img

প্রায়োরিটি সিট: কিন্তু মানবতা কোথায়?

প্রকাশিত :  ০৯:২৮, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

প্রায়োরিটি সিট: কিন্তু মানবতা কোথায়?

জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি

যুক্তরাজ্যে বেশিরভাগ মানুষকেই যাতায়াত করার জন্য ট্রেন, বাস প্রভৃতি যানবাহনে চলাচল করতে হয়।প্রতিদিনই আমি যে পরিস্থিতি স্বচক্ষে মোকাবিলা করি সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়!  ট্রেনের দরজার পাশে,কখনো  মাঝখানে হ্যান্ড্রেল ধরে বৃদ্ধ মানুষ অথবা পেটে হাত ধরে গর্ভবতী নারী দাড়িয়ে থাকেন।Priority Seat থাকা সত্ত্বেও আজকাল কিছু মানুষের মানবিক বোধের অভাবে যাতায়াত  অনেক কঠিন ও কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে। 

ইচ্ছা করেই অনেকে দেখেও না দেখার ভান,মোবাইলের স্ক্রিনে ধ্যানমগ্ন থাকা,কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুমে বিভোর। যেনো মোবাইলের স্ক্রিনের রিফ্লেক্সশন আর আরামদায়ক সিট-ই তাদের মানবতা।কিন্তু ,সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্রও খেয়াল নেই যাদের জন্য  সিট ত্যাগ করা জরুরি। please offer this priority seat \'লেখাটি প্রতিদিনই দেখি ট্রেনে,বাসে। কিন্তু এই লেখার মানে বুঝার ক্ষমতা,বিবেক বোধ কিছু মানুষ সম্পূর্ণরুপে হারিয়ে ফেলেছে যার ফলে অসুস্থ মানুষ তাদের স্বস্থির বদলে অস্বস্তিতায় ভোগতে হচ্ছে। 

অথচ আমি বসা ছিলাম ট্রেনে সেদিন।একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা কে দেখলাম  বাগিতে একজন বেবিকে নিয়ে ট্রেনের দরজার সামনে দাড়িয়ে আছেন,আমি সাথে সাথে উঠে তাকে অফার করলাম সিট তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে ক্লান্ত শরীর টা নিয়ে সিটে বসে একটা স্বস্থির হাসি দিলেন।

তখন বিশ্বাস করুন, এই হাসিতে আমি মানবিকতার জয় দেখেছি।মূলত একটা সিট ছেড়ে দিলে কেউ গরীব হয়ে যায় না।বরং এটি মানবতার, সভ্যতার বিশাল একটি আয়না যার মধ্যে আমরা আমাদের বিবেক বোধের পরিচয় খুঁজে  পাই।

আরেকদিন আমি দাড়িয়েই ছিলাম ট্রেনে দরজার পাশে দেখলাম হোয়াইটচ্যাপেল স্টেশন থেকে একজন 

 বৃদ্ধ মানুষ (হাতে একটি সাপোর্টার লাঠি ছিল) ট্রেনে উঠে সিট খুজতেছেন অসহায়ের মতো অথচ তার প্রায়োরিটি সিটে বসে আছে তরুণ একজন মানুষ যার দুই চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে।গেম আর আড্ডায় মাতোয়ারা সে ডিভাইসে। যেখানে কিছু সময়ের জন্য প্রাপ্য ব্যক্তিকে সিট অফার করা মানিবিক দায়িত্ব সেখানে আজকাল মানুষ এটাকে কষ্টসাধ্য ভেবে এড়িয়ে চলে,যা কখনোই কাম্য নয়।একটি দেশের, সংস্কৃতি, মানবিকতার পরিচয় এই ছোট্ট বিষয় গুলা থেকেই অনুধাবন করা হয়। 

প্রায় কয়েক মাস আগে,আমি ট্রেনে করে হোয়াটচ্যাপেলে যাচ্ছিলাম,সৌভাগ্যক্রমে ওই ট্রেনে আমার শ্রদ্ধেয় একজন স্যার আতাউর রহমান (pdg পীর)  ছিলেন।যার জন্য স্যারের সাথে দেখা হল,স্যার একটি সিটে বসা ছিলেন

স্যার তো বয়স অনুযায়ী প্রায়োরিটি সিট পাওয়ার যোগ্য কারণ তিনি যথেষ্ট বয়স্ক চাইলে সিটে বসে থাকতে পারতেন, তবুও তিনি একজন গর্ভবতী মহিলাকে দাড়াতে দেখে সাথে সাথে নিজে উঠে সিট অফার করলেন

মহিলাটি অবাক হয়ে চেয়ে রইলো আর অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে অবসাদের শরীর টা নিয়ে বসল। তখন যে প্রশান্তি আর স্বস্থির ছাপ দেখেছিলাম মহিলার চেহারায় তা অসম্ভব সুন্দর ছিল।স্যার এতো মানিবিক মানুষ আমি গর্বিত । ট্রেনের আরও অনেক মানুষ এটি দেখে শিক্ষা অর্জন করবে আশা করি কারণ তারা চুপচাপ বসে ছিল।অথচ প্রায়োরিটি সিট অফার করা তাদের কাছে অপশনাল ব্যাপার মাত্র মনে হয়েছিল।আসলে এটি নৈতিক, মানবিক দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।স্যার একজন বয়স্ক মানুষ হয়েও একজন গর্ভবতী মহিলাকে প্রায়োরিটি দিলেন

আর এদিকে অনেক তরুণ তরুণী বসেই রইলো যা বিবেকহীনতা আর মূর্খতার পরিচয়। 

তাই আমাদের উচিত, আমরা যে দেশেই বাস করিনা কেন,যে যানবাহন ই চড়িনা কেন,প্রায়োরিটি সিটের মর্ম আমরা যাতে না ভুলি,যোগ্য ব্যক্তিদের সিট দিতে যেন কখনো ইতস্ততবোধ না করি।

তাই আসুন আমরা আমাদের বিবেক বোধকে জাগ্রত করি,priority seat টি সগর্বে অফার করি,আমরা আগে নিজে বদলাই, তাহলেই আমাদের আশে পাশের মানুষ বদলাবে।বদলাবে ট্রেনের এমন করুণ প

পরিস্থিতি। 

তাই আমার কবিতার  ভাষায় অনুরোধ _

\'নয়কো কভু ছোট একটি মাত্র সিট 

ছাড়লে হবে যে মানবিকতার জিৎ

একটু আরাম ত্যাগ করে নাও

বিবেক বোধের জন্য, 

দুর্বল ব্যক্তিকে সিট দিয়ে দাও

তবেই তুমি মানুষরুপে ধন্য।



~জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি
ই-মেইল: [email protected]

মতামত এর আরও খবর

img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

মতামত এর আরও খবর