img

ওয়াচডগ যখন ল‍্যাপডগ: মিডিয়ার আগাম আত্মসমর্পণ

প্রকাশিত :  ২০:১০, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২১:৪৪, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬

ওয়াচডগ যখন ল‍্যাপডগ: মিডিয়ার আগাম আত্মসমর্পণ

গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার চতুর্থ স্তম্ভ অর্থাৎ গণমাধ্যমের ওপর। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া উচিত ‘ওয়াচডগ’ বা অতন্দ্র প্রহরী কুকুরের মতো, যা ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দেবে এবং জনস্বার্থ রক্ষা করবে। কিন্তু যখনই কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে তখন অনেক সংবাদমাধ্যম তাদের এই মহান দায়িত্ব ভুলে ‘ল্যাপডগ’ বা পোষা কুকুরে রূপান্তরিত হয়। সম্ভাব্য বিজয়ীর প্রতি এই যে ‘আগাম আত্মসমর্পণ’ বা ‘তোষামোদি’, এটি কেবল সাংবাদিকতার নৈতিক পরাজয় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রার প্রথম সোপান।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাঁদের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, গণমাধ্যম কীভাবে সচেতনভাবে জনমত গঠন ক’রে ক্ষমতার অনুগত থাকে। যখন সংবাদপত্র বুঝতে পারে যে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, তখন তারা ‘কৌশলগত সারিবদ্ধকরণ’ (Strategic Alignment) প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। এর নেপথ্যে কাজ করে মূলত করপোরেট স্বার্থ। যেহেতু আধুনিক মিডিয়া হাউসগুলো বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানাধীন, তাই তাদের কাছে সাংবাদিকতা একটি আদর্শের চাইতে বরং একটি ‘ব্যবসায়িক বিনিয়োগ’। হবু রাষ্ট্রপ্রধানকে তুষ্ট রাখার মাধ্যমে তারা ভবিষ্যৎ লাইসেন্স, বিজ্ঞাপন এবং বাণিজ্যিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

সংবাদপত্রের এই চাটুকারিতা সম্ভাব্য শাসকের মনে এক বিপজ্জনক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায়। একে বলা হয় ‘মেসায়া কমপ্লেক্স’ (Messiah Complex)। যখন কোনো নেতা ক্ষমতা গ্রহণের আগেই দেখেন যে মিডিয়া তাঁর প্রতিটি ভুলকে ঢেকে রাখছে এবং তাঁর একটি অতি সাধারণ বক্তব্যকেও ‘ঐতিহাসিক বাণী’ হিসেবে প্রচার করছে, তখন তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন। এই দায়মুক্তির বোধ থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচারী মানসিকতা। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, তাঁর শাসনই জাতির একমাত্র গন্তব্য এবং ভিন্নমত মানেই দেশদ্রোহিতা।

ইতিহাসে ‘আগাম তোষামোদি’র মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট তৈরির সবচেয়ে বড় উদাহরণ বেনিতো মুসোলিনি। ১৯২২ সালে তাঁর ‘মার্চ অন রোম’- এর আগে ইটালির মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে ‘ভবিষ্যতের ত্রাণকর্তা’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল। তৎকালীন লিবারেল পত্রিকাগুলো মনে করেছিল মুসোলিনিকে সমর্থন দিলে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে। এই আগাম মিডিয়া সমর্থন মুসোলিনিকে এমন এক বৈধতা দিয়েছিল যে, তিনি ক্ষমতায় বসার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে যে মিডিয়াগুলো তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল সেই মিডিয়াগুলোর মুখই চিরতরে বন্ধ ক’রে দেন। এমন কি তিনি এক পর্যায়ে বলেই ফেলেছিলেন, "সংবাদপত্র হবে অর্কেস্ট্রার মতো, যেখানে সবাই একই সুরে বাজাবে।" বলা বাহুল্য, এই সুরটি ছিল তাঁর নিজেরই কম্পোজ করা।

ফ্যাসিবাদের অন্যতম অস্ত্র হলো প্রোপাগান্ডা। জোসেফ গোয়েবলস শিখিয়েছিলেন যে, একটি বড় মিথ্যাকে হাজার বার বললে তা সত্য হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদপত্র যখন হবু শাসকের চাটুকারিতায় লিপ্ত হয়, তখন তারা এই ‘বড় মিথ্যা’র বাহক হিসেবে কাজ করে। তারা মঙ্গলময় ভবিষ্যতের কাল্পনিক গল্প প্রচার করে এবং সম্ভাব্য বিরোধীদের চরিত্র হনন (Character Assassination) শুরু করে। এটি সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ক’রে ফেলে, ফলে যখন প্রকৃত ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসে, তখন সমাজ তার প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলে।

এখনকার যুগে এই তোষামোদি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক টিনেজারদের ‘সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান’ -এর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত - এর একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। যখন সরকার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে মিডিয়ার উচিত ছিল এর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সরব হওয়া। মিডিয়ার উচিত ছিল স‍্যোশাল মিডিয়ার সুরক্ষার ব‍্যাপারে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। অথচ অস্ট্রেলিয়ার তোষামোদপ্রিয় মিডিয়া এটিকে ‘যুগান্তকারী ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপ’ হিসেবে প্রচার ক’রে রাষ্ট্রের আধিপত্যকেই বৈধতা দেয়। ফলে এটি তরুণ প্রজন্মের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতাকে খর্ব করার পথ প্রশস্ত করে।

