রাত ৯টার দিকে হঠাৎ করে সোহেলের নেতৃত্বে কিছু লোক তাকে ধরে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে গাছে বেঁধে নির্যাতন করেন। তারা তাকে নির্যাতন করে জাহেদ আলীর নাম বলতে বলেন। তিনি নাম না বলায় নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ে।

সিলিমনগর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ মিয়া বলেন, ‘গত শনিবার রাতে আমরা গ্রামের আবদুল কাইযুমের বাড়িতে দুজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করার দৃশ্য দেখেছি। তারা তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও মোবাইল চুরির অভিযোগ করেন।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সোহেল মিয়া বলেন, সহিদুল ও জাহেদ এলাকার চিহ্নিত অপরাধী। তারা চুরি-ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। তিনি ওই দিন রাতে আজমিরীগঞ্জে গরু বিক্রি করে টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। তখন সহিদুল ও জাহেদ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। এ ছাড়া আগের দিন তার বাড়ি থেকে দুটি মুঠোফোন চুরি হয়। ওই চুরির সঙ্গেও তাঁরাই জড়িত বলে তিনি দাবি করেন।

বাহুবল থানার ওসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ওই অপরাধে তারা জড়িত কি না, তা তদন্তের বিষয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি চুরির মামলা আছে বাহুবল থানায়।

ওসি বলেন, দুই তরুণকে নির্যাতনের ঘটনায় জাহেদ আলী বাদী হয়ে আজ হবিগঞ্জ আদালতে ১৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। মামলার পর আমির মিয়া নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি মামলার ৫ নম্বর আসামি।

img

শ্রীমঙ্গলে ইতিহাসের নতুন দিগন্ত: দেবী সরস্বতীর ষোড়শ রূপের ব্যতিক্রমী পূজা

প্রকাশিত :  ০৪:২১, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: চায়ের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল এবার সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক ও ব্যতিক্রমী ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক আয়োজনের। শ্রীমঙ্গল উপজেলার সবুজবাগ গোসাইবাড়ি রোড সংলগ্ন লালবাগ যুব কিশোর সংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো দেবী সরস্বতীর ষোড়শ রূপের পূজা—যা এশিয়া মহাদেশে এই প্রথম। একই পূজামণ্ডপে দেবী সরস্বতীর ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন রূপ এবং মূল প্রতিমাসহ মোট ১৭টি মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করা হয়েছে।

এই আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্প ও দর্শনের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। প্রতিটি রূপে দেবী সরস্বতী আবির্ভূত হয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও ব্যঞ্জনায়। কোথাও তিনি জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, কোথাও অজ্ঞতা বিনাশী শক্তি, আবার কোথাও সৃজনশীলতা, সংগীত ও মানবিক চেতনার প্রতীক।

গৌরী রূপে দেবী সরস্বতী জ্ঞান, মেধা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে মানবচেতনাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেছেন। মানবী রূপে তিনি মানবজাতির কল্যাণ ও প্রজ্ঞাবৃদ্ধির বার্তা বহন করেন। মানসী রূপে মন, চেতনা ও বিবেক আলোকিত করেন, আর মহাকালী ও কালী রূপে অজ্ঞতা ও অসত্য ধ্বংসের শক্তিকে প্রতিফলিত করেন।

বজ্রশৃঙ্খলা রূপে দেবী অজ্ঞতার শৃঙ্খল ভেঙে জ্ঞানকে অপরাজেয় শক্তিতে রূপ দেন। কুলি শাঙ্কুশা রূপে বিদ্যা, বুদ্ধি ও সংযমের শিক্ষা দেন। মহামানব, প্রজ্ঞপ্তী ও চকেশ্বরী রূপে সত্য–অসত্যের পার্থক্য অনুধাবন, নৈতিকতা ও শক্তির সমন্বয়ের দর্শন ফুটে ওঠে।

পুরুষ দত্তা ভারতীয়, বৈরাট্যা, মোহিনী ও গান্ধারী রূপে ভাষা, বাগ্মী শক্তি, সৃজনশীলতা ও সংগীতকলার বিকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছেন দেবী সরস্বতী। সর্বশেষ আচ্ছুপ্তা রূপে তিনি মায়া ও অজ্ঞতা দূর করে মানবচেতনাকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন।

নিপুণ কারুকাজ, রঙের নান্দনিক ব্যবহার এবং প্রতিটি প্রতিমার ভাবনাগত গভীরতা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি মূর্তি যেন আলাদা আলাদা গল্প বলে—মানুষের মন, বিবেক ও বুদ্ধির গভীরে আলো জ্বালানোর গল্প।
লালবাগ যুব কিশোর সংঘের সভাপতি কৌশিক দত্ত ও উপদেষ্টা প্রান্ত মিশ্র জানান, “এশিয়া মহাদেশে এই প্রথম দেবী সরস্বতীর ষোড়শ রূপের এমন পূর্ণাঙ্গ আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। আমাদের লক্ষ্য ছিল দেবী সরস্বতীকে কেবল বিদ্যার দেবী হিসেবে নয়, বরং মানবচেতনার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা।”
সকাল থেকেই পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, এই ব্যতিক্রমী আয়োজন কতটা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সাধারণ মানুষের।

শ্রীমঙ্গলের এই অনন্য উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, শিল্প ও মানবিক চেতনার এক স্মরণীয় মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর