ঝাড়খণ্ড ট্রাজেডি

img

ব্লাড ব্যাংকের রক্ত নিয়ে এইচআইভি আক্রান্ত ৫ শিশু

প্রকাশিত :  ০৬:২৯, ০৮ নভেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৪৭, ০৮ নভেম্বর ২০২৫

ব্লাড ব্যাংকের রক্ত নিয়ে এইচআইভি আক্রান্ত ৫ শিশু

সরকারি হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত নেওয়ার পর এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৫ শিশও। তাদের সকলের বয়স আট বছরের নিচে। তারা সকলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। ফলে তাদের নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের জন্য তাদের হাসপাতালে যেতে হয়। এ ঘটনায় গভীর দুশ্চিন্তা আর হতাশায় ভুগছেন ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার।

আজ শনিবার (০৮ নভেম্বর) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিম সিংভূম জেলা সদর হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত নিয়েছিলেন তারা। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দন কুমার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর চাইবাসার সিভিল সার্জন, এইচআইভি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট টেকনিশিয়ানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন প্রতি পরিবারকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন।

পশ্চিম সিংভূমের মঞ্ঝরি ব্লকের সাত বছর বয়সী শশাঙ্ক (ছদ্মনাম) সংক্রমিত রক্ত পাওয়ার পর এইচআইভি আক্রান্ত হয়। বিষয়টি জানাজানি হতেই বাড়িওয়ালা পরিবারটিকে বাসা খালি করার নির্দেশ দেন। শশাঙ্কের বাবা দশরথ (ছদ্মনাম) বলেন, আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু বাড়িওয়ালা রাজি হননি। শেষে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছি।

বর্তমানে এ পরিবারটিকে মাসে দুইবার চিকিৎসার জন্য ২৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। দশরথের অভিযোগ, সরকারি ভুলের কারণে এখন আমার ছেলেকে থ্যালাসেমিয়া আর এইচআইভি—দুই রোগের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে।

হাটগামহারিয়া ব্লকের সাত বছরের দিব্যা (ছদ্মনাম) একইভাবে সংক্রমিত রক্ত সঞ্চালনের ফলে এইচআইভি পজিটিভ হয়েছে। তার মা সুনীতা (ছদ্মনাম) বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতালের নার্সরা দিব্যাকে ছোঁয়া এড়িয়ে চলছিলেন। ডাক্তাররা গ্লাভস পরে দূর থেকে পরীক্ষা করছিলেন। তখনই আমার সন্দেহ হয়। অক্টোবরে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, ভুলবশত সংক্রমিত রক্ত দেওয়া হয়েছিল।

সুনীতা বলেন, শুরুতে আমি বুঝিনি, পরে বুঝেছি এই রোগ কত ভয়ঙ্কর। এখন আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আতঙ্কে আছি।

ঝিকপানি ব্লকের শ্রেয়া (ছদ্মনাম) নামের এক শিশু ও তার মা শ্রদ্ধা একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্রদ্ধার একমাত্র ভরসা ছিল মেয়েটি। এখন তাকে প্রতি মাসে ২৫ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় রক্ত নেওয়ার জন্য।

শ্রদ্ধা বলেন, হাসপাতালের ভুলে আমার মেয়ে এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে। এর জন্য আমি দুই লাখ টাকার চেক পেয়েছি, কিন্তু একটা শিশুর জীবনের মূল্য কি এতটুকু?

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ওই জেলায় ২৫৯ জন রক্তদাতা রক্ত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৪ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন এইচআইভি পজিটিভ ছিলেন।

তদন্তে জানা গেছে, রক্ত পরীক্ষায় পুরনো ‘প্রি-কিট’ ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ সচিব ডা. নেহা অরোরা জানিয়েছেন, এখন থেকে এই ধরনের কিট ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিবিসি জানিয়েছে, রাজ্যের ৯টি ব্লাড ব্যাংকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলোতে কার্যক্রম চালু ছিল। এ বিষয়ে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে।

মানবাধিকারকর্মী অতুল গেরা বলেন, লাইসেন্স নবায়ন ও মাননিয়ন্ত্রণের অভাবই এই বিপর্যয়ের কারণ। ঝাড়খণ্ডে পাঁচ হাজারেরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী আছে, কিন্তু চিকিৎসার জন্য পুরো রাজ্যে মাত্র একজন হেমাটোলজিস্ট।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চন্দন কুমার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, আবাসন, রেশন, শৌচালয়সহ সব সরকারি সুবিধা দেওয়া হবে। তবে শশাঙ্কের বাবা দশরথের ক্ষোভ, মন্ত্রীদের ছেলেদের জন্য কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, আর আমাদের বাচ্চাদের জন্য দুই লাখ! একটা শিশুর জীবনের মূল্য কি এতটুকু?


বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর

img

সমুদ্রের নিচের ভূমিকম্পে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?

প্রকাশিত :  ১০:২৩, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

সম্প্রতি দেশে বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মাঝে বুধবার (২৬ নভেম্বর) রাতে বঙ্গোপসাগরে চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ৬ দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। এর কারণে বড় কোনো সুনামির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ায় অথবা আন্দামান নিকবোর দ্বীপের দিকে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেও সুনামির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেমন, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় নয় দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পে যেখানে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেই সুনামি আফ্রিকার দেশগুলো পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। সেই সুনামির ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছিল এবং তাতে দুইজনের মৃত্যুর খবর জানা যায়।

ভূমিকম্প ও সুনামি

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা বলছেন, ‘সাগরে যদি ভূমিকম্প ছয় দশমিক পাঁচ মাত্রার উপরে যায় তারপর সে সুনামি হবে কি না, সুনামি সার্ভিস প্রোভাইডাররা সেটা পর্যবেক্ষণ করেন। কোন জায়গায় কখন হিট করতে পারে, পানির উচ্চতা কতটা হতে পারে, সেটা তারা অ্যালার্ট করেন। এটা আমরা সবময়ই টেস্ট বেসিসে করে আসছি।’

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তবে চার মাত্রা বা এর চেয়ে দুর্বল সেসব ভূমিকম্প থেকে বড় পর্যায়ে ক্ষতির শঙ্কা থাকে না।’

আবার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভূমিতে বড় ভূমিকম্প হলেও উপকূলে সুনামির শঙ্কা থাকে। আমাদের পৃথিবীর ওপরের অংশ বা ভূপৃষ্ঠ বিভিন্ন প্লেটে ভাগ করা। এই প্লেটগুলো সবসময় নড়াচড়া করে। কোথাও প্লেট একে অপরকে ঠেলে দেয়, কোথাও পাশ কাটিয়ে যায়, আবার কোথাও নিচে ঢুকে যায়। এমন ক্ষেত্রে যেমন ভূমিকম্প হয়, তেমন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও ভূপৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হতে পারে। এটি মাটির ওপরে বা পানির নিচে যে কোনো জায়গায় হতে পারে।

২৩ কোটি থেকে ২৮ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর সব মহাদেশ মিলে এ রকম একক ভূখণ্ড ছিল বলে তত্ত্ব রয়েছে। এটিকে বলা হয় প্যাঞ্জিয়া। টেকটনিক প্লেটের ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক ভূখণ্ড হয়েছিল বলে জানা যায়। এর সপক্ষে অনেক ধরনের প্রমাণও রয়েছে। এর মাঝে একটি পানির নিচে থাকা দীর্ঘতম পর্বতমালা মিড আটলান্টিক রিজ যেভাবে পৃথিবীকে ভাগ করেছে। এর মাত্র ১০ শতাংশ মাটির ওপরে যা আইসল্যান্ডে পরিষ্কার দেখা যায়।

সুনামি তৈরি হয় কীভাবে

সুনামি অনেকটা বিশাল আকারের জলোচ্ছ্বাসের মতো। সাধারণত ভূমিকম্প হলেই সুনামি হয় না। সুনামির জন্য ভূমিকম্প খুব শক্তিশালী হতে হয়। এ ছাড়া মোটামুটি অগভীর সমুদ্রতলে এরকম কম্পন সৃষ্টি হওয়াটাও একটা ফ্যাক্টর হতে পারে। আর এমন কম্পন সমুদ্রের তলদেশকে ওপরে বা নিচে ঠেলে দিলে, বিশাল পরিমাণ পানি সরে গেলে সেটি সুনামি ঘটাতে পারে। এমন বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয় থেকে সুনামি হতে পারে।

বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি কতটা?

এমনিতে প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীতে ভূতাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চল যেটাকে রিং অফ ফায়ার বলা হয়। এরম বিভিন্ন সক্রিয় অঞ্চল বা সাবডাকশন জোন থাকে। বড় সুনামি সৃষ্টিকারী সাবডাকশন জোনগুলো বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে। বাংলাদেশ দুইটা বড় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে, যা চট্টগ্রাম-আরাকান থেকে আন্দামানের দিকে চলে গেছে। তবে বাংলাদেশে সুনামির ঝুঁকি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি, সাগরের নিচে খুব নিকটবর্তী সময়ে বড় ভূমিকম্প এবং তা থেকে সুনামির শঙ্কা নেই।

ফারজানা সুলতানা বলেন, ‘নরমালি ভূমিকম্প থেকে ওইরকম সুনামির ঝুঁকি নেই, কিন্তু আন্দামান নিকোবরে হলেও ওটা আমাদের জন্য একটা সোর্স অঞ্চল। আমরা টেস্ট বেসিসে সবসময় রেডি থাকি, এটা হলে যেন আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি।’

অতীতের নানা নথিপত্রের তথ্যানুযায়ী, এই অঞ্চলে ১৯৬২ সালে আরাকান কোস্টে প্রায় সাড়ে আট মাত্রার একটি ভূমিকম্প থেকে বড় সুনামি হয়েছিল।

বিবিসির এর আগের একটি প্রতিবেদনে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছিলেন, এই প্লেটে ভূমিকম্প হলে অবশ্যই বড় সুনামির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখানে খুব তাড়াতাড়ি এই বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে সময়কার তথ্যে জানা যায়, তখন বড় ধরনের সুনামির তৈরি হয়েছি, যা উপকূল থেকে অনেকদূর পর্যন্ত ভেতরে এসে পৌঁছেছিল। যদিও তখন মানুষ কম ছিল বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয়তো তত বেশি হয়নি। তবে ঢাকায় নদীর পানি বেড়ে গিয়ে পাঁচশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘এরপর আর এই অঞ্চলে এত বড় ভূমিকম্প বা সুনামির তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের হিসাবে, একবার ভূমিকম্প হওয়ার পর ওই প্লেটে শক্তি সঞ্চয় হয়ে পরবর্তী ভূমিকম্প হতে আরও ৫০০-৯০০ বছর লেগে যায়। সেই হিসাবে এখানে ওই প্লেটে (আরাকান প্লেটে) ভূমিকম্প হতে আরও ২০০-২৫০ বছর বাকি আছে।’

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ‘ফানেল শেপ’ অবস্থায় রয়েছে অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র দক্ষিণ দিকে প্রসারিত হয়ে গেছে।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেছিলেন, ‘আন্দামান বা ভারত মহাসাগরে যদি বড় সুনামি তৈরি হয়, ফানেল শেপ হওয়ার কারণে তার প্রভাব কিছুটা বাংলাদেশে এসেও লাগবে। যদিও সেটা হয়তো ইন্দোনেশিয়ার মতো অতটা ভয়ানক হবে না। ভূমিকম্প সম্পর্কে খুব আগেভাগে সতর্ক করা সম্ভব না হলেও যেহেতু ভূমিকম্পের পরে পানিতে সুনামির সৃষ্টি হয়, ফলে সুনামি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করা যায়।’

তবে বাংলাদেশের জন্য সমুদ্রে ভূমিকম্পের চেয়ে ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে যে ভূমিকম্পের যে ঝুঁকি রয়েছে, সেটিই এখন বেশি শঙ্কার জায়গা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র : বিবিসি