img

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির যারা এগিয়ে

প্রকাশিত :  ০৮:৩২, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৪০, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির যারা এগিয়ে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন। সংবিধান অনুযায়ী ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য শিগগিরই তপশিল ঘোষণা করবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংসদে আসনসংখ্যায় এগিয়ে থাকায় এই সংরক্ষিত আসনের মধ্যে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬টি আসন বিএনপির ঝুলিতে যেতে পারে।

রমজানের মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। ঈদের আগেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে চায়। এটা ৯০ দিনের মধ্যেই করতে হয়। সে ক্ষেত্রে যদি সম্ভব হয়, রোজার মধ্যেই এটা করে ফেলার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে এরই মধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেত্রীরা। যাদের বেশিরভাগই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের কয়েকজন নেতা বলেছেন, ইসির তপশিল অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিএনপিতে যোগ্য নারী নেত্রীর সংখ্যা অনেক। তাদের রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও অবদান বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা:

নির্বাচন কমিশন ৫০টি ধরেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এতে কোনো সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে কি না, জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, এখন ৫০টি আসন আছে। নির্বাচন করতে কোনো বাধা নেই। পরবর্তী সময়ে যদি দলগুলো একমত হয় বা সংসদে যদি পাসও হয়, সেক্ষেত্রে বাকি ৫০টি পরবর্তী সময়ে করে ফেলবে।

সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী কালবেলাকে বলেন, ১০০ আসন তো এখনো করেনি। এটি না হওয়া পর্যন্ত আগের আইন পূর্ণ বহাল থাকে। তার মানে এটাকে স্থগিত করা বা অন্য কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। এটি সংসদে পাস হলে তা সংবিধানে যুক্ত হবে। তারপর আইন সংশোধন হবে। আইন সংশোধন হলে সেখানে বলা থাকবে যে, কবে থেকে আইনটি কার্যকর হবে। যেহেতু এখনো তা হয়নি, না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সংবিধান বহাল আছে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ৩০০ আসনে নির্বাচন হলো। যেটা কথা ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে। তাতে তো মেজর যে পক্ষ সে পক্ষ শপথ নেয়নি। তাই ওটার কার্যক্রমও মূলত চালু হয়নি। তাহলে তো আগেরটাই বহাল থাকবে।

এ বিষয়ে ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ও বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ জকরিয়া কালবেলাকে বলেন, এখন আইন যা আছে তাই তো হবে। জুলাই সনদ তো কোনো সংবিধান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদ অনুমোদন না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলোর আইনি কোনো ভিত্তি নেই। যদি আইনগুলো সংসদে প্রথম অধিবেশনে পাস না হয়। তাহলে তো ওগুলোর ন্যাচারাল ডেথ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সংরক্ষিত আসনের ৫০টি আসন তো এক দিনে হয়নি। এটি যখনই বাড়বে তখন হবে, অসুবিধা নেই। এখন বিদ্যমান যেটি আছে সেটিই হবে।

বিএনপি কি এটি বাস্তবায়ন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো পলিসি ডিসিশন। অনেক আলাপ আলোচনার বিষয়। এটি এখনো ডিসাইডেড কোনো বিষয় না। ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কোনো দলই তো তা বাস্তবায়ন করেনি। কোনো কোনো দল তো একটি আসনেও নারী প্রার্থী দেয়নি বলে জানান তিনি।

আলোচনায় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রীরা:

জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মহিলা দলের ত্যাগী নেত্রী ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের জায়গা দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ নেত্রীও জায়গা পাবেন। কেননা, ২০০১ সালে যারা সংক্ষিপ্ত আসনের এমপি ছিলেন তাদের অনেকে বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন। তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ এবারও জায়গা করে নিতে পারেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোয় মনোনয়নের জন্য আগ্রহী বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেত্রী, যাদের অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত এবং মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হওয়া প্রার্থী। তরুণ প্রজন্মের নেত্রীরা বিশেষ করে বিগত ১৭ বছরে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন, তাদের নামও আলোচনায় আছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ঢাকায় অবস্থান করে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরও করছেন। তবে মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের হাইকমান্ড নেবে বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য আলোচনায় আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান। তিনি ২০০১ সালে সংরক্ষিত আসনে এমপি এবং মন্ত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও নির্বাচিত সিনেট সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানাও আছেন আলোচনায়। আরও আলোচনায় আছেন ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের স্ত্রী ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়ারিস সিমকী, যিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) পরিচালক।

সাবেক এমপিদের মধ্যে ফেনী থেকে রেহানা আক্তার রানু, জামালপুর থেকে নিলোফার চৌধুরী মনি, মাগুরা থেকে নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মাদারীপুর থেকে হেলেন জেরিন খান, ঢাকা থেকে সুলতানা আহাম্মেদ, চাঁদপুর থেকে রাশেদা বেগম হীরা, হবিগঞ্জ থেকে শাম্মী আক্তার, বরিশাল থেকে বিলকিস জাহান শিরিন, সিরাজগঞ্জ থেকে বরেণ্য সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা ও নীলফামারী থেকে বেবী নাজনীন আলোচনায় আছেন।