যখন কলম শক্তির কাছে নতজানু হয়, তখন তা আর সত্যের হাতিয়ার থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একনায়কতন্ত্রের রাজদণ্ড। সংবাদপত্রের কাজ হওয়া উচিত জনগণের চোখ খুলে দেওয়া, শাসকের চোখ রাঙানোকে ভয় পাওয়া নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ক্ষমতার পালাবদলের সন্ধিক্ষণে অনেক সংবাদপত্রই স্বতঃস্ফূর্তভাবে (Self-censorship) তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ফ্যাসিবাদ সবসময় তথ্যের অন্ধকার পছন্দ করে। আর এই অন্ধকার তৈরির প্রধান কারিগর হলো সেই সাংবাদিকতা যা ক্ষমতার চাটুকারিতাকে দেশপ্রেম হিসেবে চালিয়ে দেয়। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমকে তার ‘ল্যাপডগ’ (পোষা কুকুর) ইমেজ ভেঙে আবার ‘ওয়াচডগ’ (প্রহরী কুকুর) হিসেবে জেগে উঠতে হবে। ক্ষমতার প্রতি আগাম আত্মসমর্পণ মানেই হলো নিজের এবং জাতির ভবিষ্যৎকে শৃঙ্খলিত করা।

লেখক: ডা: জাকি রেজওয়ানা আনোয়ার FRSA, MBBS, DTM&H, MS & PhD একজন চিকিৎসক, জনপ্রিয় সিনিয়র সংবাদ পাঠক, কলামিষ্ট ও আন্তর্জাতিক স্পীকার

মতামত এর আরও খবর

img

নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক: গণতন্ত্রের মান এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

প্রকাশিত :  ০৯:১৯, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি নিউজ বাংলা গত ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে \"নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট, \'কোন দিকে যাব আমরা\'?\" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নির্বাচন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের যশোর জেলার অভয়নগরের হিন্দু সংখ্যালঘু বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে তারা ভোট দিতে ইচ্ছুক হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। নির্মল বিশ্বাস বলেন, \"আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)।

একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাসের মন্তব্য, \"আমরা হয়ে গেছি বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই,\" সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীন অবস্থাকে তুলে ধরে।

বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মে মাসে যশোরের ডহরমসিয়াহাটি গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডের পর।

শিউলি বিশ্বাস নির্বাচনের আগে নিরাপত্তার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন: \"আমরা অবশ্যই ভোট দিতে যাব। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে আমাদের যে নিরাপত্তা দেবে আমরা তারেই ভোট দেব।\"

নির্মল রোজারিও বলেন, \"আমার জীবন যদি রক্ষা না হয়, আমার পরিবার যদি রক্ষা না হয়, তাহলে ভোটের বিবেচনা পরে হবে।\"

ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে আতঙ্কের মধ্যে থাকে।

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ ঘটেছিল। এরপর ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিগত সরকারের সময়েও সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ঘটেছে।

২০১২ সালের রামু থেকে থেকে ২০২৩ পর্যন্ত  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় উস্কানি ও মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়েছে। মন্দির লুটপাট, প্রতিমা ভাঙচুর এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাও নিয়মিতভাবে ঘটেছে, কিন্তু বিচার বা প্রতিকার খুবই সীমিত হয়েছে।

২০২৪ সালের  আগস্টের পরও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ থেমে নেই। বিশেষ করে ১৮ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে মারধর ও হত্যা করে একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ও নিরাপত্তা বিষয়েও বিবিসি প্রতিবেদন গভীর বিশ্লেষণ করেছে। রঞ্জন কর্মকার বলেন, \"নির্বাচনে অংশগ্রহণ করো কিন্তু আমাকে সুরক্ষাটা কোথায় দিলেন, নিরাপত্তা কোথায় দিলেন। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের জায়গাটা কোথায় দিলেন, দিচ্ছেন নাতো। তাহলে এইরকম একটা অবস্থায় মাইনরিটিরা কীভাবে অংশগ্রহণ করবে?\" (বিবিসি নিউজ বাংলা, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬)। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ভোট প্রদানের সময় সুরক্ষা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রধান শর্ত।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবিসি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ সাধারণত আওয়ামী লীগের প্রতি প্রবণ, কিন্তু এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত দুই জোটই সংখ্যালঘু ভোটারদের নজরে এসেছে।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহম্মদ তাহের বলেন, \"আগের পারসেপশনগুলো এখন আর নেই। সংখ্যালঘুরা নতুন করে ভাবছে এবং আমাদের ফ্রেন্ড হিসেবে দেখছে।\"

বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও আশ্বাস দেন, ভোটের পরে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিবিসি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অনেক ঘটনা রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়, যেমন গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, \"একটা এলাকায় যে ধর্মের লোকই হোক, তার ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলের চেয়ে বেশি দায়িত্ব হলো প্রার্থীর। প্রার্থী কতটুকু আস্থা দিতে পারবে, সেই বিষয়েই ভোট নির্ভর করে।\"

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা না হলে গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয় না। নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক, অতীত নির্যাতনের স্মৃতি এবং রাজনৈতিক চাপ এই দেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অতীতের নির্যাতন এবং রাজনৈতিক চাপ বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও ন্যায় নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, যেন সংখ্যালঘু ভোটাররা ভয়মুক্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং তাদের ভোটাধিকার নিরাপদে প্রয়োগ করতে পারে।


মতামত এর আরও খবর