img

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির যে কারণে ভরাডুবি

প্রকাশিত :  ০৪:৫২, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির যে কারণে ভরাডুবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের  অবশেষে শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্তি ঘটলো। এতে সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। ফলে সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে দলটি। আর ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী জোট।

গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে স্বকীয়তা হারিয়েছে জাপা। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে স্বকীয়তা হারিয়েছে জাপা। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

তবে এই নির্বাচনে একটি আসনেও জয় পায়নি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা)। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম দলটির কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এমনকি ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও বিপর্যস্ত হয়েছে দলটির।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসন থেকে নির্বাচন করে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শামসুজ্জামান শামু পান ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। অন্যদিকে জি এম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জাতীয় পার্টির হয়ে। তবে একটি আসনেও জয় পাননি তারা।

জাপার বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লাঙ্গল প্রতীকের এমন হার শুধু নির্বাচনী ফল নয় বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এই ফলাফলে জাতীয় পার্টির রাজনীতির শেষ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

জাপার অতীত ফলাফল

সেনাপ্রধান থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে টানা ৯ বছর দেশ শাসন করেন এইচ এম এরশাদ। গণ–আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল। দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ জেলে থেকে রংপুরে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। দলটির প্রার্থীরা ভোট পেয়েছিলেন ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসনসংখ্যা ছিল ৩২। ভোট পেয়েছিল ১৬ শতাংশ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনেও এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন।

 ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি আসন পায় ১৪টি। ভোটের সংখ্যা ৭ শতাংশে নেমে আসে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হিসেবে ভোট করে দলটি। তারা আসন পায় ২৮টি এবং ভোট পায় ৭ শতাংশ। সেবার এক প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি আসনে ভোট করার নিয়ম চালু হয় এবং এরশাদ ঢাকা ও রংপুরে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নেয়। দলটির প্রাপ্ত ভোট ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘রাতের ভোট’ বলে পরিচিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আসন পায় ২২টি। তাদের ভোটের হার কমে দাঁড়ায় ৫ শতাংশের কিছু বেশি। সেবারও দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে জায়গা করে নেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ৩ শতাংশের মতো ছিল।

মধ্যবর্তী শক্তি থেকে প্রান্তিকতায়

একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’ হিসেবে পরিচিত ছিল জাতীয় পার্টি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার সঙ্গে নৈকট্য বজায় রাখলেও একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির দাবি করা—এই দ্বৈত অবস্থান দলটির জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করেছে, দলটি স্পষ্টভাবে কোনো পক্ষের নয়; ফলে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও নয়, আবার স্থিতিশীল ক্ষমতার অংশ হিসেবেও নয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানে এটিকে ‘অবস্থানগত অস্পষ্টতা’ বলা হয়, যা ভোটারদের সিদ্ধান্তহীন করে তোলে। নির্বাচনের সময় মানুষ সাধারণত এমন দলকে বেছে নেয়, যাদের ভূমিকা পরিষ্কার এবং ক্ষমতায় গেলে কী করবে তা অনুমানযোগ্য। জাতীয় পার্টি সেই বিশ্বাস তৈরি করতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে জাপা তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি 

দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির শক্তি ক্ষয় করেছে। নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ, বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসংগতি- এসব কারণে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অনেক অভিজ্ঞ নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, আবার নতুন নেতৃত্ব মাঠে প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। নির্বাচনী রাজনীতিতে ঐক্যবদ্ধ সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন কর্মীরা নিজেরাই বিভক্ত থাকে, তখন ভোটারদের কাছে শক্তিশালী বার্তা পৌঁছায় না। ফলে অনেক আসনে দলীয় প্রচারণা দুর্বল ছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় মাঠে উপস্থিতি কম দেখা গেছে। এর ফল এবারের নির্বাচনে হাতেনাতে পেয়েছে দলটি।

আওয়ামী লীগের মিত্রের পতন

জুলাই-আগস্টে ছাত্র ও জনতার গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। অন্য দেশে নেতাদের পালিয়ে যাওয়া এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে ছিল না আওয়ামী লীগ। সেইসঙ্গে দলটির নেতৃত্বাধীন জোট ও মিত্র অধিকাংশ দল ছিল ভোটের বাইরে।

এদিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের মতো জাপাকে নিষিদ্ধ করতে সরকারকে চাপ দিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কিছু দল। এরপরও বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে এবারের নির্বাচনের ভোটে ছিল জাতীয় পার্টি। যদিও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো হেভিওয়েট নেতারা ভোটের আগে আলাদা দল ঘোষণা করেন। কিন্তু তারা প্রতীক জটিলতায় ভোট করতে পারেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় পার্টি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলেছে। এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে। ২০০৬ সালে বিএনপি–জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গী হয় জাতীয় পার্টি। পরে ২০০৮ সালের ভোটে সমঝোতা করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভোট করে এবং সরকারের অংশ হয়।

ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের ক্ষয়

জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতেও আগের মতো সমর্থন দেখা যায়নি। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ দলটির ইতিহাসের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত নয়। তারা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দলটি এসব বিষয়ে নতুন বা আকর্ষণীয় কর্মসূচি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ফলে পুরোনো ভোটারদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, আর নতুন ভোটাররা অন্য বিকল্প বেছে নেয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও দৃশ্যমান সাফল্যের গল্প তুলে ধরতে না পারাও এই ক্ষয়ের একটি কারণ।

