শ্রীমঙ্গলের মানবতাবাদী জননেতা ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী
সংগ্রাম দত্ত: শ্রীমঙ্গল—চা, পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর। এই সবুজের ভুবনে যেমন প্রকৃতির মমতা, তেমনি ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে কিছু মহান মানুষের অবদান।
তেমনই এক অনন্য নাম ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী—দানবীর, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও মানবিক জননেতা, যিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সমাজ ও মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও বংশপরিচয়
১৯০৮ সালের ৪ অক্টোবর তিনি ( কে বি দেব চৌধুরী) জন্মগ্রহণ করেন এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বড় তিন ভাই ছিলেন যথাক্রমে রাসবিহারী দেব চৌধুরী, পুলিন বিহারী দেব চৌধুরী, এবং বিনোদ বিহারী দেব চৌধুরী।
তাঁদের পিতা ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার, শিক্ষানুরাগী, দানবীর ও সমাজসেবক রাধানাথ দেব চৌধুরী এবং মাতা জয়তারা দেব চৌধুরী।
জমিদার রাধা নাথ দেব চৌধুরী ৩১ আগষ্ট ১৮৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা রাধানাথ দেব চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার ও সর্বোচ্চ করদাতাদের একজন।
তাঁর বিশাল জমিদারির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ৫৭টি এজেন্সি ছিল।
রাধানাথ দেব চৌধুরীর মূলত ব্যবসা ছিল কলকাতা ও ইংল্যান্ডের সাথে।
শিক্ষা, দান ও সমাজে পিতার অবদান
ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে যাঁরা নীরব কিন্তু গভীর ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে রাধানাথ দেব চৌধুরী একটি উজ্জ্বল নাম। তাঁর পিতা চন্দ্রনাথ দেব চৌধুরী ও মাতা দীনময়ী দেব চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন—যা আজও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
পিতার স্মরণে রাধানাথ দেব চৌধুরী ব্রিটিশ আমলেই ভূমি দান করে প্রতিষ্ঠা করেন চন্দ্রনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটি সে সময়ে সাধারণ মানুষের শিক্ষালাভের পথ সুগম করে শ্রীমঙ্গলের শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।
একইভাবে মাতৃস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি শ্রীমঙ্গল চৌমুহনী সংলগ্ন এলাকায় দীনময়ী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মূল্যবান ভূমি দান করেন। নারীশিক্ষা যখন সমাজে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, তখন তাঁর এই উদ্যোগ ছিল প্রগতিশীল ও সময়োপযোগী এক সাহসী পদক্ষেপ।
কিন্তু পরবর্তীকালে দুঃখজনকভাবে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক অসচেতনতার কারণে দীনময়ী নামটি বিলুপ্ত করে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়। এর ফলে বর্তমান প্রজন্ম প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত ইতিহাস, ভূমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতার অবদান সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞই থেকে যাচ্ছে। যথাযথ স্বীকৃতির পরিবর্তে এভাবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উপেক্ষিত হওয়া নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও রাধানাথ দেব চৌধুরীর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। শ্রীমঙ্গল শহরের হবিগঞ্জ রোডে তিনি নির্মাণ করে দেন শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের আখড়ার বিগ্রহ মন্দির ও নাটমন্দির, যা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আচার, সামাজিক মিলন ও সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে।
শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটি ও প্রশাসনিক ভূমিকা
১৯২৩ সালের আসাম মিউনিসিপাল অ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী ১৯৩৫ সালের ১ অক্টোবর শ্রীমঙ্গল স্মল টাউনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।
