আজ ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল চাঁদ বা সুপারমুন দেখা যাবে । চলতি বছরে তিনটি পরপর সুপারমুনের মধ্যে দ্বিতীয়টি হতে যাচ্ছে আজ ৫ নভেম্বর রাতে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে রাতের আকাশ ভরে উঠবে আলো ও রঙের দারুণ মেলবন্ধনে। এই প্রাকৃতিক দৃশ্যটি দেখতে চাইলে পৃথিবীবাসীকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর নজর রাখতে হবে, কারণ কোথায় আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার থাকবে, তা জানা গেলেই চাঁদ দেখার জন্য সেরা জায়গা বেছে নিতে সুবিধা হবে।
চাঁদ যখন নিজের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে, সেই সময় পূর্ণিমা হয়। আর ওইসময় চাঁদ সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বড় আর ঝলমলে দেখায়। ফলে এ সপ্তাহের রাতগুলো হবে একটু বেশি আলো ঝলমলে ও মোহনীয়।
এই চাঁদকে ‘সুপারমুন’ বলা হয় তার কারণ, চাঁদ পৃথিবীকে একদম বৃত্তাকার পথে আবর্তন করে না। চাঁদের কক্ষপথ কিছুটা ডিম্বাকৃতি বা উপবৃত্তাকার। ফলে চাঁদ সবসময় পৃথিবী থেকে সমান দূরত্বে থাকে না, কখনো একটু কাছে আসে, আবার কখনো একটু দূরে চলে যায়।
চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে তখন সেই অবস্থাকে বলে ‘পেরিজি’। এ সময় পৃথিবী থেকে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার মাইল দূরে থাকে চাঁদ। আর চাঁদ যদি পূর্ণিমার সময় পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে থাকে বা পেরিজির ৯০ শতাংশ কাছাকাছি থাকে, তখন তাকে ‘সুপারমুন’ বলে। এ সময় আকাশে চাঁদ সাধারণ পূর্ণিমার চেয়ে বড় ও উজ্জ্বল দেখায়।
আবার এটিকে ‘বিভার মুন’ও বলা হয়। প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি মাসের পূর্ণিমারই নামকরণ করেন বিজ্ঞানীরা। এসব নামের অনেকটি শতাব্দী আগ থেকে চলে আসছে। কিছু নাম সহজে বোঝা যায়, যেমন ফেব্রুয়ারির ‘স্নো মুন’ বা জুনের ‘স্ট্রবেরি মুন’। আবার কিছু নাম বোঝা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
নভেম্বরের পূর্ণিমাকে ‘বিভার মুন’ বলার কারণ হচ্ছে, এ নামটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হত। কিছু আদিবাসী আমেরিকান গোত্র থেকে শুরু করে প্রাথমিক ইউরোপীয় বসবাসকারীদের মধ্যেও এ নামের চল রয়েছে।
এ সময়ে বিভাররা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। নিজেদের বাঁধ তৈরি ও শীতের জন্য খাদ্য সংরক্ষণ করে তারা। ফলে এই পূর্ণিমার সঙ্গে তাদের কার্যকলাপ মিলিয়ে এ নামটি এসেছে। চলতি বছরের শেষ সুপারমুনের দেখা মিলবে আগামী ৪ ডিসেম্বর।
সমুদ্রের নিচের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?
প্রকাশিত :
১০:২৩, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
সম্প্রতি দেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মাঝে বুধবার (২৬ নভেম্বর) রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ৬ দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। এর কারণে বড় কোনো সুনামির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ায় অথবা আন্দামান নিকবোর দ্বীপের দিকে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেমন, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় নয় দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পে যেখানে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেই সুনামি আফ্রিকার দেশগুলো পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। সেই সুনামির ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছিল এবং তাতে দুইজনের মৃত্যুর খবর জানা যায়।
ভূমিকম্প ও সুনামি
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা বলছেন, ‘সাগরে যদি ভূমিকম্প ছয় দশমিক পাঁচ মাত্রার উপরে যায় তারপর সে সুনামি হবে কি না, সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা সেটা পর্যবেক্ষণ করেন। কোন জায়গায় কখন হিট করতে পারে, পানির উচ্চতা কতটা হতে পারে, সেটা তারা অ্যালার্ট করেন। এটা আমরা সবময়ই টেস্ট বেসিসে করে আসছি।’
তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তবে চার মাত্রা বা এর চেয়ে দুর্বল সেসব ভূমিকম্প থেকে বড় পর্যায়ে ক্ষতির শঙ্কা থাকে না।’
আবার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্প হলেও উপকূলে সুনামির শঙ্কা থাকে। আমাদের পৃথিবীর ওপরের অংশ বা ভূপৃষ্ঠ বিভিন্ন প্লেটে ভাগ করা। এই প্লেটগুলো সবসময় নড়াচড়া করে। কোথাও প্লেট একে অপরকে ঠেলে দেয়, কোথাও পাশ কাটিয়ে যায়, আবার কোথাও নিচে ঢুকে যায়। এমন ক্ষেত্রে যেমন ভূমিকম্প হয়, তেমন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও ভূপৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। এটি মাটির ওপরে বা পানির নিচে যে কোনো জায়গায় হতে পারে।
