সবুজের প্রত্যাবর্তন হোক আগামীকাল—আতঙ্ক নয়, আস্থাই হোক পুঁজিবাজারের চালিকাশক্তি
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বৈশ্বিক অস্থিরতার খবরে বিনিয়োগকারীদের মন কিছুটা ভারী হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম দখল করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনার ঢেউ কি সত্যিই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে নাড়িয়ে দিতে পারে? অভিজ্ঞ বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, আবেগ নয়, তথ্যই এখানে সবচেয়ে বড় পথনির্দেশক।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের মূল চালিকাশক্তি দেশীয় অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক তেলের বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত তদারকি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা রাখে। অতীতের অভিজ্ঞতাও বলে—বৈশ্বিক সংঘাতের খবর বাজারে সাময়িক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেললেও দেশের মৌলভিত্তি শক্ত থাকলে সূচক আবারও ঘুরে দাঁড়ায়।
পুঁজিবাজারে আতঙ্কের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় খুচরা বিনিয়োগকারীদের। অনেক সময় গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরঞ্জিত বিশ্লেষণ বা তাৎক্ষণিক নেতিবাচক শিরোনাম সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির আয়, উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সরাসরি এই যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, ওষুধ, ভোগ্যপণ্য—এই খাতগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর; এদের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার সম্প্রসারণ।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বাজারে পতনের দিনগুলোই অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য সুযোগ তৈরি করে। ইতিহাস বলে, ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারীরাই শেষ পর্যন্ত লাভবান হন। আতঙ্কের মুহূর্তে শেয়ার বিক্রি করে ক্ষতি নিশ্চিত করার চেয়ে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বিচক্ষণতার পরিচয়।
আগামীকাল কি পুঁজিবাজার সবুজ হবে? তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে। যদি আমরা গুজব নয়, তথ্যকে প্রাধান্য দিই; আতঙ্ক নয়, আস্থাকে বেছে নিই—তাহলেই সূচক ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বাজারে ইতিবাচক মনোভাব ফিরলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও সক্রিয় হন, লেনদেন বাড়ে, তারল্য বাড়ে—আর তাতেই সূচক সবুজের পথে হাঁটে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। বৈশ্বিক মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট—সবকিছুর মধ্যেও দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং এখন প্রয়োজন স্থির মন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।
পুঁজিবাজার কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি আস্থার প্রতিফলন। সেই আস্থা যদি আমরা নিজেরাই ধরে রাখতে পারি, তাহলে সবুজের প্রত্যাবর্তন অনিবার্য। আগামীকাল সূচক কত পয়েন্ট বাড়বে, তা সময়ই বলবে—কিন্তু বিনিয়োগকারীদের সাহস, ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাবই পারে বাজারকে আবারও প্রাণবন্ত করে তুলতে।
আসুন, আতঙ্কের বদলে আস্থা বেছে নিই। কারণ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাজারকে সাময়িক ঝড় দমাতে পারে না—বরং আরও দৃঢ় করে তোলে।


