এ ছাড়া আলোচনায় আছেন ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও গৌরীপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি, যিনি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি। এ অঞ্চল থেকে আরও আলোচনায় আছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি এবং ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সহসভাপতি ফাহসিনা হক লিরা, যিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি।

এ ছাড়া পাবনা থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, বরগুনা থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, রাজশাহী থেকে বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবিবা ও রাজশাহী জেলা মহিলা দলের সভাপতি শামসাদ বেগম মিতালী, ঢাকা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া চৌধুরী বেবি, গোপালগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সাবরিনা বিনতে আহমেদ, ফেনী থেকে অ্যাডভোকেট শাহানা আক্তার শানু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের নেত্রী নাদিয়া পাঠান পাপন, নরসিংদী থেকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সেলিনা সুলতানা নিশিতা, মাদারীপুর থেকে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী অ্যাডভোকেট শওকত আরা উর্মি, মুন্সীগঞ্জ থেকে নাসিমা আক্তার কেয়া, মানিকগঞ্জ থেকে মনিরা আক্তার রিক্তা, বরিশাল থেকে আফরোজা খানম নাসরিন, লক্ষ্মীপুর থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বিথিকা বিনতে হুসেইন, মানিকগঞ্জ থেকে রুকসানা খানম মিতু, বাগেরহাট থেকে আয়শা সিদ্দিকা মানি, কুমিল্লা থেকে হেনা আলাউদ্দিন, কুষ্টিয়া থেকে ফরিদা ইয়াসমিন, নারায়ণগঞ্জ থেকে অ্যাডভোকেট সালমা আক্তার সোমা, নরসিংদী থেকে মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস ও নিলুফা ইয়াসমিন নিলু, নোয়াখালী থেকে অ্যাডভোকেট শাহিনুর বেগম সাগর, বান্দরবান থেকে আলীকদম উপজেলা পরিষদের ৪ বারের নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বান্দরবান জেলা মহিলা দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিনা আক্তার, বিএনপির সাবেক নেতা মরহুম হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের (লেচু মিয়া) মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন রয়েছেন আলোচনায়।

সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি কালবেলাকে বলেন, ছাত্রজীবন থেকে দলের সঙ্গে আছি। গত ১৭ বছর আওয়ামী সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তবে দল ছেড়ে কোথাও যাইনি। আশা করি, দলের হাইকমান্ড ত্যাগীদের মধ্যে থেকেই নির্বাচন করবেন কারা সংসদে যাবে।

গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তানজিন চৌধুরী লিলি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হই। এরপর মূল ধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। বিগত দিনে সব আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, দল আমার বিগত দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করবে।

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি। কখনো দল ছেড়ে যাইনি। কারও সঙ্গে আঁতাতও করিনি। আমার প্রত্যাশা দুর্দিনের নেতাকর্মীদের দলের হাইকমান্ড যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে।



img

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত

প্রকাশিত :  ০৬:৫০, ১০ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২০, ১০ এপ্রিল ২০২৬

জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক সৈয়দ আমানউল্লাহ: বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও উত্থান ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে শুরু হলেও, এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমানভাবে আলোচনায় আসে ২০১২ সালের দিকে । ২০১৭ সালে উত্তরার আদনান কবির হত্যাকাণ্ডের পর এই গ্রুপগুলোর তৎপরতা ব্যাপকহারে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে এবং ২০১৭-২০১৮ সাল থেকেই এটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এখন বাংলাদেশে এক নতুন আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। একসময় যা ছিল শহরকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন সমস্যা, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম পর্যন্ত। সময়ের চক্রে আইনি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আরও ডালপালা মেলেছে এ কিশোর অপরাধ। ধরনও হয়ে উঠছে ভয়াবহ—চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, এমনকি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

কিশোর গ্যাং হলো এমন একটি দল বা গোষ্ঠী, যেখানে সাধারণত কিশোররা (১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী) একত্রিত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে।

তার প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তবে এর চেয়ে কম বা বেশি বয়সীরাও রয়েছে গ্যাংয়ে। ঢাকায় বস্তি ও ছিন্নমূল শিশুদের মাদক সেবনের মাধ্যমেই মূলত কিশোর গ্যাংয়ের সূত্রপাত হয়। সেখান থেকে অনেক উচ্চবিত্তের সন্তানও জড়িয়ে পড়েছে এই গ্যাংয়ে। মারামারি, চুরি, ছিনতাই, প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধ এখন তাদের জন্য নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের নিয়ে নানাভাবে শঙ্কা জানিয়ে আসছে নাগরিক ও সুশীল সমাজ। 