এই উপলক্ষে রাধানাথ দেব চৌধুরী ইংল্যান্ডের কেন্ট (Kent) শহর থেকে বিশেষভাবে কেক অর্ডার দিয়ে আমদানি করে শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির উদ্বোধনের আয়োজন করেন—যা তৎকালীন সময়ে শ্রীমঙ্গলের পৌর ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির প্রথম পরিষদে ১ অক্টোবর ১৯৩৫ থেকে ৮ মে ১৯৩৭ পর্যন্ত রাধানাথ দেব চৌধুরী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা প্রশাসক গিরিজাশংকর গুহ চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
পরবর্তীতে তৃতীয় পরিষদে ২০ এপ্রিল ১৯৪৩ থেকে ২ ডিসেম্বর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত রাধানাথ দেব চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাসবিহারী দেব চৌধুরী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
চতুর্থ পরিষদে ১ ডিসেম্বর ১৯৫২ থেকে ১৪ জানুয়ারি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী (কে. বি. দেব চৌধুরী) ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৪ জানুয়ারি ১৯৫৬ থেকে ২০ জুন ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ছিলেন।
শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির সপ্তম পরিষদে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পুনরায় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাধানগর পাহাড়: ঐতিহ্য থেকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র
শ্রীমঙ্গলের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশের নিচে বিস্তৃত এক মনোমুগ্ধকর এলাকা—রাধানগর। একসময় নিস্তব্ধ পাহাড়ি জনপদ হলেও আজ এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিন এখানে ভিড় জমে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের।
ফাইভ-স্টার হোটেল, আধুনিক রিসোর্ট আর চা-বাগানের সৌরভে ভরপুর রাধানগর যেন এখন এক টুকরো স্বপ্নের দেশ।
কিন্তু এই নামের পেছনে রয়েছে এক বিস্মৃত ইতিহাস, এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অবদান—রাধানাথ দেব চৌধুরী। তাঁর উদ্যোগ, দৃষ্টি ও ভূমিদান থেকেই শুরু হয়েছিল রাধানগরের যাত্রা।
ব্রিটিশ শাসনামলে রাধানাথ দেব চৌধুরী শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া পাহাড়ে প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি ক্রয় করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর চার পুত্র উত্তরাধিকারসূত্রে জমিগুলোর মালিকানা গ্রহণ করেন। কেউ কেউ কিছু জমি বিক্রি করেন, আর বাকি অংশ সময়ের সঙ্গে বেদখল হয়ে যায়।
তবে রাধানাথ দেব চৌধুরীর নামেই এলাকা পরিচিতি পায় “রাধানগর” নামে। তাঁর প্রভাব ও অবদানে জনপদটি ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
যে এলাকা একসময় ছিল নিভৃত পাহাড়ি অঞ্চল, সেটিই আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে।
রাধানগরের পাহাড়ি ঢালজুড়ে আজ সাজানো রয়েছে আনারস, লেবু, কাঁঠাল ও চা-বাগান। পাশে সারি সারি রিসোর্ট, হোটেল ও মোটেল। এমনকি এই পাহাড়ে এলাকায় গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের ফাইভ স্টার হোটেল গ্রান্ড সুলতান এন্ড টি রিসোর্ট। একসময়ের নির্জন ডলুছড়া পাহাড় এখন আলো ঝলমলে পর্যটনকেন্দ্র।
দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীরা এখানে বিনিয়োগ করছেন, গড়ে উঠছে নতুন নতুন পর্যটন অবকাঠামো। স্থানীয় মানুষ পাচ্ছেন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
অর্থনৈতিক জোয়ারে এখন রাধানগর হয়ে উঠেছে বিনিয়োগ ও পর্যটনের মিলনস্থল।
আজকের প্রজন্মের কাছে রাধানগর মানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিলাসিতা আর বিনোদনের এক আধুনিক রূপ। কিন্তু অনেকেই জানেন না—এই উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন রাধানাথ দেব চৌধুরী।
তাঁর জমিদারি, সামাজিক প্রভাব ও অবদান নিয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বা স্মারক প্রতিষ্ঠা গড়ে ওঠেনি। অথচ তাঁরই নামের সঙ্গে যুক্ত এই রাধানগর আজ শ্রীমঙ্গল তথা পুরো সিলেট বিভাগের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে—এটাই এক অমূল্য ঐতিহাসিক সত্য।
রাধানগর আজ শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটন এলাকা নয়—এটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ।