২৩ কোটি থেকে ২৮ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর সব মহাদেশ মিলে এ রকম একক ভূখণ্ড ছিল বলে তত্ত্ব রয়েছে। এটিকে বলা হয় প্যাঞ্জিয়া। টেকটনিক প্লেটের ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক ভূখণ্ড হয়েছিল বলে জানা যায়। এর সপক্ষে অনেক ধরনের প্রমাণও রয়েছে। এর মাঝে একটি পানির নিচে থাকা দীর্ঘতম পর্বতমালা মিড আটলান্টিক রিজ যেভাবে পৃথিবীকে ভাগ করেছে। এর মাত্র ১০ শতাংশ মাটির ওপরে যা আইসল্যান্ডে পরিষ্কার দেখা যায়।
সুনামি তৈরি হয় কীভাবে
সুনামি অনেকটা বিশাল আকারের জলোচ্ছ্বাসের মতো। সাধারণত ভূমিকম্প হলেই সুনামি হয় না। সুনামির জন্য ভূমিকম্প খুব শক্তিশালী হতে হয়। এ ছাড়া মোটামুটি অগভীর সমুদ্রতলে এরকম কম্পন সৃষ্টি হওয়াটাও একটা ফ্যাক্টর হতে পারে। আর এমন কম্পন সমুদ্রের তলদেশকে ওপরে বা নিচে ঠেলে দিলে, বিশাল পরিমাণ পানি সরে গেলে সেটি সুনামি ঘটাতে পারে। এমন বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয় থেকে সুনামি হতে পারে।
বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?
এমনিতে প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীতে ভূতাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল যেটাকে রিং অফ ফায়ার বলা হয়। এরম বিভিন্ন সক্রিয় অঞ্চল বা সাবডাকশন জোন থাকে। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে। বাংলাদেশ দুইটা বড় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে, যা চট্টগ্রাম-আরাকান থেকে আন্দামানের দিকে চলে গেছে। তবে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি, সাগরের নিচে খুব নিকটবর্তী সময়ে বড় ভূমিকম্প এবং তা থেকে সুনামির শঙ্কা নেই।
ফারজানা সুলতানা বলেন, ‘নরমালি ভূমিকম্প থেকে ওইরকম সুনামির ঝুঁকি নেই, কিন্তু আন্দামান নিকোবরে হলেও ওটা আমাদের জন্য একটা সোর্স অঞ্চল। আমরা টেস্ট বেসিসে সবসময় রেডি থাকি, এটা হলে যেন আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি।’
অতীতের নানা নথিপত্রের তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলে ১৯৬২ সালে আরাকান কোস্টে প্রায় সাড়ে আট মাত্রার একটি ভূমিকম্প থেকে বড় সুনামি হয়েছিল।
বিবিসির এর আগের একটি প্রতিবেদনে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছিলেন, এই প্লেটে ভূমিকম্প হলে অবশ্যই বড় সুনামির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখানে খুব তাড়াতাড়ি এই বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে সময়কার তথ্যে জানা যায়, তখন বড় ধরনের সুনামির তৈরি হয়েছি, যা উপকূল থেকে অনেকদূর পর্যন্ত ভেতরে এসে পৌঁছেছিল। যদিও তখন মানুষ কম ছিল বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো তত বেশি হয়নি। তবে ঢাকায় নদীর পানি বেড়ে গিয়ে পাঁচশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়।
সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘এরপর আর এই অঞ্চলে এত বড় ভূমিকম্প বা সুনামির তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের হিসাবে, একবার ভূমিকম্প হওয়ার পর ওই প্লেটে শক্তি সঞ্চয় হয়ে পরবর্তী ভূমিকম্প হতে আরও ৫০০-৯০০ বছর লেগে যায়। সেই হিসাবে এখানে ওই প্লেটে (আরাকান প্লেটে) ভূমিকম্প হতে আরও ২০০-২৫০ বছর বাকি আছে।’
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ‘ফানেল শেপ’ অবস্থায় রয়েছে অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হয়ে গেছে।
সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেছিলেন, ‘আন্দামান বা ভারত মহাসাগরে যদি বড় সুনামি তৈরি হয়, ফানেল শেপ হওয়ার কারণে তার প্রভাব কিছুটা বাংলাদেশে এসেও লাগবে। যদিও সেটা হয়তো ইন্দোনেশিয়ার মতো অতটা ভয়ানক হবে না। ভূমিকম্প সম্পর্কে খুব আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব না হলেও যেহেতু ভূমিকম্পের পরে পানিতে সুনামির সৃষ্টি হয়, ফলে সুনামি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করা যায়।’
তবে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে ভূমিকম্পের চেয়ে ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যে ভূমিকম্পের যে ঝুঁকি রয়েছে, সেটিই এখন বেশি শঙ্কার জায়গা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।