শ্রীমঙ্গলের টাইগার মোঃ আহাদ মিয়া: সাধারণ থেকে জননন্দিত নেতা
সংগ্রাম দত্ত
শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম—মোঃ আহাদ মিয়া। একেবারে সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে তিনি হয়েছিলেন সফল ব্যবসায়ী, সংসদ সদস্য ও পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন মানবিক জননেতা, সমাজসেবক ও উন্নয়নের কারিগর। তাঁর কর্ম, সাহস, এবং জনসম্পৃক্ততা আজও শ্রীমঙ্গলের মানুষের হৃদয়ে অমলিন।
শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন
১৯৪৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলা সদরের জগন্নাথপুর গ্রামে এক ধর্মপরায়ণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ আহাদ মিয়া। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও উদ্যমী আহাদ মিয়া জীবনযুদ্ধে নিজের পথ নিজেই গড়ে নেন। শৈশব থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক সহজাত প্রবণতা তাঁকে ভবিষ্যতের জননেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ
১৯৭৪ সালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হয়ে রাজনীতির ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেন মোঃ আহাদ মিয়া। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জনতা দল গঠিত হলে, শ্রীমঙ্গলের আওয়ামী লীগ নেতা ডা. মোঃ আব্দুল আলীর আহ্বানে আহাদ মিয়া সেই দলে যোগ দেন।
পরে ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে জাতীয় পার্টি গঠন করলে আহাদ মিয়া তাতে যোগ দেন এবং অল্প সময়েই শ্রীমঙ্গলের রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্য
১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি শ্রীমঙ্গল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল, তবুও আহাদ মিয়া স্থানীয়ভাবে বিপুল জনসমর্থন অর্জন করেন।
ওই বছরের ভয়াবহ বন্যায় তিনি ঢাকায় গিয়ে রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শ্রীমঙ্গলের দুর্গত মানুষের জন্য পাঁচ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা আনেন—যা সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়।
উদারতা ও সমাজসেবার দৃষ্টান্ত
জনপ্রতিনিধি থাকা অবস্থায় সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল দৃষ্টান্তমূলক।
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় এক কোটি পঁচাত্তর লক্ষ (১ কোটি ৭৫ লক্ষ) টাকা শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকার শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে অনুদান প্রদান করেন। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে তিনি পরিচিত হন একজন উদার, জনহিতৈষী ও মানবিক নেতারূপে।
২০০৪ সালে শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি এই ধারাকে আরও প্রসারিত করেন। পৌর উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাপক প্রশংসা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।
জনকল্যাণে তাঁর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা তাঁকে রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত করে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতি
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী উপাধ্যক্ষ আব্দুর শহীদের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেন। মাত্র ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পুনরায় একই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।
১৯৯৭ সালে আহাদ মিয়া তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। মিন্টো রোডের সমাবেশে যোগদানের সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান তাঁকে সস্নেহে আখ্যা দেন—“শ্রীমঙ্গলের টাইগার”।
জনতার ভোটে নির্বাচিত মেয়র
২০০৪ সালের পৌরসভা নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে পৌর এলাকায় রাস্তা-ঘাট, পানি নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় তিনি পৌরসভার কর্মপরিবেশে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
পৌর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
মৌলভীবাজারের মাতার কাঁপন চক্ষু হাসপাতালে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে তিনি ‘ডোনার মেম্বার’ হন।
এছাড়া দি বার্ডস রেসিডেন্সিয়াল অ্যান্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনাউল্লাহ হাই স্কুলসহ বহু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর আর্থিক সহযোগিতা আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
শিক্ষা ও পরিবারের উত্তরাধিকার
নিজে সীমিত শিক্ষিত হলেও শিক্ষার প্রতি আহাদ মিয়ার অনুরাগ ছিল গভীর। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জ্যেষ্ঠ কন্যা লুৎফুন নাহার নাজু স্নাতক শেষে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
দ্বিতীয় কন্যা ডা. আমিরুন নাহার নার্গিস, এমবিবিএস, এমফিল (ফার্মাকোলজি) ও এমপিএইচ সম্পন্ন করে বর্তমানে ঢাকার জেড.এইচ. সিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক।
তৃতীয় কন্যা ফাইজুন নাহার জাসি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রিধারী।
একমাত্র পুত্র জাহাঙ্গীর আলম সোহাগ বি.কম সম্পন্ন করে ২০২১ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
চতুর্থ কন্যা অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার মুন্নি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) ও এলএলএম সম্পন্ন করে বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা ডা. নাহার তানি বর্তমানে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল এনএইচএস ট্রাস্ট হাসপাতালসমূহে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তিনি বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেছেন। পরে তিনি লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস ডিগ্রি অর্জন ও ইম্পেরিয়াল কলেজ, লন্ডন থেকে ক্লিনিক্যাল ফেলোশিপ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি এমআরসিপি ও পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য যে, এই ফিচার প্রতিবেদনটি তার সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ডা. নাহার তানি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ব্যক্তিগত স্মৃতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছেন।
ডা. তানির কথায়—
“আমার শেখা প্রতিটি জ্ঞান আমার সমাজের জন্য। বাবার স্বপ্ন ছিল মানুষের সেবা করা—আমি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।”
উন্নয়নের রাজনীতি ও স্থায়ী প্রভাব
জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও আহাদ মিয়া আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থী নেতাদের সঙ্গেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন। তাঁর দান, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও মানবিক ব্যবহারে তিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন।
রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ তাঁর আমলে একবার শ্রীমঙ্গল সফর করেন। আহাদ মিয়ার উদ্যোগেই তখন রাষ্ট্রপতি শ্রীমঙ্গল কলেজ ও শ্রীমঙ্গল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারি ঘোষণা দেন। একই সফরে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের নির্দেশও দেন—যার পেছনে ছিল আহাদ মিয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টা।
সমালোচনা ও গ্রহণযোগ্যতা
তাঁর সম্পর্কে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক থাকলেও, তাতে তাঁর জনপ্রিয়তা বা প্রভাব কখনো কমেনি।
বরং তিনি রাজনীতি, সমাজ ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে নিজেকে এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
জনসেবা, দানশীলতা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি শ্রীমঙ্গলের মানুষের কাছে থেকে গেছেন এক ভালোবাসার নাম, এক অম্লান স্মৃতি।
শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মোঃ আহাদ মিয়া। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৫ বছর।
তাঁর সন্তানরা আজ দেশ-বিদেশে শিক্ষা ও কর্মজীবনে সাফল্যের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন।
শেষকথা
মোঃ আহাদ মিয়া ছিলেন শ্রীমঙ্গলের রাজনীতির এক বিরল প্রতিভা। সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন—মানুষের সেবা, সততা ও নিষ্ঠার শক্তিতেই একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারেন ইতিহাসের অংশ, হয়ে উঠতে পারেন সত্যিকারের “জনতার নেতা”।



