রাধানাথ দেব চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণ মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং এই অঞ্চলের ইতিহাসকে জীবন্ত রাখা।
তাঁর স্মরণে যদি জাদুঘর, তথ্যকেন্দ্র বা স্মারক নির্মাণ করা যায়, তবে নব প্রজন্ম জানতে পারবে—
কীভাবে একজন মানুষের দূরদর্শিতা একটি জনপদকে বিশ্বপরিচিত করে তুলেছিল।
রাধানগর আজ জ্বলজ্বল করছে উন্নয়নের আলোয়।
এখন প্রয়োজন, তার ইতিহাসকেও একইভাবে জাগিয়ে তোলা—যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এই স্বপ্নলোকের গল্প।
দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে প্রতিনিয়ত ভিড় জমায়, যা শ্রীমঙ্গলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই রাধানগরই আজ রাধানাথ ও ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী পরিবারের ঐতিহ্য ও অবদানের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
জমিদার ও শিক্ষানুরাগী রাধানাথ দেব চৌধুরী ০১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালে প্রায় ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
জমিদারি বিলোপ ও পারিবারিক সম্পদের বণ্টন
১৯৫০ সালে পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে নবীগঞ্জ থানার ভূবীরবাগ এলাকার বিশাল সম্পত্তি প্রজাস্বত্ব আইনে সরকারে চলে যায়।
অবশিষ্ট ৫০ হাল জমির মধ্যে ২৫ হাল ভাগ হয় বড় ছেলে রাসবিহারী দেব চৌধুরীর নামে, এবং বাকি ২৫ হাল ভাগ হয় অন্য তিন পুত্রের মধ্যে।
তবে ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ও তাঁর ভাইদের কিছু জমি আজও বেদখল অবস্থায় রয়েছে বলে জানা যায়।
তিনি শ্রীমঙ্গল শহরের পুরান বাজার সড়কে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত শতবর্ষী এক মনোরম ভবনে তাঁর পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি শ্রীমঙ্গল শহরে বর্তমানে যে স্থানে রাধানাথ সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত সেখানে জমি , ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কুমারঘাট ও মানিকভান্ডারে ভূমি ক্রয় করেছিলেন।
শহরসংলগ্ন বিরাইমপুর এলাকায় ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর ক্রয়কৃত ৪৮ বিঘা জমি ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৩১ শতক জমি দান করা হয় রাধানাথ প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য (বর্তমানে “বিরাইমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়”)। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রশাসনিক কারণে রাধানাথ নামটি পরিবর্তন করা হয়। অথচ দানপত্রে উল্লেখ ছিল—বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন হলে জমি ফেরত দিতে হবে মালিকের উত্তরাধিকারীদের। এভাবে দীনময়ী ও রাধানাথ এর নাম পরিবর্তনের ফলে ভূমি দাতার মূল উদ্দেশ্য ও অবদান প্রজন্মের কাছে লুকিয়ে যাচ্ছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে দেব চৌধুরী পরিবারের বিস্তৃত সম্পত্তি
রাধানাথ দেব চৌধুরী ও তাঁর পুত্ররা শুধু শ্রীমঙ্গল বা আসামেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিস্তৃত সম্পত্তির মালিক।
ব্রিটিশ ভারতে তখন প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো এক থাকায়—আসাম, ত্রিপুরা সহ ভারতের যে কোনো অঞ্চলে ভূমি ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো বাধা ছিল না।
এই সুযোগে দেব চৌধুরী পরিবার আসাম প্রদেশ ও ত্রিপুরা রাজ্যে বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পত্তি ক্রয় করেন।
তাদের মালিকানাধীন জমির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের কুমারঘাট এলাকার বৃহৎ মূল্যবান জমি ছিল।
এছাড়াও ত্রিপুরার মানিকভান্ডার এ তাঁদের ঐতিহ্যবাহী একটি বাড়ি ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান এম এ মুছাব্বিরসহ অসংখ্য মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু ফ্যামিলি ও মুক্তিযোদ্ধারা এই বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
শ্রীমঙ্গল ও ত্রিপুরা রাজ্যের মানিক ভান্ডার এলাকায় তাঁর বিডি ফ্যাক্টরি ছিল।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উন্মুক্ত বাণিজ্যনীতির কারণে তাঁদের সম্পত্তি ও ব্যবসা সীমান্ত অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর, সীমান্ত নির্ধারণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে তাঁদের ত্রিপুরা ও আসামের কিছু সম্পত্তি বেদখল হয়ে যায়।
