img

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র জীবিত ভাষা সৈনিক, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত

প্রকাশিত :  ০৯:১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শ্রীমঙ্গলের একমাত্র জীবিত ভাষা সৈনিক, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা। ইতিহাসে এই অঞ্চল বহু রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাক্ষী। এখানকার মাটি, মানুষ ও রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন এক আদর্শবান রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মী—রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী। প্রায় সাত দশক ধরে রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর অবদান সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ক।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১২ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের আসামের শ্রীমঙ্গল থানার নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জমিদার যতীন্দ্র মোহন দত্ত চৌধুরী, মাতা বিন্দুবাসিনী দত্ত চৌধুরী। পৈত্রিক নিবাস ছিল শ্রীহট্ট জেলার ঢাকাদক্ষিনের দত্তরাইল গ্রামে।

শিক্ষাজীবন শুরু শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে। পরে তিনি মৌলভীবাজার কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও বিকম পাস করেন  এবং পরে বি.এড সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক কর্মজীবনে শ্রীমঙ্গল ভৈরব বাজার হাই স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত শিক্ষাজীবন ও চাকরি ত্যাগ করে জনসেবার জন্য বালিশিরা পাহাড় আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। দলীয় প্রধানের নির্দেশক্রমে তিনি চাকরি ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক দলের সংগঠক হিসেবে মনোনিবেশ করেন। এই সময় গ্রাম-গঞ্জে দলের সংগঠনকে শক্তিশালী করে তোলেন এবং এটিকে স্থানীয় প্রধান বিরোধী শক্তিশালী দলের রূপ দেন।

এরপর তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা WHO-এর অধীনে হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার মহকুমার কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি নিবেদিত থাকার কারণে চাকরিটি ছেড়ে পুনরায় সার্বক্ষণিক সংগঠক হিসেবে রাজনৈতিক সংগঠনে মনোনিবেশ করেন। 

ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রজীবন

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেন। শ্রীমঙ্গল টাউন কমিটির মাঠে ছাত্রদের বিশাল জনসভায় নেতৃত্বদান তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। যদিও দেশে অসংখ্য ব্যক্তি ভাষা সৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছেন, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।

ছাত্রজীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ (ভাসানী) গঠিত হলে তাতে যোগ দিয়ে বাম রাজনীতিকে অত্র অঞ্চলে শক্তিশালী করেন।

কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সেল ও সহকর্মীরা

পাকিস্তান আমলে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সেলের আহবায়ক ছিলেন। এই সেলের অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন যথাক্রমে মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া ও

সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান। এই সেলের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন এবং শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলোর সমন্বয় সাধন করা হত।

বালিশিয়া পাহাড় আন্দোলন ও ৬ দফা আন্দোলন

১৯৬৩ সালে শ্রীমঙ্গলে বালিশিয়া পাহাড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। মোঃ শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে তিনি আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। এই আন্দোলন প্রতি বছর শহীদ দিবস পালনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।

১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল: গ্রেফতার ও রাজনৈতিক দমন

১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল, পাকিস্তান ভাঙা তথা “জয়বাংলা” মামলার প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেফতার হন। একই সময় ন্যাপ নেতা মোঃ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম ও এস এ মুজিবকেও আটক করা হয়। পাকিস্তান সরকার তাদেরকে মৌলভীবাজার জেলায় প্রেরণ করে।

পরদিন শ্রীমঙ্গলে ন্যাপের উদ্যোগে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ন্যাপনেত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি ও ন্যাপ নেতা আহমেদুল কবির মুক্তির দাবিতে বক্তব্য রাখেন। হাজার হাজার ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের ফলে সরকার তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তান বিরোধী কার্যক্রম

১৯৭১ সালের ১ মার্চ, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের ভাষণ প্রচারিত হলে শ্রীমঙ্গল পৌরসভা থেকে ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোঃ শাহজাহান মিয়া ও সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান নেতৃত্বে স্লোগান মিছিল শুরু করেন।