জাতীয় পার্টির ভাঙা–গড়া

জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায়ই জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধ ছিল। ছোট ভাই জি এম কাদের ও স্ত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দল চালিয়েছেন এরশাদ। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর তা আর নেই। রওশন এরশাদ অসুস্থ হলেও তার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির আরেকটি ধারা রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জি এম কাদেরকেই মূল নেতা হিসেবে কাছে টেনেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে রওশন অনেকটাই আড়ালে চলে যান। 

এখন জি এম কাদেরের দলের মহাসচিব হয়েছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এর বাইরে দলে সেভাবে পরিচিত নেতা নেই। দলের সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে ১৪ ডিসেম্বর ক্ষমা চেয়ে আবার জাতীয় পার্টিতে ফেরেন তিনি। একই সঙ্গে রংপুর–৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ মণ্ডল আবার দলে ফিরেছেন। এর মাধ্যমে ভঙ্গুর দলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

এর আগে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ভাগ হয়। এর নাম হয় জাতীয় পার্টি (জেপি)। এরশাদের একসময়ের মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে আরেক নতুন পার্টি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) হয়। এই দলটির প্রধান আন্দালিভ রহমান পার্থ বিএনপি জোটের হয়ে এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে জয়ী হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছিল। লাঙ্গল প্রতীক ও এরশাদের প্রতি দুর্বলতা বিবেচনায় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে জি এম কাদেরের জাপা কিছুটা অবস্থান ধরে রাখতে পারবে- এমনটাই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু জাপা পর্যুদস্ত হয়ে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

মাঠপর্যায়ের সংগঠন ও প্রচারণার দুর্বলতা

নির্বাচনে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো—বুথ কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক, ভোটার যোগাযোগ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা। বড় দলগুলোর তুলনায় জাপা এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। অনেক এলাকায় নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রম না থাকায় ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় হঠাৎ প্রচারণা চালিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ভোটের দিন সংগঠিত উপস্থিতি না থাকলে সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে আনা কঠিন হয়ে যায়, যা ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

পরিবর্তিত ভোটার মানসিকতা

বর্তমান সময়ে ভোটাররা আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী। তারা এমন প্রার্থী বা দলকে সমর্থন দিতে চান, যাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি এবং যারা সরাসরি উন্নয়ন বা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে বলে মনে হয়। ‘ভোট নষ্ট হয়ে যাবে’— এই ধারণা তৈরি হলে ছোট বা মাঝারি শক্তির দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতীয় পার্টি এই মনস্তত্ত্বের শিকার হয়েছে। সমর্থক থাকলেও অনেক ভোটার কৌশলগতভাবে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।

জাতীয় এর আরও খবর

img

ইরান-কুর্দিস্তান উত্তেজনা তৈরিতে মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতা, সিএনএন-এর বিস্ফোরক রিপোর্ট

প্রকাশিত :  ১১:৪৮, ০৫ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৬, ০৫ মার্চ ২০২৬

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের ভেতরে গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর লক্ষ্যে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ইরাকে অবস্থানরত কুর্দি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই পদক্ষেপটি মূলত ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় একটি বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টার অংশ। তবে কুর্দিস্তানের বেশিরভাগ নেতা বলছেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা সুখকর নয় এবং বর্তমানে আমাদেরকে কী টার্গেট নিয়ে আগাতে হবে তা একদমই পরিষ্কার নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন; একদিন বলেন কুর্দি জনগণের মুক্তি, আরেকদিন ইরানে ক্ষমতার পালাবদল, বিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংসের কথা, আবার আরেক দিন ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করছে তাঁর বাহিনী! এর ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নিতে তারা রীতিমতো শংকিত। অন্যদিকে ইরান যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কুর্দিদের যে, তারা সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেবে যদি তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

ইরান ও কুর্দি জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল। কুর্দিরা বিশ্বের বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী যাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নেই। তারা ইরান, ইরাক, তুরস্ক এবং সিরিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে আছে।

১. ১৯৭৯ সালের বিপ্লব ও স্বায়ত্তশাসন: ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর কুর্দিরা আশা করেছিল যে নতুন ইসলামী প্রজাতন্ত্র তাদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে। কিন্তু তৎকালীন সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, যার ফলে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়।

২. সাদ্দাম হোসেন ও কুর্দিরা: ১৯৯০-এর দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কুর্দিরা অনেক সময় বিভিন্ন শক্তির হয়ে লড়াই করেছে। তবে তারা বারবার বড় শক্তিগুলোর (যেমন যুক্তরাষ্ট্র) রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং পরে পরিত্যক্ত হয়েছে।

৩. মাহসা আমিনি ও সাম্প্রতিক গণজাগরণ: ২০২২ সালে কুর্দি বংশোদ্ভূত তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে যে "নারী, জীবন, স্বাধীনতা" (Woman, Life, Freedom) আন্দোলন শুরু হয়, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুর্দি অঞ্চলগুলো। ইরান সরকার এই বিক্ষোভকে বিদেশের মদদপুষ্ট 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেয় এবং কুর্দি অঞ্চলগুলোতে কঠোর সামরিক অভিযান চালায়।

বর্তমান পরিস্থিতি সিএনএন-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, সিআইএ এখন ইরানের ভেতরে একটি ছায়া যুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার শুরু করতে চাচ্ছে। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়ার মাধ্যমে তারা ইরানের পশ্চিম সীমান্তে একটি 'বাফার জোন' তৈরি করতে চায়, যা ইরান সরকারকে চাপে ফেলবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: নাতাশা বারট্রান্ড (Natasha Bertrand), অ্যালাইনা ট্রিন (Alayna Treene), এবং ক্লারিসা ওয়ার্ড (Clarissa Ward) [সিএনএন-এর মূল রিপোর্ট থেকে সংগৃহীত]।