img

মৃতপ্রায় পুঁজিবাজারে প্রাণের সঞ্চার: নিরাপদ ছায়া ছেড়ে 'হিরো' হয়ে ওঠার গল্প

প্রকাশিত :  ০৯:২৪, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মৃতপ্রায় পুঁজিবাজারে প্রাণের সঞ্চার: নিরাপদ ছায়া ছেড়ে 'হিরো' হয়ে ওঠার গল্প

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

পুঁজিবাজারের ভাষা সংখ্যার হলেও এর আত্মা আসলে মানুষের। এখানে সূচক ওঠানামা করে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে মানুষের আস্থায়। এখানে লেনদেন হয় কোটি টাকায়, তবে ঝুঁকির মুখে থাকে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়, অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন কিংবা প্রবাসীর পাঠানো কষ্টার্জিত অর্থ। সেই বাজারই একসময় আস্থাহীনতার এমন তলানিতে পৌঁছেছিল যে, ‘শেয়ার’ শব্দটি অনেকের কাছে আতঙ্ক, হতাশা আর প্রতারণার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৯৬ সালের ধস ছিল এক প্রজন্মের কাছে প্রথম বড় শিক্ষা। ২০১০ সালের পতন ছিল দ্বিতীয় আঘাত। দুই দশকের ব্যবধানে দুবার স্বপ্নভঙ্গ পুঁজিবাজারকে দীর্ঘ এক ‘শীতঘুমে’ ঠেলে দেয়। সূচক তলানিতে নামে, লেনদেন শুকিয়ে যায়। এমন দিনও গেছে যখন দৈনিক লেনদেন ৩০০ কোটির নিচে নেমেছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের হলঘর তখন যেন নিস্তব্ধ এক পরিত্যক্ত স্টেশন—যেখানে ট্রেন আসে না, যাত্রী নেই, আছে কেবল অন্তহীন অপেক্ষা।

এমন স্থবির সময়েই আসে ২০২০ সাল। করোনা অতিমারি কেবল জনস্বাস্থ্যই নয়, থামিয়ে দিয়েছিল অর্থনীতির চাকাও। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা দুই মাস শেয়ারবাজার বন্ধ রাখা হয়। পুনরায় চালু হলেও বাজারে প্রাণের স্পন্দন ফিরছিল না; বিনিয়োগকারীরা ছিলেন সন্দিহান। হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলেও আস্থার অভাবে তাঁরা বাজারে ফিরতে চাইছিলেন না। কারণ, বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা জোড়া দেওয়া কঠিন।

ঠিক এই ক্রান্তিকালেই জনৈক আবুল খায়েরের নাম আলোচনায় আসে, যিনি পরে ‘হিরো’ নামেই সমধিক পরিচিত হন। কেউ তাঁকে সাহসী বলেছেন, কেউ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আবার কেউবা দেখেছেন সন্দেহের চোখে। তবে সত্য, তাঁর বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ বাজারে অর্থের নতুন স্রোত তৈরি করেছিল।

সিদ্ধান্তের নেপথ্য কথা

আবুল খায়েরের জীবনদর্শনকে যদি এককথায় সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে তা হবে—‘সিদ্ধান্ত’। তিনি ৩১তম বিসিএস (সমবায়) ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক হিসেবে তাঁর জীবন ছিল স্থিতিশীল ও সম্মানজনক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিসিএস ক্যাডার হওয়া কেবল চাকরি নয়, বরং তা সামাজিক মর্যাদা ও নিশ্চিত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

কিন্তু তিনি সেই গণ্ডিবদ্ধ নিশ্চিন্ত জীবনে স্থির থাকেননি। সরকারি চাকরির নিরাপদ ছায়া ছেড়ে পুঁজিবাজারের অনিশ্চিত জগতে পা দেওয়া কেবল পেশা বদল ছিল না, ছিল এক বৈপ্লবিক মানসিক পরিবর্তন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংকনির্ভর কাঠামোর বাইরে গিয়ে পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে হবে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্পায়নের অর্থায়ন এবং সাধারণ মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির বিকল্প হিসেবে এই বাজারই হতে পারে মূল ভিত্তি।

তাঁর শিক্ষাগত প্রস্তুতিও ছিল সুদীর্ঘ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ (২০০৫-০৬) ও এমবিএ (২০০৯-১০) সম্পন্ন করার পর তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কে এমপিএ এবং পুঁজিবাজার বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ২০০৬ সালে কর্মজীবন শুরুর পর পাঁচবার নিজের সমস্ত মূলধন হারিয়েও ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে বাজারের অনিশ্চয়তার গভীর পাঠ দিয়েছিল। এই ব্যর্থতাগুলোই তাঁকে শিখিয়েছিল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গূঢ় কৌশল।

তারল্যের জোয়ার

করোনাকালে বাজার যখন স্থবির, তখন তিনি বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়ে সক্রিয় হন। বিনিয়োগকারী মহলে তখন তাঁর প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার তহবিলের কথা চর্চিত হতো। মৌলভিত্তিসম্পন্ন অনেক শেয়ার তখন ‘ফ্লোর প্রাইস’-এ আটকা ছিল; ছিল না কোনো ক্রেতা কিংবা আস্থা।

তিনি সেই অবমূল্যায়িত শেয়ারগুলোর মধ্যেই সম্ভাবনা খুঁজে পান। বীমা, আইটি ও ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেন। ফলে বাজারে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পায়। কয়েকশ কোটি টাকার দৈনিক লেনদেন মুহূর্তেই কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। ডিএসইএক্স (DSEX) সূচক ৩,৮০০ পয়েন্টের গর্ত থেকে উঠে ৭,০০০ পয়েন্টের মাইলফলক অতিক্রম করে।

এই উত্থান কেবল অর্থের জোরে হয়নি, এর পেছনে ছিল মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। বাজারে বড় বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি অনেক সময় শক্তিশালী সংকেত হিসেবে কাজ করে—‘বাজার এখনো ফুরিয়ে যায়নি।’ এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে সাহস ফিরে পান।

‘হিরো’ উপাধির নেপথ্যে

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বহুবার সিন্ডিকেট আর কারসাজির কবলে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন। ফলে তাঁদের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের স্বচ্ছতা তাঁকে অনন্য করে তোলে। তিনি কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন, তা প্রায়ই প্রকাশ্য হয়ে পড়ত। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাঁকে অনুসরণ করার সুযোগ পেতেন।

বাজারে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়—তিনি যেখানে হাত দিচ্ছেন, সেখানেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। অনেকেই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে লাভবান হন, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘হিরো’ উপাধি। এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়, বরং বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবেগীয় বহিঃপ্রকাশ।

আলো ও ছায়া

তবে কোনো উত্থানই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি, ‘সিরিজ ট্রেডিং’-এর অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানা তাঁর পথচলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বড় বিনিয়োগ তারল্য বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য।

আবুল খায়েরের দাবি ছিল—তাঁর সব কার্যক্রম আইনের আওতাভুক্ত এবং মূল লক্ষ্য ছিল বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা। এখানে প্রশ্নটি ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়: আমাদের পুঁজিবাজার কি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে আস্থা ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে প্রতিষ্ঠাননির্ভর হবে?

তারকার উপস্থিতি ও বর্তমান চিত্র

ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের পুঁজিবাজারে সম্পৃক্ততা এখানে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তারকার অংশগ্রহণ তরুণ প্রজন্মকে শেয়ারবাজার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। বাজার তখন কেবল আর্থিক লেনদেনের স্থান থেকে আলোচনার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে সেই গ্ল্যামার কি দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি গড়ে দিতে পেরেছে, নাকি তা ছিল সাময়িক হুজুগ—সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।

সময়ের পরিক্রমায় বাজারের চিত্র পাল্টেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে সূচক আবারও নিম্নমুখী হয়েছে। ৬,০০০ পয়েন্টের নিচে সূচকের অবস্থান নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বড় বিনিয়োগকারীর অভাব বোধ করছেন, আবার কেউ কেউ ব্যক্তিনির্ভর আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।

একজন পর্যবেক্ষকের চোখে আবুল খায়ের ছিলেন ঝড়ের রাতে বাতিঘরের মতো—যিনি সাময়িকভাবে আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু বাতিঘর কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; নিরাপদ নৌপথ তৈরির জন্য প্রয়োজন সঠিক মানচিত্র, নিয়ম এবং দক্ষ নাবিক।

এই গল্প আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়:

 ১. তারল্য ও সুযোগ্য নেতৃত্ব থাকলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানো সম্ভব।

 ২. বড় বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারেন।

 ৩. টেকসই উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন অপরিহার্য।

আবুল খায়েরকে কেউ সাহসী বলেন, কেউ বা বিতর্কিত। তবে সংকটের সময়ে তিনি যে বাজারে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন, তা অনস্বীকার্য। পাঁচবার সব হারিয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর এই গল্পে যেমন অধ্যবসায় আছে, তেমনি আছে প্রবল ঝুঁকি। দিনের শেষে পুঁজিবাজারের ইতিহাস কোনো ব্যক্তির নয়, বরং ব্যবস্থার ইতিহাস। তবু সাহসের হাত ধরে কোনো কোনো মানুষের পদচিহ্ন সেখানে অমলিন হয়ে থাকে—যা সংখ্যার গ্রাফে নয়, মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকে।

img

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত নয়, প্রয়োজনে সংশোধন : বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশিত :  ০৬:৫৬, ০৪ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি অপরিবর্তনীয় নয়; প্রয়োজনে এতে সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। 

তিনি বলেন, চুক্তিতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে।

বুধবার (৪ মার্চ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি প্রায় পৌনে তিন বিলিয়ন ডলার। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।

সম্প্রতি ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে যে সমালোচনা হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতেই উভয় পক্ষের স্বার্থ থাকে।

কিছু ধারা এক পক্ষের জন্য সুবিধাজনক হয়, আবার কিছু ধারা অন্য পক্ষের অনুকূলে থাকে। আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, চুক্তিটিকে এখনই সম্পূর্ণ ইতিবাচক বা সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি রাষ্ট্রীয় চুক্তি এবং বাস্তবতার অংশ।

তবে কোনো চুক্তিই স্থায়ী নয়; প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

মার্কিন আদালতে জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপিত শুল্ক সংক্রান্ত রায়ের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি এখনো বিকাশমান এবং সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

ভিসা বন্ড ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখছে। তবে সরকার চায় দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যেন নির্বিঘ্নে যাতায়াত ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।