২৪ মার্চ পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলে তিনি অসংখ্য নেতাকর্মীর সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতের একটি ক্যাম্প পরিচালনা করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তরুণ ছাত্র-যুবক এবং সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন।

১ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে স্বাধীন বাংলার পতাকা রক্ষা করেন। ৩০ এপ্রিল পাকবাহিনী শ্রীমঙ্গলে প্রবেশ করলেও রাসেন্দ্র দত্ত ও অন্যান্য নেতারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নেন।

ভারত সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রাখায়, এবং ভারত সরকারের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের কারণে তাকে সম্মানসূচক সার্টিফিকেট প্রদান করে।

চেয়ারম্যান পদকাল ও স্থানীয় উন্নয়ন

১৯৮৩ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে কোন প্রচারণা বা ব্যক্তিগত খরচ ছাড়াই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।

চেয়ারম্যান থাকাকালীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। স্থানীয়রা জানান, তাঁর তৈরি উন্নয়ন রেকর্ড এখনও কেউ ভাঙতে পারেনি।

সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা

স্বাধীনতার পর শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। কমলেশ ভট্টাচার্য, জহির উদ্দিন আহমেদ, রানা দেবরায়সহ বহু সাংবাদিক শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতায় স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। প্রেসক্লাব হয়ে ওঠে সাংবাদিকদের ঐক্যের প্রতীক।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সোভিয়েত সফর

১৯৮০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সরকারের আমন্ত্রণে রাশিয়া সফর করেন। মস্কো, লেনিনগ্রাদ ও উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র ঘুরে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, কৃষি উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। দেশে ফিরে তরুণ রাজনীতিক ও কর্মীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি ও অন্যায় বঞ্চনা

উচ্চ রাজনৈতিক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ অবদান ও পরবর্তী সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর বিশেষ অবদান সত্ত্বেও , ২০১৭ সালে সরকারের যাচাই-বাছাই কমিটিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত হয়নি, যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ মোঃ আব্দুস শহীদ এমপি  ও কমিটির অন্যান্য কিছু সদস্যের সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে।

স্বাস্থ্য ও বর্তমান জীবন

৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালে মাইল্ড স্ট্রোক এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর  সুস্থ হয়ে শ্রীমঙ্গল শহরের বাসভবনে বসবাস করছেন।

রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি সংগ্রামী, সাহসী সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতি কর্মী। 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা ও সমাজকল্যাণ—সকল ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অম্লান। ভারত সরকারের সম্মানসূচক সার্টিফিকেট প্রাপ্তি, প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও স্থানীয় উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর দীর্ঘ জীবনকাহিনি মৌলভীবাজার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য দলিল।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

হবিগঞ্জে জমির বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র নিহত, আহত অন্তত ২০

প্রকাশিত :  ১১:৩৭, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলাস্থ বেগমপুর গ্রামে সরকারী জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়া (২৩) নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

নিহত মঞ্জুর মিয়া ওই গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে এবং নবীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের বেগমপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত আব্দুল হাসিমের ছেলে খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে সরকারী জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। একই গ্রামের হেলাল মিয়া ও মনিরুজ্জামান ওই জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার সকালে হেলাল ও মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে মঞ্জুর মিয়াসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মঞ্জুর মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সাফি মিয়া (৩২), মুজিবুর রহমান (৩২), শামিম মিয়া (৫০), মামুন মিয়া (৩১), জুনেদ মিয়া (২৮), রুহেল মিয়া (৩৮), ইমন মিয়া (১৭), কাউছার মিয়া (২২), জুয়েল আহমেদ (৩২)সহ আরও অনেকে। বাকিরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

নিহতের বাবা খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা ওই জমিতে বসবাস করে আসছেন। প্রতিপক্ষ জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এবং ঘটনার দিন ভাড়াটিয়া লোকজন নিয়ে হামলা চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে থানার ওসি (তদন্ত) দুলাল মিয়া জানান, সরকারী জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর