শ্রীমঙ্গলের শতবর্ষের আলোকচ্ছটা: সুরম্য দালান ও রক্ষাকালী মন্দির
সংগ্রাম দত্ত, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি : শ্রীমঙ্গল, বাংলাদেশের চায়ের স্বর্গরাজ্য, শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়—এখানকার ইতিহাস ও স্থাপত্যও সমানভাবে সমৃদ্ধ। শহরের পুরান বাজারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক আশি বছরের শুরম্য অট্টালিকা, যা চুন–সুরকি এবং মজবুত কাঠের ব্যবহার করে নির্মিত।
দালানটি ১৩৫২ বাংলা সনে তৈরি হলেও, দীর্ঘ আট দশক পেরিয়েও এটি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এর ভিতরে রয়েছে শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দির, প্রতিষ্ঠিত ১৩০৯ বাংলা সনে, যা ধর্ম ও স্থাপত্যের মিলনস্থল হিসেবে বিশিষ্ট।
প্রতিটি ঘর আজও সেই সময়ের আলাপ-আলোচনার প্রতিধ্বনি বহন করে—শহরের উন্নয়ন, মানুষের গল্প, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং সমাজসেবার নীরব সাক্ষী।
১৯শ শতকের শেষের দিকে জন্ম নেওয়া জমিদার রাধানাথ দেব চৌধুরী ছিলেন শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক উন্নয়নের অগ্রদূত। তাঁর অবদান আজও শহরের নানা প্রান্তে স্পষ্ট।
চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দীনময়ী বালিকা বিদ্যালয় এবং বিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান।
নাটমন্দির, মন্দির এবং টাউন হলের উদ্বোধনে অবদান, আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র রাধানগর-এর জন্মসূত্র তাঁর ক্রয়কৃত পাহাড়ি জমি, রাধানগরের আধুনিক ফাইভ-স্টার হোটেল, রিসোর্ট এবং কর্মসংস্থান—এই উন্নয়নের পেছনের মূল চরিত্র তিনি।
সুরম্য দালানটির সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক এবং রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক।
তার জীবনের বহুমুখী দিকগুলো- কংগ্রেস, ফরওয়ার্ড ব্লক ও ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা; শোষিত মানুষের অধিকার আদায়, ১৯৭১ সালে তরুণদের উৎসাহিত ও সংগঠক ভূমিকা, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে দিনে প্রায় ২০০ জনকে খাওয়ানো; অসহায়, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতাদের পাশে দাঁড়ানো, স্কুল, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা করে নিদর্শন স্থাপন করেন।
দালানটির প্রতিটি কোণা তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের স্মৃতি ধারণ করে। দালান ও মন্দির শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল ।
শ্রীমঙ্গলের উন্নয়নে রাধানাথ ও ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর অবদান যেমন বিশাল, তেমনি এই দালানও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি স্থাপত্য নয়—এটি ইতিহাসের ঘ্রাণমাখা দলিল, সমাজসেবায় নিবেদিত এক পরিবারের স্মৃতিস্মারক এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নির্মাণশৈলীর উদাহরণ।
যতদিন দালানটি দাঁড়িয়ে থাকবে, ততদিন শ্রীমঙ্গলের মানুষ জানবে—কিভাবে একটি পরিবার মানবিকতা, শিক্ষানুরাগিতা এবং সামাজিক দায়িত্বের মাধ্যমে শহরের ইতিহাস গড়ে তুলেছে।
পুরান বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা আশি বছরের শুরম্য দালান ও রক্ষাকালী মন্দির শুধুই সৌন্দর্যের উৎস নয়। এটি ইতিহাসের পাঠশালা, মানবিকতার চিহ্ন এবং এক পরিবারের অবদানের চিরজাগরুক স্মারক।
যে মানুষরা নিজেদের স্বার্থ নয়, সমাজকে বদলানোর জন্য জীবন উৎসর্গ করেন—তাদের নাম ইতিহাসে অমর হয়ে থাকে। রাধানাথ ও ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর জীবনকাহিনী সেই অমরত্বের নিদর্শন।



