তবুও তাঁদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আজও স্থানীয় ইতিহাসে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ও উদ্যোগ
ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ছিলেন এক সফল উদ্যোক্তা ও দূরদর্শী ব্যবসায়ী।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ব্যবসার মধ্যে ছিল—
ফরেন লিকার বিক্রয়কেন্দ্র, ধান ও আটা গ্রাইন্ডিং মিল, স-মিল, পাতার বিড়ি প্ল্যান্টেশন, গাছমহাল ব্যবসা, সিনেমা হল, ভুসিমাল, রড, সিমেন্ট, টিন ও হার্ডওয়্যার ব্যবসা ইত্যাদি।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলায় দুটি চা-বাগানের মালিক ছিলেন। একটি নাম হচ্ছে চরগোলা ভ্যালি টি ইস্টেট।
১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি চা বাগান গুলো তদারকি করেন। কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও পাসপোর্ট বাতিলের কারণে পরবর্তীতে ওই চা-বাগানগুলো বেদখল হয়ে যায়।
রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম
মানবপ্রেম ও ন্যায়বোধের প্রতীক ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে।
ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি প্রথমে কংগ্রেস এবং পরে ফরওয়ার্ড ব্লক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সময় তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেট জেলায় অনুষ্ঠিত গণভোটে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শ্রীমঙ্গল থানার স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন কংগ্রেস নেতা শ্রীশচন্দ্র দত্ত চৌধুরী যিনি সর্বত্রই লাকু দত্ত চৌধুরী নামে পরিচিত তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ‘ভারতে অন্তর্ভুক্তি’ কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে প্রচারণা চালান। এই কমিটির নেতৃত্বে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা ভারতের পক্ষে রায় দেয়; অপরদিকে সিলেটের চারটি মহকুমা পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয়। জানা যায়, প্রশাসনিক ও যোগাযোগগত বিবেচনায় করিমগঞ্জ মহকুমা ভারত এবং দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় ।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁকে দীর্ঘ কয়েক বছর প্রায় আত্মগোপন অবস্থায় থাকতে হয়। ওই সময় তাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশ নিয়মিতভাবেই তার বাসায় অভিযান চালাত। বলা যায়, সেই সময়টায় এমন তল্লাশি তার দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছিল।
১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি সক্রিয়ভাবে তাতে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দলের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেন।
তিনি নিজের অর্থে বিভিন্ন দলের কার্যক্রমকে সহায়তা করেছেন।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ন্যাপ (মোজাফফর) প্রার্থী সাইয়িদ মুজিবুর রহমানের নির্বাচনী ব্যয়ও তিনি বহন করেন।
রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে তিনি ১৯৫৮, ১৯৬৫ ও ১৯৭৪ সালে কারাবরণ করেন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা আইনে গ্রেফতার করে ছয় মাসের জন্য কারাগারে রাখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী অধ্যায়
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রেরণাদাতা।
তিনি শ্রীমঙ্গলে ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতি করে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন।
তাঁর এই ভূমিকা শ্রীমঙ্গলের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।
১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ন্যাপ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। এই নির্বাচন শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই ছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁর ঐতিহ্যবাহী বাসভবনে হামলা চালানো হয়। এমসিএ মোঃ আলতাফুর রহমান চৌধুরীর নির্দেশে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী ধর্মীয় উস্কানি ছড়িয়ে, বাসভবনের ভেতরে প্রবেশ করে লুটপাট এবং অশান্তি সৃষ্টি করেন। এই হামলা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাসভবনের কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ ছিলেন।
