শেয়ারবাজারে নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ: ন্যায্য অধিকার চাই, করুণা নয়!
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কোনো সাধারণ লেনদেনের জায়গা নয়। এটি লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, শ্রম, সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক। এই বাজারে কেউ খেলতে আসে না; তারা আসে স্বপ্ন নিয়ে—সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে, বার্ধক্যের জীবন সুরক্ষিত করতে, নিজেদের সীমিত আয়ের মধ্যেও আস্থা গড়ার আশায়।
কিন্তু আজ সেই স্বপ্ন ও আস্থা ধূলিসাৎ। শেয়ারবাজার এক বিভীষিকাময় মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজারো বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারাচ্ছে, জীবনযাত্রার ভিত্তি ভেঙে পড়ছে, মাথার উপরের ছাদ উধাও হয়ে যাচ্ছে—আর রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকায়।
আমরা কী চেয়েছিলাম?
আমরা চেয়েছিলাম একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার—যেখানে তথ্যভিত্তিক, নিয়মতান্ত্রিক ও নৈতিকভাবে শেয়ার লেনদেন হবে। আমরা চেয়েছিলাম সরকার আমাদের পক্ষে থাকবে—কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে, লুটেরাদের প্রতিহত করবে।
কিন্তু আমরা পেয়েছি ধোঁকা, মিথ্যা আশ্বাস আর নৈরাজ্য। যে সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, তারা হয় নীরব থেকেছে, নয়তো কার্যত নিষ্ক্রিয়। তারা আমাদের আশ্রয় হয়নি, বরং অনেকক্ষেত্রে বোঝাই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বারবার প্রতারণা, বারবার নিঃস্ব হওয়া!
২০০৯ সালের ধসের ক্ষত আজও শুকায়নি। তখনও আমরা চিৎকার করেছিলাম: \"আমরা খেলতে আসিনি, আমরা জীবন গড়তে এসেছি!\" সরকার আশ্বাস দিয়েছিল—\"আর হবে না, নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন করা হবে।\"অথচ ২০২৪-২৫ সালে এসেও আমরা সেই একই পরিস্থিতিতে—আরও বেশি ক্ষতবিক্ষত, আরও বেশি নিঃস্ব।
কে দায়ী?
- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে তারল্য সরবরাহ না করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
- প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অসাধুভাবে কারসাজি করেছে।
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
- অনেক কোম্পানি মুনাফা লুকিয়ে মিথ্যা EPS দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়েছে।
এটি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধই নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
একজন বিনিয়োগকারীর করুণ গল্প:
রফিকুল ইসলাম, একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। জীবনের শেষ সঞ্চয় ১২ লাখ টাকা তিনটি শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। আজ তার পোর্টফোলিওর মূল্য মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, \"আমার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত। ওষুধ কিনতে পারি না। বেঁচে থাকাটাই এখন শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।\"
এমন হাজারো গল্প—কেউ সন্তানকে স্কুল থেকে তুলেছেন, কেউ মা-বাবার চিকিৎসা বন্ধ করেছেন, কেউবা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন।
আমাদের ন্যায্য দাবি:
আমরা ভিক্ষা চাই না, করুণা চাই না। চাই ন্যায্য অধিকার ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। আমাদের দাবিগুলো যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত:
১. শেয়ারবাজার পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা (Market Rescue Plan) অবিলম্বে ঘোষণা করতে হবে।
২. প্রধান উপদেষ্টার তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন টাস্কফোর্স গঠন করে বাজার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাজারে ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য ইনজেকশন দিতে হবে।
৪. কারসাজিতে জড়িত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
B৫. ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজ প্রদান করতে হবে।
৬. প্রতিটি কোম্পানির আয়-ব্যয়ের নিরপেক্ষ অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন আশা:
বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর নৈতিক নেতৃত্বে এই বাজার পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। আমরা তাঁর কাছে আবেদন করছি: \"আপনিই আমাদের শেষ ভরসা। আমাদের দিকে ফিরে তাকান!\"
আমাদের আকুতি:
শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নামে না, কারণ তারা গালাগালি শুনতে চায় না। তারা নিঃস্ব হয়েছে, চোখে জল নিয়ে ঘরে ফিরেছে। তারা প্রতিবাদ করে না, ভাঙচুর করে না—তাই হয়তো রাষ্ট্র তাদের পাত্তা দেয় না।
কিন্তু মনে রাখবেন, যখন রাষ্ট্র তার সৎ নাগরিকদের কান্না উপেক্ষা করে, তখন তার পতন শুধু অর্থনীতিতে নয়—নৈতিকতায়ও ঘটে।
আজ আমরা শুধু লিখছি। কাল যদি আমরা আর না থাকি, তাহলে দোষ আমাদের নয়। আমরা শুধু সম্মানজনক জীবনের অধিকার চেয়েছিলাম। রাষ্ট্র যদি তা দিতে ব্যর্থ হয়, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না।
শেয়ারবাজার বাঁচান। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে দিন। আমাদের স্বপ্ন রক্ষা করুন।



















