img

মৌলভীবাজার: পাহাড়, চা আর সংস্কৃতির রঙে বোনা এক জীবন

প্রকাশিত :  ০৬:১৩, ১১ নভেম্বর ২০২৫

মৌলভীবাজার: পাহাড়, চা আর সংস্কৃতির রঙে বোনা এক জীবন

সংগ্রাম দত্ত

সবুজ চা-বাগান, ঢেউখেলানো পাহাড় আর মায়াময় নৈসর্গে মোড়া মৌলভীবাজার—বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের এক অনন্য জনপদ। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই জেলার আরেকটি পরিচয় আছে—সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও নৃগোষ্ঠীর জীবনচিত্র। এখানে বসবাসরত ত্রিপুরা, মনিপুরী, খাসিয়া, গারো, মণচু ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন যেন এক জীবন্ত সংস্কৃতি–সংগ্রহশালা।

পাহাড়ের কোলে বহমান জীবন

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলাজুড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে বিভিন্ন পাহাড়ি ও আদিবাসী সম্প্রদায়। চা-বাগানের পাড়ঘেঁষা গ্রামগুলোয় ছড়িয়ে আছে তাদের জীবনধারা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য। ছোট ছোট মাচা ঘর, বাঁশের বেড়া আর টিনের ছাউনিতে গড়ে উঠেছে তাদের সংসার—যেখানে প্রকৃতি কেবল পরিবেশ নয়, বরং জীবনেরই অংশ।

তাদের সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, মিতব্যয়িতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ আজও টিকে আছে। প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি কারুশিল্পে ফুটে ওঠে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের গল্প।

কারুশিল্পে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

মনিপুরী নারীদের বোনা রঙিন পোশাক, খাসিয়া সমাজের বাঁশের তৈরি ঝুড়ি ও টোকরি, কিংবা ত্রিপুরাদের মাটির হাঁড়ি–পাতিল—সবকিছুই তাদের সংস্কৃতির বাহক। এসব সামগ্রী কেবল ব্যবহারিক নয়, বরং প্রতিটি নকশা ও বয়ন যেন বহন করে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জীবনদর্শন আর সৌন্দর্যের সহজাত টান।

আজও মৌলভীবাজারের পাহাড়ি গ্রামগুলোয় দেখা মেলে হাতে তৈরি এই শিল্পকর্মের। বাজারে বা পর্যটনকেন্দ্রে বিক্রি হয় বাঁশের ঝুড়ি, ডালা ও বিভিন্ন উপকরণ। এগুলো শুধু কারুশিল্প নয়, বরং টেকসই জীবনের প্রতীক—যেখানে প্রকৃতি ও শিল্প একে অপরের পরিপূরক।

যান্ত্রিক যুগে টিকে থাকার লড়াই

তবে আধুনিকতার ঢেউয়ে এই ঐতিহ্য এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। প্লাস্টিকের সস্তা ও সহজলভ্য পণ্য বাজার দখল করায় বাঁশ ও মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমে গেছে। ফলে প্রাচীন কারিগরদের অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবু আশার কথা—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে নিয়মিত প্রদর্শনী ও হস্তশিল্প মেলা আয়োজনের মাধ্যমে এসব কারুশিল্পকে নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পর্যটকরা এখন আগ্রহভরে এসব ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী সংগ্রহ করছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।

সংস্কৃতি সংরক্ষণেই টেকসই ভবিষ্যৎ

এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনচর্চা আমাদের শেখায়—প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গড়ে তোলা যায় টেকসই জীবনব্যবস্থা। তারা ভোগে নয়, প্রয়োজনেই ব্যবহার করে প্রাকৃতিক সম্পদ। তাদের হাতে গড়া প্রতিটি সামগ্রী যেন একেকটি সাংস্কৃতিক দলিল, যা বলে দেয় আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে টিকে ছিলাম।

এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা, পর্যটন উন্নয়ন এবং প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতকে রক্ষা করা নয়—বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই পথ নির্মাণ।

সবুজ পাহাড়ের কোলে, চায়ের সুবাসে ভরা মৌলভীবাজার যেন প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনের সরলতা, কারুশিল্পের নিপুণতা আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই এই জেলার প্রকৃত শক্তি।

তাদের হাতে গড়া বাঁশের ঝুড়ি বা মাটির হাঁড়ি শুধু শিল্প নয়—এগুলোই আমাদের ইতিহাস, আমাদের পরিচয়।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

রেড ক্রিসেন্ট সুনামগঞ্জ ইউনিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাজু, সম্পাদক সোহেল

প্রকাশিত :  ১৮:১৬, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:০০, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সুনামগঞ্জ ইউনিটের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন (২০২৫-২০২৭) অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্থাটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন শিক্ষাবিদ নুরুল ইসলাম সাজু এবং সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছেন জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য অ্যাড. মল্লিক মো. মঈন উদ্দিন আহমদ সোহেল। খবর ‘বাসস’ এর।

গত ২৮ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সুনামগঞ্জ ইউনিটের ৫৭২ জন ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ৪২৮ জন। 

প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নুরুল ইসলাম সাজু। তিনি পেয়েছেন ২০৩ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাশুক আলম পেয়েছেন ১২৪ ভোট এবং আমির হোসেন পেয়েছেন ৯৬ ভোট। 

সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও বর্তমান জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য অ্যাড. মল্লিক মো. মঈন উদ্দিন আহমদ সোহেল। তিনি পেয়েছেন ২৩৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পৌর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ পেয়েছেন ১৮৪ ভোট। 

এদিকে সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দ মোনাওয়ার আলী (২৮৫ ভোট), ইজাজুল হক চৌধুরী নাসিম (২৩৮ ভোট), আব্দুস সাত্তার মো. মামুন (২১৮ ভোট), মো. আশরাফ হোসেন লিটন (১৯৫ ভোট), মো. আনিসুজ্জামান (১৬১ ভোট)। 

নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাড. শামসুর রহমান। 

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সুনামগঞ্জ ইউনিটের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ৩ জন, সেক্রেটারি পদে ২ জন এবং সদস্য পদে ১৩জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।


সিলেটের খবর এর আরও খবর