এই ঘটনার পরও ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী রাজনৈতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অটল ছিলেন, যা প্রমাণ করে যে, তাঁর ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ কোনো রাজনৈতিক চাপ বা হুমকিতে ভেঙে পড়েনি।
১৯৭৩ সালে তৎকালীন আর্মির ১৮তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট তার বাসায় তল্লাশি করে ভারতীয় চোরাই পণ্য আছে কিনা তার জন্য অভিযান চালায়। এ সময় তাঁকে না পেয়ে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র কনক লাল দেব চৌধুরীকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে জেমস্ ফিনলে টি কোম্পানির ফুসকুড়ি ক্লাবের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ফিরত বিহারী দেব চৌধুরী স্ত্রী উষা রানী দেব চৌধুরী ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করার কিছুদিন পর তাঁর আটককৃত সন্তান মুক্তি পান। ওই সময় শ্রীমঙ্গল শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরেশ পাল, মহেশ পাল, বিপিন পাল, ইসহাক আলী, গঙ্গেশ দেব রায় সহ আরো অনেকে তাঁর সাথে মুক্তি পান ।
১৯৭৪ সালে তাঁকেও গম চোরাচালানের অভিযোগে আটক করা হলেও ১৭ দিন পর বেকসুর খালাস পান।
মানবিকতা ও দানশীলতা
তিনি শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল, দীনময়ী বালিকা বিদ্যালয় (যা\' বর্তমানে শ্রীমঙ্গল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়)সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।”
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী নিজ উদ্যোগে প্রতিদিন প্রায় ২০০ জন দরিদ্র মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন।
তাঁর এই মানবিক কার্যক্রম বহু পরিবারকে জীবনধারণে সহায়তা করে।
১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান শ্রীমঙ্গল সফরে এসে বিটিআরআই রেস্ট হাউজে অবস্থান করেন। তখন ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী রাষ্ট্রপতির প্রিয় খাবার পরিবেশন করে আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন।
১৯৮৯ সালের ৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বাবরি মসজিদ ঘটনার প্রেক্ষিতে শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে তাঁর ঐতিহ্যবাহী বাসভবনেও হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
পারিবারিক জীবন
ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ছিলেন ১০ সন্তানের জনক।
তাঁর ছয় পুত্র ও চার কন্যা যথাক্রমে কান্তিলাল দেব চৌধুরী, উৎপলা দেব চৌধুরী, কনক লাল দেব চৌধুরী, উর্মিলা দেব চৌধুরী, উত্তমা দেব চৌধুরী, কানন দেব চৌধুরী (বাবলা), উত্তরা দেব চৌধুরী, উত্তম কুমার দেব চৌধুরী, পান্নালাল দেব চৌধুরী (টুটুল) এবং সান্তনু দেব চৌধুরী।
উত্তরাধিকার ও প্রয়াণ
একাধারে রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও দানবীর ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী ছিলেন এক অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবিক মানুষ।
তিনি ১৯৯৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন, রেখে যান এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার—মানবতার সেবা ও শিক্ষার আলো।
শেষ কথা
ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যিকারের মহত্ত্ব সম্পদে নয়, বরং সমাজ ও মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ অবদানে।
তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা, যাঁর দানশীলতা, মানবিকতা ও নেতৃত্ব আজও শ্রীমঙ্গলের ইতিহাসে অনন্ত দীপের মতো জ্বলজ্বল করছে।
যে মানুষ নিজের জীবনকে সমাজকল্যাণে উৎসর্গ করেন, তিনি কখনও মরে না—তাঁর কর্মই তাঁকে অমর করে রাখে।
ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরী সেই অমর মানুষদের একজন।



