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র বলছে, প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অসংখ্য সদস্য রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে ৪০ শতাংশই কিশোর। নিয়মিত বেড়ে চলা তাদের দলে সদস্যসংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। তাদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি পিস্তলের মতো আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, পল্লবী, মিরপুর ও উত্তরা থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি বলে তদন্ত সংস্থাগুলো জানিয়েছে। ঢাকা মহানগরের বাইরে কামরাঙ্গীরচর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায়ও গড়ে উঠছে নতুন গ্যাং নেটওয়ার্ক।

কিশোর অপরাধীদের কর্মকাণ্ডের সরকারি পৃথক কোনো তথ্যভাণ্ডার নেই। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং অপরাধী চক্র ছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৭টিতে। এর মধ্যে রাজধানীতে এখনো সক্রিয় ১২৭টি কিশোর গ্যাং। চট্টগ্রামে অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ে রয়েছে কয়েকশ সদস্য।

বিভিন্ন থানা এলাকা ও পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় গ্রুপে নানা অপরাধে জড়িত রয়েছে কিশোর গ্যাং। আর এদের ‘বড় ভাইদের’ ভূমিকায় রয়েছেন স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতারা কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করায় এদের দমন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র।

গত সপ্তাহে আলোচিত কুমিল্লার ধর্মসাগরপাড়ে কোতোয়ালি থানার এক পুলিশ দম্পতিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কুমিল্লা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার রিফাতের বয়স ১৯ এবং সিয়ামের বয়স ২০ বছর।

গতকাল অস্ত্র মহড়া ও দাঙ্গাবাজির ঘটনায় অভিযান চালিয়ে, কুমিল্লা নগরীর ঠাকুরপাড়া থেকে অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।

গতকাল ভোররাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- ফরহাদ হোসাইন, ইব্রাহিম হোসেন জসিম, শাহাদত হোসেন শান্ত, তানভীর আহম্মেদ ও সাজ্জাদ হোসেন ওরফে রিতিক। গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানার বিসিক শিল্পনগরী সংলগ্ন নোনাবাদ পুকুরের পূর্ব পাড়ে অভিযান চালিয়ে ৪টি রামদা/হাঁসুয়া ও একটি এসএস পাইপ দিয়ে তৈরি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা আরও ১৪ জনের নাম প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৪০-১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানান, গত ৩ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে ঠাকুরপাড়া মদিনা মসজিদ রোড এলাকায় একদল কিশোর গ্যাং সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, পটকা বিস্ফোরণ, মিছিল ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। তাদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের জন্য এ অভিযান পরিচালিত হয়। নগরীতে এমন অভিযান চলমান থাকবে।

গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযানে নগরীর জামালখান এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ ‘ডেঞ্জার’ কিশোর গ্যাং গ্রুপের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিএমপির কোতোয়ালি থানা পুলিশ।

গত শনিবার (৪ এপ্রিল) নোয়াখালীর সদর উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গৌরিপুর গ্রামে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে মো. সেলিম (৫০) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।

এ ছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন ও তার বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীত পাশে বেড়াতে যান। সেখানে তারা ছিনতাইকারী ‘কিশোর গ্যাং’-এর কবলে পড়েন। মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) সাঁতরে বেঁচে ফিরলেও নুরুল্লাহ শাওন সাঁতার না জানায় ব্রহ্মপুত্র নদে প্রাণ হারান।

সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।

গত মঙ্গলবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে—তার আগে তো ছিলই, কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে...এই সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বিভাগীয় ডিআইজিদের (পুলিশের উপমহাপরিদর্শক) বলে দেন, থানাগুলো যদি তৎপর হয় সবচেয়ে ভালো হবে।’

সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক, হুমকি ও পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শুধু পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধ তৎপরতা পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে।

কিশোর গ্যাং নিয়ে এলিট ফোর্সের পদক্ষেপ কী—জানতে চাইলে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘কিশোর গ্যাং বাংলাদেশে দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যৌক্তিক কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ ও র‍্যাব যৌথভাবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। পেছনের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি। এ কাজে আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করি।

কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপকতা ও কার্যকলাপ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণেই এই গ্যাং সমাজে দিন দিন জায়গা করে নিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, পরিবার থেকে পর্যাপ্ত স্নেহ ও মূল্যবোধের অভাব এবং সহিংস বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোররা সহজেই গ্যাং সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিভাগের অধ্যাপক শাহরিয়ার আফরিন বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ, প্রশাসনের তোড়জোড় কিংবা লোক দেখানো উদ্যোগ দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মতো জটিল বিষয় সহজে দূর করা সম্ভব নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল অর্জন করতে হবে।  তা না হলে, শুধু বর্তমান নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলাই নয়, ভবিষ্যতেও দেশ ও সমাজের জন্য বড় ধরনের সমস্যা ও হুমকি হিসেবে দাঁড়াতে পারে কিশোর গ্যাং।