img

পদ্মা সেতু প্রকল্পের রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস

প্রকাশিত :  ০৯:৩০, ০৮ জুন ২০২৫

পদ্মা সেতু প্রকল্পের রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস

ঈদের পবিত্র সকালে যখন সারা দেশের মানুষ কোরবানির উৎসবে ব্যস্ত,  তখন পদ্মা তার ভয়াল রূপে আছড়ে পড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরার বুকজুড়ে। এক ফোঁটা আনন্দ নয় বরং কেবলই কান্না, আতঙ্ক আর সর্বস্ব হারানোর যন্ত্রণায় কাতর নদীপাড়ের মানুষ।

হঠাৎ ভোররাতে শুরু হওয়া ভাঙনে পদ্মা সেতু প্রকল্প রক্ষা বাঁধের আড়াইশ’ মিটার অংশ নিমিষেই গিলে নেয় অন্ধকার জলের অতল গহ্বরে। এ যেন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, যেন পদ্মা নিজেই প্রতিশোধ নিতে নেমেছে।

ভাঙন ঠেকানো না গেলে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে রাস্তাঘাট, হাটবাজারসহ শতাধিক ঘরবাড়ি। দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের। আর ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

স্থানীয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় মাঝিরঘাট থেকে পূর্ব নাওডোবা পর্যন্ত নির্মিত হয় প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রক্ষা বাঁধ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এই প্রকল্পে ব্যয় হয় ১১০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর না ঘুরতেই ধসের শুরু হয়।
গত বছরের নভেম্বরেই নাওডোবা এলাকায় ১০০ মিটার বাঁধ ধসে যায়, যার পুনর্নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যয় করে আরও ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এবার সেই সংস্কার করা এলাকাসহ আরও একটি স্থান একদিনেই ধসে গেছে নদীতে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পদ্মা সেতুর পূর্ব পাশের নদীর গভীরতা বাড়ায় পুরো বাঁধ এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
মাঝিরঘাট বাজারে প্রায় ২০০ দোকান। সবই এখন ভাঙনের মুখে। ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, দোকানে দুই দিন আগেই নতুন মাল এনেছি ঈদের বিক্রির জন্য। এখন সবই শেষ। দোকানটা নদীতে চলে গেলে কী করব? আমাদের ঈদ শেষ নয়, জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে
জাজিরার মাঝিরঘাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম বলেন, গতকাল ঈদের জন্য ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু এবার কোনো ঈদ হলো না। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি নদী আমাদের ঘর গিলে নিচ্ছে। ঈদের নামাজ পড়া তো দূরের কথা, ঘর সরাতে ব্যস্ত ছিলাম। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, জানি না।
ভাঙনের শিকার হওয়া দেলোয়ার হোসেন বলেন, আজকে ঈদের দিনেও আমার কোনো ঈদ নেই। আমার বাড়িঘর সব পদ্মা নদীতে ভাইঙ্গা লইয়া যাইতেছে। ঘরবাড়ি সরাইয়া সারতে পারছি না। আমি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। অতি তাড়াতাড়ি এই জায়গায় যদি বস্তা না ফেলা হয় তাহলে পুরো এলাকা নদীগর্ভে চলে যাবে।
পদ্মা পাড়ের বাসিন্দা বাদশা শেখ বলেন, কয়েক বছর ধরে পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে পাড়ের কাছে চলে এসেছে। আজ ভাঙনের ফলে রক্ষা বাঁধের দুটি স্থানে অন্তত আড়াইশ মিটার বাঁধ ধসে গেছে। এলাকাবাসী খুব আতঙ্কে আছি। আমরা চাই নদীতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি শক্ত একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।
মাঝিরঘাট বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, আমাদের এই বাজারে ২০০ দোকান আছে। পাকা ঘর, বিল্ডিং করা। আমাদের এগুলো সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো হোক।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল বলছেন, বারবার মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে পদ্মা পাড়ে কোনো স্থায়ী সমাধান আসছে না। রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্দেশ্যই ছিল নদীভাঙন রোধ। অথচ এখন সেই বাঁধই যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
এদিকে নদী তীরে দাঁড়িয়ে আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মানুষগুলোর চোখে এখন একটাই প্রশ্ন- ‘আমাদের কী হবে?’ ঈদের দিন যখন পুরো দেশ আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন শরীয়তপুরের জাজিরার মানুষ গৃহহীন হয়ে আশ্রয় খুঁজছেন অন্য কোথাও। এটা কেবল একটি বাঁধ ধস নয়, বরং সরকারের অবহেলা, পরিকল্পনার ব্যর্থতা এবং প্রকৃতির প্রতিশোধের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। পদ্মা এবার শুধু ঘর নয়, কেড়ে নিচ্ছে ঈদের আনন্দ, মানুষের স্বপ্ন এবং জীবনের নিরাপত্তা।

 এদিকে ধসে পড়া বাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আর দ্রুত বাঁধটির ভাঙনে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুমন চন্দ্র বনিকের। তিনি বলেন, আমরা খবর পেয়ে ভাঙনস্থল পরিদর্শন করেছি। অতি শিগগিরই ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

যেভাবে গভীর গর্তে পড়ে গেল শিশু সাজিদ, জানালেন মা

প্রকাশিত :  ১৮:১৯, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজশাহীর তানোরে মায়ের সঙ্গে মাঠে গিয়ে একটি গভীর গর্তে পড়ে যায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। পরিত্যক্ত নলকূপের জন্য গত বছর খোঁড়া প্রায় ৪০ ফুট গভীর সেই গর্তটি খেয়াল করতে পারেননি মা কিংবা শিশু—ফলে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় সে। তারপর থেকেই পুরো এলাকায় শুধুই উৎকণ্ঠা। শুরুতে সাড়া পাওয়া গেলেও ক্রমেই সে সাড়া মিলিয়ে যেতে থাকে।

আজ বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শিশু সাজিদ পাঁচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট গ্রামে রাকিবের ছেলে।

শিশুটির মা রুনা খাতুন জানান, বেলা একটার দিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পাশের মাঠে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ সাজিদ ‘মা’ বলে ডাকার শব্দে তিনি পেছনে তাকান, কিন্তু তখন আর ছেলে পাশে নেই—গর্তের ভেতর থেকে তাকে ডাকছে।

খড়ের নিচে লুকিয়ে থাকা গর্তটি বুঝতে না পেরে সেখানেই পা দিয়ে নিচে পড়ে যায় শিশু সাজিদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ডাক ক্ষীণ হয়ে আসে এবং একসময় পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাজারো মানুষ ভিড় করে ঘটনাস্থলে। এতে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে জানায় প্রশাসন।

সেখানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স ও জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারে কাজ করছে; গর্তে আলো ও বাতাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, এক বছর আগে জমির মালিক কছির উদ্দিন সেচের জন্য সেমি ডিপ নলকূপ বসাতে গিয়ে এই গর্তটি খনন করেছিলেন। কিন্তু পানি না মেলায় কাজটি আর এগোয়নি— ফলস্বরূপ খোলা অবস্থাতেই রয়ে যায় বিপজ্জনক এ গর্তটি। আজ সেই অবহেলাই যেন প্রাণ সংকটে ফেলেছে দুই বছরের নিষ্পাপ সাজিদকে।

শিশুটির মা খড় তুলতে মাঠে গিয়েছিলেন। সেই সময় খেলতে থাকা সাজিদ হঠাৎ গর্তে পড়ে যায়। প্রথমে স্থানীয়রা প্রাণপণ চেষ্টা করেও তাকে তুলতে পারেননি। পরে খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসে।
তানোর, রাজশাহী সদর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩টি স্টেশনের ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। গর্তের ভেতরে পাইপ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে, যেন সাজিদ বেঁচে থাকার শক্তিটুকু ধরে রাখতে পারে। পাশেই স্কেভেটর দিয়ে খনন চলছে। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত খোঁড়া হয়। মাটি সরানোর কাজে লাগানো হয়েছে দুটি ট্রাক্টর। খননকাজ শেষ হতে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক দিদারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, স্থানীয়দের প্রাথমিক উদ্ধার চেষ্টায় কিছু মাটি গর্তে পড়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেছে। ক্যামেরা নামিয়ে শিশুটির অবস্থার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। মানুষের ভিড় আর কোলাহলে শিশুটির সাড়া ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। শিশুটি জীবিত আছে নাকি মারা গেছে তা নিশ্চিত নয়। উদ্ধার কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ এর আরও খবর